থ্রি-হুইলার ও সড়ক খোঁড়াখুঁড়িতে ঈদযাত্রায় ভোগান্তির আশঙ্কা পরিবহন সংশ্লিষ্টদের

ঈদুল ফিতর উপলক্ষে লাখো মানুষ ঘরমুখো হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এরই মধ্যে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা, মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য থ্রি-হুলাইর যান (তিন-চাকার পরবহন) চলাচল এবং চলমান সড়ক সংস্কারের কাজ ঈদের সময় গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোতে বড় ধরনের যানজট সৃষ্টি করতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ বছর মহাসড়কের অবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো এবং ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করতে বেশ কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে আলাপকালে হানিফ পরিবহনের চালক ইয়াকুব আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "সড়কের অবস্থা ভালো হতে পারে, কিন্তু ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুলাইর যানগুলো যেখানে-সেখানে পার্কিং, ইচ্ছামতো যাত্রী তোলা–নামানো শুরু করলে ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি হবে।"
শ্যামলী পরিবহনের চালক মো. আসলামও একই আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এসব থ্রি-হুইলার যান প্রায়ই ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করে, যার ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
আসলাম বলেন, "এগুলো ধীরগতির যান, আবার হঠাৎই দ্রুতগতির গাড়ির সামনে চলে আসে। অনেক সময় আমরা সতর্ক থাকলেও সব সময় ব্রেক কষে থামা সম্ভব হয় না।"
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হোসেন চৌধুরী জানান, সারা দেশে প্রায় ২০ লাখ অটোরিকশা চলছে। তারমধ্যে ঈদে অন্তত পাঁচ লাখ অবৈধভাবে সড়কে নামার আশঙ্কা রয়েছে।
মোজাম্মেল হোসেন আরও বলেন, "ব্যাটারিচালিত তিনচাকার যান ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পড়তে পারে, আর এসব দুর্ঘটনায় প্রাণহানির আশঙ্কা বেশি।"
তিনি আরও বলেন, "দীর্ঘপথে মোটরসাইকেলে করে যাওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে যারা বাড়তি আয়ের আশায় তেমন অভিজ্ঞতা ছাড়াই মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন, তারা মহাসড়কে বড় ধরনের বিপদের কারণ হতে পারেন।"
এদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি জানিয়েছে, এসব সমস্যা সমাধানে তারা সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এ বছর মহাসড়কের অবস্থা ভালো। তবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখন বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।"
তিনি বলেন, "আমরা আমাদের চালকদের সতর্ক হয়ে গাড়ি চালানোর নির্দেশনা দিয়েছি।"
সাইফুল আলম আরও বলেন, "ঢাকার আশেপাশে মহাসড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচলের খবর আমরা ইতোমধ্যে পেয়েছি। এসব যান দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে এবং সড়কে বিশৃঙ্খলা বাড়াচ্ছে।"
"আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আহ্বান জানিয়েছি। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছে, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে," যোগ করেন তিনি।
অসম্পূর্ণ মহাসড়ক ঈদযাত্রায় ভোগান্তি বাড়াবে
থ্রি-হুলাইর যানবাহনের চ্যালেঞ্জ ছাড়াও এবং সড়কের সার্বিক উন্নতি সত্ত্বেও কিছু এলাকায় মহাসড়কের খারাপ অবস্থা এবার ঈদযাত্রায় যাত্রীদের জন্য বাড়তি দুর্ভোগ ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
তারা জানান, কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশের কয়েক কিলোমিটার রাস্তা এখনো সংস্কার করা হয়নি। বহুদিন ধরে মেরামতের অভাবে সেখানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, যার ফলে চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা ঈদের সময় যাত্রীদের চরম ভোগান্তির কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঈদের ভ্রমণকে নির্বিঘ্ন করতে সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোতে সংস্কারের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
এদিকে আশুগঞ্জ নদীবন্দর থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত চারলেন উন্নয়ন প্রকল্পেও ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আফকনস ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নানা চ্যালেঞ্জ ও ধীরগতির কারণে প্রকল্প এলাকায় যানজট সৃষ্টি এবং চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে, যা ঈদযাত্রায় আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে।
এ সড়কের বেশিরভাগ অংশ পড়েছে কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে। মূলত প্রকল্পের অধীনে পড়ায় সড়কটিতে নিয়মিত সংস্কার কাজ করতে পারেনি সড়ক ও জনপথ বিভাগ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আশুগঞ্জ-আখাউড়া চারলেন প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক শামীম আহমেদ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আমরা ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো মেরামতের কাজ শুরু করেছি এবং কিছু অংশের কাজ শেষও হয়েছে। ঈদে যানজট যেন না হয়, সেজন্য ঘাটুরা এলাকায় নির্মাণাধীন সড়কের একটি লেন খুলে দেওয়া হয়েছে।"
এছাড়া ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চারলেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। আবার টাঙ্গাইল-রংপুর পথে চার লেনের কাজ চলছে। যদিও ঈদের আগেই এই রাস্তা খুলে দেওয়ার কথা, কিন্তু না দেওয়ার হলে ভোগান্তির আশঙ্কা রয়েছে এই পথে।
গাজীপুর অঞ্চলে পোশাক কারখানা ছুটি হলে চাপ পড়ে মহাসড়কে। এছাড়া ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজও চলমান রয়েছে, যার প্রভাব পড়তে পারে বাইপাইল ও আশুলিয়ার মত ব্যস্ততম রাস্তায়। ফলে ব্যবস্থাপনার ঘাটতি হলে যেকোনো সময় যানজট তৈরি হতে পারে এসব জায়গায়।
ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সরকারের নানা উদ্যোগ
দেশজুড়ে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার।
বিভিন্ন সড়কে, যানজটপ্রবণ ১৫৫টিরও বেশি পয়েন্টকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও অবৈধ যান চলাচল রোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সড়কে নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা টহল, ঢাকার বাস টার্মিনালগুলোতে হেল্পডেস্ক এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েগুলোতে নিয়ন্ত্রিত গতিসীমা চালুর মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঢাকা-রংপুর ও ঢাকা-সিলেটসহ জাতীয় মহাসড়কের বেশিরভাগ সংস্কারকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এছাড়া ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে চলমান সব উন্নয়ন প্রকল্প সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত চারলেন সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং ঝাওয়াল সেতু ২০ মার্চ থেকে চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি কাঞ্চনপুর ও ঘাটুরা সেতুও খুলে দেওয়া হয়েছে, যাতে ঈদযাত্রায় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা যায়।
নিরাপত্তা নিশ্চিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধে সদরঘাট, মহাখালী ও গাবতলীর মতো প্রধান টার্মিনালে সিসিটিভি ক্যামেরা ও সার্চলাইট বসানো হয়েছে। এসব টার্মিনালকে রিয়েলটাইম মনিটরিংয়ের জন্য পুলিশ কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
ঈদযাত্রাকে সামনে রেখে মহাসড়কসংলগ্ন হাসপাতালগুলোকেও জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ এর সহায়তায় এলার্ট বা সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। এছাড়া, দ্রুত সাড়াদানের জন্য ১৩টি ফায়ার সার্ভিস টিম প্রস্তুত রয়েছে।
আন্তঃজেলা যাত্রীদের চাপ সামলাতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) ৭৭৫টি বিশেষ বাস চালু করেছে। সড়কে চাপ কমাতে ফেরি সার্ভিসও বৃদ্ধি করা হয়েছে।
পদ্মা ও যমুনা সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজগুলোর টোল প্লাজায় প্রয়োজনীয় জনবল মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি দ্রুত টোল আদায়ের জন্য ইলেকট্রনিক টোল সিস্টেমও বসানো হয়েছে।