ইউএসএআইডি’র সহায়তা কমায় যক্ষ্মা মোকাবেলায় ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

ইউএসএআইডি অর্থায়ন কমিয়ে দেওয়ার পর বাংলাদেশে যক্ষ্মা প্রতিরোধ কার্যক্রম বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ও চিকিৎসা কার্যক্রমে।
ইউএসএআইডির অর্থায়নে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) প্রায় ৮টি প্রকল্প পরিচালনা করছিল, যার মাধ্যমে যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত ও স্ক্রিনিং করা হতো।
বর্তমানে এসব প্রকল্প পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে কর্মরতদের ছাঁটাই করা হয়েছে।
এছাড়া, ইউএসএআইডির সহায়তায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকও একটি যক্ষ্মা গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করছিল। সেটিও চলতি বছরের জানুয়ারিতে বন্ধ হয়ে গেছে।
ব্র্যাক হেলথ প্রোগ্রামের কমিউনিকেবল ডিজিজ শাখার টেকনিক্যাল সিনিয়র ম্যানেজার ফারহানা নিশাত সেহেলী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-কে বলেন, "গত জানুয়ারি থেকে ইউএসএআইডির অর্থায়নে চলমান গবেষণা প্রকল্প বন্ধ রয়েছে। এখনো বড় কোনো প্রভাব দেখা না গেলেও এসব কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকলে প্রভাব পড়বে।"
২০২১ সালে ইউএসএআইডির সহায়তায় রাজধানীর শ্যামলীতে দেশের প্রথম ওয়ান-স্টপ যক্ষ্মা (টিবি) সেবা কেন্দ্র চালু করা হয়। ইউএসএআইডির অর্থায়নে ওই সেন্টারে একজন চিকিৎসক নিয়োজিত ছিলেন, যিনি মূলত ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মা (এমডিআর টিবি) আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতেন।
অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই চিকিৎসককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানান শ্যামলী ২৫০ শয্যার টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার।

তিনি বলেন, "আমাদের হাসপাতালে ওয়ান-স্টপ টিবি সার্ভিস সেন্টারের সেবা চালু রয়েছে। রোগীদের সেবা নিশ্চিত রাখতে আমাদের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলা হয়েছে। তারাই এখন সার্বিক চিকিৎসা দিচ্ছেন।"
বর্তমানে শ্যামলী টিবি হাসপাতালে ২১ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫ জন এমডিআর টিবিতে আক্রান্ত।
এ পরিস্থিতির মধ্যেই আজ, ২৪ মার্চ পালিত হচ্ছে বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য—'হ্যাঁ! আমরা যক্ষ্মা নির্মূল করতে পারি: প্রতিশ্রুতি, বিনিয়োগ, বাস্তবায়ন।'
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে ৩ লাখ ১৩ হাজার ৬২৪ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৮৩ শতাংশ রোগী চিকিৎসার আওতায় থাকলেও প্রায় ১৭ শতাংশ এখনও শনাক্তের বাইরে রয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই শনাক্তবহির্ভূত রোগীরাই যক্ষ্মার জীবাণু ছড়িয়ে দিচ্ছেন, যা নতুন করে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, ইউএসএআইডির হঠাৎ অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালনা হুমকির মুখে পড়েছে, ফলে কোটি কোটি মানুষ—বিশেষ করে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী—মারাত্মক বিপদের মুখোমুখি।
ডব্লিউএইচও-র গ্লোবাল প্রোগ্রাম অন টিবি অ্যান্ড লাং হেলথের পরিচালক ডা. তেরেজা কাসায়েভা বলেন, "টিবি সেবায় যেকোনো ধরনের বিঘ্ন—তা আর্থিক, রাজনৈতিক কিংবা কার্যক্রমসংক্রান্ত যা-ই হোক না কেন—বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের জন্য ভয়াবহ ও কখনও কখনও প্রাণঘাতী পরিণতি ডেকে আনতে পারে।"
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছর বাংলাদেশে বৈদেশিক সহায়তা হিসেবে এসেছে মাত্র ৭১ মিলিয়ন ডলার, যেখানে ২০২৪ সালে এই সহায়তার পরিমাণ ছিল ৫০০ মিলিয়ন ডলার। তুলনামূলকভাবে ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিন বছরে শুধু স্বাস্থ্যখাতেই ইউএসএআইডি বাংলাদেশে গড়ে প্রতিবছর ৮৩ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছিল, যার বড় একটি অংশ যক্ষ্মা প্রতিরোধ কর্মসূচিতে ব্যয় হতো।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি'র বিভাগীয় টিবি বিশেষজ্ঞ ডা. আহমেদ পারভেজ জাবিন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-কে বলেন, "বাংলাদেশের অবকাঠামো যেহেতু ভালো, তাই ইউএসএআইডির ফান্ড বন্ধ হলেও আফ্রিকান দেশগুলোর মতো আমাদের দেশে তেমন প্রভাব পড়বে না। রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা কার্যক্রমে বড় কোনো সমস্যা হবে না। যেমন প্রতিবছর প্রায় ৩ লাখ রোগী শনাক্ত করি, আগামীতেও তা-ই করতে পারবো।"
তিনি আরও বলেন, "চিকিৎসা খাতে বড় দাতা হলো গ্লোবাল ফান্ড। তাদের সহায়তা থাকায় বড় ধরনের সংকট হবে না। তবে ইউএসএআইডির সহায়তা থাকলে আরও ভালো হতো। বিশেষ করে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে তাদের কিছুটা ভূমিকা ছিল, সেই জায়গায় কিছুটা ঘাটতি হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগে মানুষকে আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে।"
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা ও স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. মুজাহেরুল হক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-কে বলেন, "যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে আমরা সফলতা পেয়েছি। ইউএসএআইডির অর্থায়ন মূলত ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মা (এমডিআর টিবি) রোগীদের সেবা প্রদানে ব্যবহৃত হতো। সরকার এই বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে রাখার সক্ষমতা রাখে।"
তিনি আরও বলেন, "তবে কোথাও কোনো সমস্যা দেখা দিলে সরকারকে তা মোকাবিলা করতে হবে। ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত থাকলে, বড় ধরনের কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।"