এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পেছাতে সংস্কার রোডম্যাপ চূড়ান্ত, জাতিসংঘে সমর্থন পেতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাবে ঢাকা
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করতে জাতিসংঘভুক্ত দেশগুলোর কাছে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এজন্য একটি জাতীয় রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা হয়েছে।
'ন্যাশনাল রোডম্যাপ ফর স্মুদ, সাসটেইনেবল অ্যান্ড ইরিভারসিবল এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ২০২৬-২০২৯' শীর্ষক এই রোডম্যাপে প্রস্তাবিত বর্ধিত সময়ে বাংলাদেশ যেসব সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে এবং ২০২৯ সালের মধ্যে যেসব অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চায়, তার বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের এই আবেদনের পক্ষে সদস্য দেশগুলোর সমর্থন আদায়ে নথিটি ব্যবহার করবে ঢাকা।
গত ২৯ জুলাই অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে 'জাতীয় উত্তরণ তদারকি ও সমন্বয় কমিটি'র প্রথম সভায় এই রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে ২০২৯ সালের মধ্যে জিডিপির প্রবৃদ্ধিসহ অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক করোনা মহামারী পূর্ববর্তী পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। একইসঙ্গে লজিস্টিক খাতের সার্বিক উন্নয়নে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
এতে চলতি অর্থবছরে প্রাক্কলিত ৪.১৪ শতাংশ প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বাড়িয়ে ৭ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি বর্তমান ৯.১৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশেরও কম। আগামী তিন বছর প্রস্তুতির সময় পেলে এটিকে ৯ শতাংশের ঊর্ধ্বে নিতে চায় সরকার। অর্থাৎ, ছয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিশ্চিত করার টার্গেট করেছে সরকার। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।
আগামী তিন বছরের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে ১০ শতাংশের উপরে নেওয়া এবং চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার অবস্থানের গড় সময় ৯.৪৪ দিন থেকে সর্বোচ্চ দুই দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিংখাতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশের বেশি। ২০২৯ সালে এটি কমিয়ে ২০ শতাংশে নিয়ে আসা এবং দেশের মোট রপ্তানিতে নন-আরএমজি রপ্তানির অংশ কমপক্ষে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। বর্তমানে মোট রপ্তানি আয়ে নন-আরএমজি রপ্তানির হার ১৯ শতাংশেরও কম।
টেকসই উত্তরণ নিশ্চিতে এই রোডম্যাপটি পাঁচটি কৌশলগত স্তম্ভের (পিলার) ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। এগুলো হলো—সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আর্থিক স্থিতিস্থাপকতা; বাণিজ্য রুপান্তর, বাজার প্রবেশাধিকার ও রপ্তানিতে প্রতিযোগী সক্ষমতা; উৎপাদন সক্ষমতা, শিল্প রূপান্তর ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন; মানবসম্পদ উন্নয়ন, উদ্ভাবন ও ভবিষ্যৎ দক্ষতা; এবং সুশাসন, অংশীদারত্ব ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।
এই রোডম্যাপ বাস্তবায়নে কত টাকা ব্যয় হবে, তার পরিমাণ উল্লেখ নেই। তবে ব্যয়ের ৪০ শতাংশ জাতীয় বাজেট থেকে, ৩০ শতাংশ উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে, ২৫ শতাংশ বেসরকারিখাতের বিনিয়োগ থেকে এবং ৫ শতাংশ ব্লেন্ডেড বা গ্রিন ফাইন্যান্স থেকে অর্থায়ন হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষক মোস্তফা আবিদ খান টিবিএসকে বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর জন্য অর্থনৈতিক অগ্রগতির যেসব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সংস্কার ছাড়া সেগুলো অর্জন সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, "ডিউটি ফ্রি এক্সেসের (শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার) চেয়ে সংস্কার বেশি জরুরি। লজিস্টিক ব্যয় কমানো, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা, ব্যাংক খাতের উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে সংস্কার দরকার। পাশাপাশি সকল খাতে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে।"
সেপ্টেম্বরের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে সামনে রেখে কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ
বিদ্যমান সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরণের কথা রয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তিন বছর সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে। তবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ পুরো তিন বছর সময় অনুমোদন করবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত পেতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার পরিকল্পনা করছে সরকার। আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশনের আগে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এ-১৪, এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ, গ্রুল্যাক (জিআরইউএলএসি), পূর্ব ইউরোপীয় গ্রুপ এবং পশ্চিম ইউরোপীয় গ্রুপসহ—প্রধান প্রধান আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক জোটগুলোর সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালাবে।
উল্লেখ্য, এ-১৪ গ্রুপে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও মিসরের মতো দেশ রয়েছে; অন্যদিকে গ্রুল্যাক-এর অন্তর্ভুক্ত আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও মেক্সিকোসহ লাতিন আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের ৩৩টি দেশ।
কেন এই রোডম্যাপ
সভার কার্যপত্রে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ সদস্য দেশগুলোর সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে গত ১৪-১৮ জুলাই বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধিদল নিউইয়র্ক সফর করে।
এই সফরে তাঁরা জাতিসংঘের বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি, জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) সভাপতি ও সহ-সভাপতি, ইউএন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) এর চেয়ারম্যান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদল, জি-৭৭ ও চায়না গ্রুপের চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করে—বাংলাদেশের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা করেন।
বৈঠককালে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বেশিরভাগ দেশের প্রতিনিধি বর্ধিত মেয়াদে বাংলাদেশ কী সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা করছে, তার সুনির্দিষ্ট বিবরণ জানতে চান এবং এসব প্রতিশ্রুতিসহ একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দেওয়ার অনুরোধ জানান।
পাশাপাশি, একাধিক দেশের প্রতিনিধি ও জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগেই একটি নির্ভরযোগ্য ও সময়াবদ্ধ সংস্কার রোডম্যাপ প্রস্তুত করার পরামর্শ দিয়ে জানান যে, এটি এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের সময় বাড়ানোর আবেদনে সদস্য দেশগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করবে।
