রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর ৫ প্রস্তাব
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সহমর্মিতা প্রকাশ থেকে সংকটের মূল কারণ খুঁজে সমাধানের দিকে, প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপের দিকে এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে বাস্তুচ্যুতির অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।
'সহমর্মিতা থেকে সংকটের মূল কারণ ও তার সমাধান খোঁজার দিকে, প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপের দিকে এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে বাস্তুচ্যুতির অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে,' তিনি বলেন।
আজ বুধবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে 'দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: এ রিনিউড কল ফর এ ডিউরেবল সলিউশন ফ্রম প্রোট্র্যাক্টেড ডিসপ্লেসমেন্ট, উইথ জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি' শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রীর ৫ প্রস্তাব
- রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি;
- রোহিঙ্গাসহ বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা বন্ধ এবং তাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা;
- রোহিঙ্গা ও তাদের আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমানযোগ্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা;
- বিচার ও জবাবদিহি ব্যবস্থা জোরদার করা এবং
- মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র ও অন্যান্য আন্তসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।
তারেক রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও অন্যান্য রাষ্ট্রকে মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় সহায়তা করতে হবে এবং নিজেদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে, যাতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়।
তিনি বলেন, 'রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে তাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা ফিরে যাওয়ার বিষয়ে আস্থা ফিরে পান। রোহিঙ্গা সংকটের সূত্রপাত মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানেই নিহিত বলে মনে করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'দুঃখজনকভাবে রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এখনো গভীর উদ্বেগজনক।' রোহিঙ্গারা এখনো নির্বিচার আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রমসহ বিভিন্ন ধরনের গুরুতর অধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি এখনো অনুকূল নয়। বাংলাদেশ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বিপুল মানবিক দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। দুঃখজনকভাবে মিয়ানমারে সহিংসতা থেকে মানুষ এখনো পালিয়ে আসছে। প্রতি বছর শিবিরগুলোতে হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। এর ফলে এই দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে আরও একটি প্রজন্ম যুক্ত হচ্ছে।
তারেক রহমান বলেন, রোহিঙ্গা শিশুরা প্রায় ৬ হাজার শিক্ষাকেন্দ্রের মাধ্যমে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুসারে শিক্ষা নিচ্ছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা তরুণদের ভবিষ্যতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পুনঃএকীভূত হওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘ সময় বসবাসের জন্য শিবিরগুলো কোনো আদর্শ জায়গা নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির ব্যয় প্রতিদিনই বাড়ছে—শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য নয়, কক্সবাজারের আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্যও। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপও ব্যাপক।
দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ এবং নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে বলে জানান তিনি। এর মধ্যে মানব পাচার, অভিবাসী পাচার, মাদক পাচার ও অন্যান্য আন্তদেশীয় অপরাধও রয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, 'কিছু মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে মালয়েশিয়ায় চলে যাচ্ছে। একটি দেশে অমীমাংসিত থেকে যাওয়া সংকট পুরো অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তাঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।'
রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে যাওয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরদিন বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকুক। আমরা চাই তারা নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে এবং অধিকার সুরক্ষিত রেখে মিয়ানমারে নিজেদের বাড়িতে ফিরে যাক।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ মানবিকতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেছে। এখন তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি 'দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে' নিজেদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
