বাজার ও পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে না পারায় বাড়ছে না বাংলাদেশের সবজি রপ্তানি
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানি ঘুরে দাঁড়ালেও এখনও তা এক দশক আগের রপ্তানি আয়ের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। বাজার ও পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে ব্যর্থতা, খাদ্য নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণে সীমাবদ্ধতা এবং দুর্বল সরবরাহব্যবস্থা (লজিস্টিকস) খাতটির দীর্ঘদিনের দুর্বলতাকে সামনে এনেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সবজি রপ্তানি থেকে ৮৮.৮৮ মিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। আগের অর্থবছরের ৮১.১২ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় যা ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেশি।
তবে এ আয় ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ১০৩.২৪ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় এখনো ১৪.৩৬ মিলিয়ন ডলার কম।
গত এক দশকে দেশে সবজি উৎপাদন ও ভোগ অনেকটাই বেড়েছে। কিন্তু সেই সক্ষমতা রপ্তানি আয় বাড়াতে কাজে লাগানো যায়নি। তাই প্রশ্ন হলো, উৎপাদন বাড়লেও রপ্তানি কেন বাড়ছে না?
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিব্যবসা বিভাগের শিক্ষক জি এম মনিরুল আলম বলেন, স্বল্পমেয়াদি ও লাভজনক ফসল হিসেবে সবজির চাষ বেড়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ায় কৃষকেরাও উৎপাদন সম্প্রসারণে উৎসাহিত হয়েছেন।
তিনি বলেন, "মূল প্রশ্ন হলো উৎপাদন কেন বেড়েছে, তা নয়; বরং রপ্তানি কেন সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পরছে না।"
তার মতে, দেশের সবজি রপ্তানি এখনো মূলত মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসরত বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় প্রবাসীদের চাহিদার ওপর নির্ভরশীল। লাউ, বেগুন, মরিচ, শিম ও বিভিন্ন শাকসবজি মূলধারার সুপারমার্কেটের বদলে প্রধানত প্রবাসী জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক দোকানে বিক্রি হয়।
তিনি বলেন, "আমাদের রপ্তানি বাজার মূলত প্রবাসী জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সম্প্রসারিত হয়েছে। একই সময়ে নতুন আন্তর্জাতিক ভোক্তা বাজারে প্রবেশ ও বাজার বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।"
মনিরুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চেরি টমেটো ও বিশেষায়িত বিভিন্ন সবজির চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় এখনো পর্যাপ্ত বৈচিত্র্য আসেনি।
বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সচিব মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সবজি রপ্তানি বেড়েছে মূলত অন্য কারণে। দেশের বাজারে দাম স্থিতিশীল থাকা বা সমুদ্রপথে রপ্তানি বাড়া এর প্রধান কারণ নয়।
তার মতে, রপ্তানিকারকদের নিজস্ব উদ্যোগ এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ শাখাসহ কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় মূলত এ প্রবৃদ্ধি এসেছে।
তিনি বলেন, "বিদেশে বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের চাহিদা সবসময়ই ছিল। কিন্তু প্রকৃত চাহিদার তুলনায় আমাদের রপ্তানি এখনো অনেক কম।"
তাজা ফল ও সবজি দ্রুত পচনশীল হওয়ায় সমুদ্রপথে রপ্তানি এখনো সীমিত। অল্প পরিমাণ বাঁধাকপি, ফুলকপি ও গাজর মালয়েশিয়ায় এবং আলু শ্রীলঙ্কায় রপ্তানি হয়।
সমুদ্রপথে পরিবহন তুলনামূলক সাশ্রয়ী হলেও দীর্ঘ সময় লাগায় অধিকাংশ তাজা কৃষিপণ্য রপ্তানিতে আকাশপথই প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে খাতটির মূল প্রতিবন্ধকতার শুরু উৎপাদন পর্যায় থেকেই।
আলু ও অন্যান্য তাজা কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ট্রেড ফিউশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী উৎপাদন ও ফসল সংগ্রহের বিষয়ে কৃষকদের মধ্যে এখনো পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব রয়েছে।
তিনি বলেন, কৃষিপণ্যে রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা, স্বয়ংক্রিয় গ্রেডিং সুবিধার সীমাবদ্ধতা এবং রপ্তানিযোগ্য মানের আলু উৎপাদন সম্পর্কে জ্ঞানের ঘাটতি পণ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ।
এর সঙ্গে আধুনিক হিমাগারের অভাব, পরিবহনের সময় পণ্যের মান ধরে রাখার সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক মানের মোড়কজাতকরণের উচ্চ ব্যয় রপ্তানিকারকদের খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
রপ্তানিকারকেরা সাধারণত সংগঠিত কৃষকগোষ্ঠীর কাছ থেকে সরাসরি পণ্য না কিনে ব্যবসায়ী ও সংগ্রাহকদের মাধ্যমে পণ্য সংগ্রহ করেন। প্যাকিং হাউসে পৌঁছানোর আগেই বিভিন্ন খামারের পণ্য একসঙ্গে মিশে যাওয়ায় কীটনাশক ও সার ব্যবহারের তথ্য এবং ফসল সংগ্রহের তারিখ যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মনিরুল আলম বলেন, উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য এখন উত্তম কৃষিচর্চা, পণ্যের উৎস শনাক্ত করার ব্যবস্থা এবং কীটনাশকের সর্বোচ্চ অবশিষ্টাংশসীমা মেনে চলা অপরিহার্য।
মনিরুল আলম বলেন, "অনেক কৃষক কীটনাশক প্রয়োগের পর নির্ধারিত অপেক্ষাকাল না মেনেই সবজি সংগ্রহ করেন। এতে পণ্যে রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতার সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে।"
তিনি বলেন, কৃষকেরা প্রায়ই কীটনাশক ও সার ব্যবহারের কোনো নথি সংরক্ষণ করেন না। ফলে পণ্যের উৎস ও উৎপাদন প্রক্রিয়া শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তার মতে, ক্ষুদ্র পরিসরের চাষাবাদ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পোকামাকড়ের আক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহারের প্রবণতাও বাড়ছে। এছাড়া পরীক্ষাগারের স্বল্পতা এবং পণ্য পরীক্ষার উচ্চ ব্যয়ও বড় প্রতিবন্ধকতা।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় তাজা ফল ও সবজি পাঠাতে প্রতিবেশী প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি পরিবহন ব্যয় হয়।
তিনি আঞ্চলিক প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিবহন ব্যয় নির্ধারণের আহ্বান জানান। তার মতে, পরিবহন খাতে ভর্তুকি দেওয়া হলে এ ব্যয়ের ব্যবধান কমানো সম্ভব।
মনিরুল আলম বলেন, স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি মানদণ্ড পূরণ, পণ্যের উৎস শনাক্ত করার ব্যবস্থা এবং আমদানিনির্ভর ব্যয়বহুল মোড়কজাতকরণ উপকরণ মূলধারার সুপারমার্কেটে প্রবেশের পথে বড় বাধা।
সরকারি নগদ সহায়তার ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রপ্তানিকারকেরা।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, নগদ সহায়তা প্রত্যাহার করা হলে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারক বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে পারেন, এমনকি কারও কারও ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
তিনি নগদ সহায়তা অন্তত আগের ২০ শতাংশ হারে বহাল রাখার পাশাপাশি মোড়কজাতকরণ উপকরণ শুল্কমুক্তভাবে আমদানির সুযোগ, কোল্ড চেইন অবকাঠামোয় বিনিয়োগে প্রণোদনা এবং আকাশপথে পণ্য পরিবহনে সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব করেন।
