বৈশ্বিক সংঘাতে কার্গো বিমান ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ, কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বড় ধাক্কা
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের কারণে কার্গো বিমানভাড়া (এয়ারফ্রেইট) প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপসহ বিভিন্ন গন্তব্যে সবজি, ফল ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, চালান উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে এবং ব্যয় বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
রপ্তানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, সব প্রধান গন্তব্যেই বিমানভাড়া বেড়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রতি কেজি কৃষিপণ্য পাঠাতে খরচ হচ্ছে ১৮০–২৮০ টাকা, যা সংঘাতের আগে ছিল ১২০–১৪০ টাকা। ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে এ খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২০–৬৫০ টাকা, যা আগে ছিল ৪০০–৪৫০ টাকা। অন্যান্য গন্তব্যেও ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
যুদ্ধের আগে মধ্যপ্রাচ্যে একটি সবজি ও ফলের কনটেইনার পাঠাতে খরচ হতো প্রায় ২,৮০০ ডলার। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬,২০০–৬,৪০০ ডলারে, যার ফলে রপ্তানি ক্রমেই অকার্যকর হয়ে উঠছে।
রপ্তানিকারকরা আরও জানান, কার্গো স্পেস পাওয়া এখন অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে, যা সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও ব্যাহত করছে।
রপ্তানি কমায় লোকসানে কৃষক
আড়ত অ্যাগ্রো বিডির স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ কাঞ্চন মিয়া মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সবজি, ফল ও শুকনো খাবার রপ্তানি করেন। তিনি জানিয়েছেন, তার ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি সাধারণত মাসে ৯–১০টি চালান পরিচালনা করেন, কিন্তু মার্চ মাসে মাত্র একটি আলুর কনটেইনার পাঠাতে পেরেছেন। তিনি বলেন, 'যুদ্ধের কারণে কার্গো বিমানভাড়া এত বেড়েছে যে রপ্তানি প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।'
শাহ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোশতাক আহমদ শাহ বলেন, এক মাসের মধ্যে বিমানভাড়া দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় বুকিং দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, ভারতের রপ্তানিকারকরা এ ধরনের ভাড়া বৃদ্ধির মুখে পড়েননি এবং আগের দামে রপ্তানি চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, 'এভাবে চলতে থাকলে রপ্তানি প্রায় শূন্যে নেমে আসবে। আমাদের ভাড়া কয়েক দিন পরপরই বাড়ানো হচ্ছে।'
আরেক রপ্তানিকারক মো. শহীদ সরকার বলেন, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাচ্ছে। তিনি জানান, ভারতে প্রতি কেজি রপ্তানি খরচ ২০০–২৫০ টাকা এবং পাকিস্তানে আরও কম, যেখানে বাংলাদেশে প্রায় ৭০০ টাকা খরচ হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা অসম্ভব।' তিনি আরও জানান, রপ্তানি বন্ধ থাকায় এখন এসব পণ্য দেশের বাজারে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
আমের মৌসুম ঘিরে শঙ্কা বাড়ছে
বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য রপ্তানি করে, তবে সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী তাতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে সবজি রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৪৫ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে শুকনো খাবার ১৯.৪০ শতাংশ, মসলা ১২.৭৪ শতাংশ এবং পানীয়, স্পিরিট ও ভিনেগার রপ্তানি ৩৪.৩৬ শতাংশ কমেছে।
মে–সেপ্টেম্বরের আম রপ্তানি মৌসুম সামনে রেখে উদ্বেগ বাড়ছে। রপ্তানিকারকরা বলছেন, বাড়তি ভাড়া আম ও কাঁঠালের চালানে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এগুলো কঠোর 'গ্লোবাল গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস' (জিএপি) মানদণ্ড মেনে চাষ করা হয় এবং উৎপাদন ব্যয় বেশি।
বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান বলেন, রপ্তানি 'প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে' এবং লন্ডনে প্রতি কেজি পাঠাতে ভাড়া এখন প্রায় ৬০০ টাকা, যা আগে ৪০০ টাকার নিচে ছিল।
মোশতাক আহমদ শাহ বলেন, কাতারের একটি ফল মেলাসহ বিভিন্ন স্থানে আগে বাংলাদেশি আমের ভালো চাহিদা ছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সব উদ্যোগ থেমে গেছে। তিনি বলেন, 'বর্তমান ভাড়ায় ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা একেবারেই অসম্ভব।'
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর আম রপ্তানি হয়েছে ২,১৯৪ টন, যা ২০২৩ সালের ৩,১০০ টন থেকে কম এবং ২০২৪ সালের ১,৩২১ টন থেকে বেশি।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমের মৌসুমের আগে কার্গো ভাড়া সমস্যার সমাধানে এয়ারলাইন্স ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ সতর্ক করে বলেন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানির সুযোগ কমে যাওয়ায় কৃষকরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
গ্লোবাল গ্যাপের নিবন্ধিত প্রশিক্ষক অধ্যাপক ফারুক বলেন, কার্গো বিমানভাড়া কমানো না গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
