বাজেটের অগ্রাধিকারকে স্বাগত জানাল এমসিসিআই, তবে ‘উচ্চাভিলাষী’ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সংশয়
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে স্বাগত জানিয়েছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)।
সংগঠনটি বলেছে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষার ওপর বাজেটের 'সময়োপযোগী গুরুত্বারোপ' ইতিবাচক। তবে একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণের 'উচ্চাভিলাষী' লক্ষ্যমাত্রার বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ এ সংগঠন।
শুক্রবার (১২ জুন) এক বিবৃতিতে দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন এমসিসিআই নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট উপস্থাপনের জন্য অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে অভিনন্দন জানায়।
বিবৃতিতে বলা হয়, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির চাপ, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং রাজস্ব আহরণের চ্যালেঞ্জের মতো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে এ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশের সমান। এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে সরকার ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করেছে।
এমসিসিআই মনে করে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সরকারি লক্ষ্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।
জনসাধারণকে স্বস্তি দেওয়া এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা জোরদারে সরকারের নির্ধারিত ১০টি অগ্রাধিকার খাতকে 'যথাযথ' বলেও উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।
তবে আগামী অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে এমসিসিআই। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান রাজস্ব সংগ্রহের প্রবণতা বিবেচনায় এ লক্ষ্যমাত্রাকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বলে মনে করছে সংগঠনটি।
তাদের হিসাবে, বিদায়ী অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত এনবিআর ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে পেরেছে, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৬৫ শতাংশ।
এমসিসিআই সতর্ক করে বলেছে, 'কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রচেষ্টা করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ ও হয়রানির কারণ হতে পারে।'
সংগঠনটির মতে, অতিরিক্ত কর আরোপ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়াতে পারে এবং ভোক্তাদের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানোর পরিবর্তে কর প্রশাসনের স্বয়ংক্রিয়ীকরণ, প্রকৃত করজাল সম্প্রসারণ এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় আরও দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এমসিসিআই।
দেশের বিনিয়োগ পরিবেশের অবনতির বিষয়েও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সংগঠনটি। তাদের মতে, ২০২৫-২৬- অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ জিডিপির ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
অন্যদিকে, বাজেটে প্রস্তাবিত কয়েকটি কর সংস্কার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে এমসিসিআই। এর মধ্যে উৎসে কর (টিডিএস) সংক্রান্ত বিধানে পরিবর্তন, আপিলের ক্ষেত্রে জমার পরিমাণ কমানো, বৈধ ব্যবসায়িক ব্যয়কে অধিক স্বীকৃতি দেওয়া এবং কর প্রশাসন ডিজিটাল করার উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য।
এমসিসিআই সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগেরও প্রশংসা করেছে। সংগঠনটি বিশেষভাবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির জন্য প্রস্তাবিত ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের কথা উল্লেখ করেছে। এই বরাদ্দের আওতায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলা বিজ নামে একক ডিজিটাল সেবা প্ল্যাটফর্ম, সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তি এবং ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের মতো উদ্যোগকেও স্বাগত জানিয়েছে এমসিসিআই। তাদের মতে, এসব উদ্যোগ শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে সহায়ক হতে পারে।
সবশেষে এমসিসিআই বলেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সফলতা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে এর কার্যকর বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং ব্যবসাবান্ধব কর পরিবেশ সৃষ্টির ওপর।
