উৎসে কর থেকে বাড়তি ৫২ হাজার কোটি টাকা চায় এনবিআর, উদ্বেগ ব্যবসায়ীদের
সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেশ কিছু খাতে কর ছাড় দেওয়া সত্ত্বেও – জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) আগের অর্থবছরের তুলনায় ৫৬ শতাংশ বেশি আয়কর সংগ্রহের একটি বড় লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়েছে। নতুন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য কর কর্তৃপক্ষটির প্রধান হাতিয়ার হবে উৎসে কর, যার মাধ্যমে বাড়তি ৫২ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে চায় এনবিআর।
গত সোমবার প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরকে আয়কর আদায় বাড়ানোর একটি পরিকল্পনা জমা দিয়েছে এনবিআর। রাজস্ব বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উৎসে কর আদায়কে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে নির্ধারণ করে এই কৌশল সাজানো হয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, বাড়তি ৫২ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের ওপর হয়রানির মাত্রা বাড়তে পারে। বিশেষত বড় কর ফাঁকিবাজদের পাশাপাশি কর প্রতিপালনের (কমপ্ল্যায়েন্স) ছোটখাট ভুলের কারণেও এখন ব্যবসায়ীদের হয়রানির মুখে পড়তে হবে। কর প্রশাসনের প্রক্রিয়ায় এর ফলে 'অনিয়মের' মাত্রাও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন তারা।
চলতি মাসেই এনবিআর ঘোষণা দিয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠানের উৎসে কর কর্তন করার কথা, তারা সেটা সঠিকভাবে পরিপালন করছে কিনা– তা বিশেষভাবে যাচাই করা হবে। এর অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র, কম্পিউটার জব্দ করা, এবং বিনা বাধায় যেকোনো প্রতিষ্ঠানে প্রবেশাধিকার পাবে।
কোনো ধরনের অসহযোগিতা হলে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধানও আছে এতে।
বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে ব্যবসায়ী সমাজ। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি ব্যবসায়ী সংগঠন এনবিআরের এই পদক্ষেপ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে।
অবশ্য এনবিআর কর্মকর্তাদের বক্তব্য ভিন্ন। তারা বলছেন, যেসব প্রতিষ্ঠান ফাঁকি দেবে– কেবল তাদেরই এই উদ্যোগে ভয় পাওয়ার কারণ রয়েছে, অন্যদের নয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আমাদের আয়করের ৭০ শতাংশের বেশি আসে সোর্স ট্যাক্স (উৎস কর) থেকে। এই সোর্স ট্যাক্স মূলত কোম্পানিগুলোর কাছ থেকেই আদায় হয়। কিন্তু ফাঁকির বড় অংশও এখাতেই হয়ে থাকে।"
তিনি বলেন, "কোনো কোম্পানির হয়তো বছরে ১ কোটি টাকা উৎসে কর কাটার কথা, কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন কায়দায় তা কমিয়ে হয়তো ৫০ লাখ টাকা বা ৩০ লাখ টাকা দিল। এতদিন এসব বিষয়ে কঠোর মনিটরিং ছিল না। এবার আইনগতভাবেই এই মনিটরিং জোরদার করা হবে। কাজেই কোনো কোম্পানি যদি কর ফাঁকি না দেয়, তবে এই উদ্যোগ নিয়ে তাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই"
সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআর মোট ১ লাখ ৪২ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা আয়কর হিসেবে আদায় করেছে, যার মধ্যে উৎসে কর হিসেবে আদায় করা হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ১১২ কোটি টাকা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সংস্থাটি উৎসে কর থেকে আদায় করতে চায় ১ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৫১ শতাংশ বেশি।
ওই কর্মকর্তা বলেন, "এবার বাজেটে বেশকিছু খাতে সোর্স ট্যাক্স ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের ৫৬ শতাংশ বেশি আয়কর আদায় করতে হবে। ফলে কমপ্ল্যায়েন্স গ্যাপ কমানোর মাধ্যমেই এই অর্থ আদায় বাড়াতে হবে।"
তিনি বলেন, এবার খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর শূন্য দশমিক ২০ (০.২০ শতাংশ) উৎসে কর আরোপ করা হয়েছে, যেখান থেকে বাড়তি ২ হাজার কোটি টাকা আদায় হবে। এর বাইরে আমদানি, সরবরাহ, ব্যাংকের লেনদেন এবং রেমিট্যান্সের মতোন জায়গাগুলোতে সরকারের প্রাপ্য আয়কর আদায়ে গুরুত্ব বাড়ানো হবে।
ব্যবসায়ী নেতাদের আশঙ্কার জায়গা
তবে এনবিআরের আশ্বাসের পরও ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্বেগ কাটছে না।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ টিবিএসকে বলেন, "কর ফাঁকি উদ্ঘাটনে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু ছোটখাট ভুলের জন্য ব্যবসায়ীদের হয়রাানির সুযোগ বাড়বে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।"
"কারণ এনবিআরের সেন্ট্রাল (কেন্দ্রীয়) পর্যায় থেকে যেভাবে চিন্তা করা হয়, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে তার বাস্তবায়ন নেই" –উল্লেখ করে তিনি বলেন, "এমনিতেই ব্যবসায়ীরা চাপে আছে। এখন তাদের ওপর নতুন চাপ বাড়তে পারে।"
বিজিএমইএ, বিকেএমইএ-সহ ব্যবসায়ীদের ৮টি সংগঠন কর কর্মকর্তাদের একটি যৌথ বিবৃতি দিয়ে, কর কর্মকর্তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অবাধে প্রবেশ, নথিপত্র জব্দ ও জরিমানা আরোপের মতো ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়ার এনবিআরের ঘোষণায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম টিবিএসকে বলেন, "কোম্পানিগুলো এনবিআরের হয়ে উৎসে কর সংগ্রহ করে দেয়—যেটি মূলত রাজস্ব কর্তৃপক্ষেরই দায়িত্ব। সেই প্রক্রিয়ায় কোনো কোম্পানির ভুলত্রুটি হলে তার ওপর জরিমানা বা অতিরিক্ত করের দায় চাপানো কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়।"
এভাবে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অবাধে প্রবেশ এবং কর আদায়ের সুযোগ করে দিলে, হয়রানি ও ঘুষের প্রবণতা আরো বাড়বে" –উল্লেখ করে তিনি বলেন, "এতে করে ট্যাক্সেশন সিস্টেম (কর ব্যবস্থা) আরও বিতর্কিত হয়ে পড়ার ঝুঁকি আছে।"
তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য ড. সৈয়দ মো. আমিনুল করিম মনে করেন, এই বিষয় নিয়ে আতঙ্ক তৈরির কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। তিনি বলেন, "কর্মকর্তাদের কাজে বাধা দিলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ, নথিপত্র জব্দ ও জরিমানা করার আইনি ক্ষমতা এনবিআরের আগেই ছিল। সুতরাং এই ক্ষমতাগুলো নিয়ে আলাদা করে নতুন কোনো ঘোষণার প্রয়োজন নেই।"
"এনবিআর যদি কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে কর ফাঁকির সন্দেহ করে, তবে তারা ইতোমধ্যেই সেসব ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। কিন্তু ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে অযথা আতঙ্ক সৃষ্টির কোনো যুক্তি নেই," যোগ করেন তিনি।
তবে উৎসে কর ঘিরে ব্যাপক কর ফাঁকির বিষয়টি তিনিও স্বীকার করেন। তিনি বলেন, "এই ধরনের ফাঁকি বন্ধ করতে এনবিআরকে কার্যকর একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।"
