বিদ্যুতের দাম ১.২৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব বিইআরসির: ব্যবসা ও জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি (টিইসি) খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে ১ টাকা ২৫ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিল্প খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকার গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো এবং কারিগরি কমিটির সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে বিশেষজ্ঞ কমিটির আসন্ন বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আগামী জুন মাসে এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে এবং জুলাই থেকে নতুন মূল্য কার্যকর হতে পারে।
গত বুধবার অনুষ্ঠিত এক গণশুনানিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পৃথকভাবে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ১.২০ টাকা থেকে ১.৫০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে যে, দাম সমন্বয় করা না হলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ঘাটতি মারাত্মকভাবে বেড়ে যাবে।
গতকাল অনুষ্ঠিত অন্য একটি শুনানিতে কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি জানায়, প্রস্তাবিত মূল্য সমন্বয় করা হলে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত কমবে।
কমিটির প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৯৫,৬১২ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিক্রির বিপরীতে সবকটি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার সম্মিলিত নিট রাজস্বের প্রয়োজন হবে ১,১৯,২৮৫ কোটি টাকা।
তবে সিস্টেমে দক্ষতার ক্ষেত্রে সামান্য উন্নতির পূর্বাভাস দিয়ে কমিটি জানিয়েছে, সামগ্রিক বিদ্যুৎ বিতরণ অপচয় (সিস্টেম লস) ২০২৫ অর্থবছরের ৭.৩৮ শতাংশ থেকে সামান্য কমে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৭.৩৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।
কমিটি ৫০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী 'লাইফলাইন' গ্রাহকদের ক্যাটাগরি ছাড়া—অন্য সব ক্ষেত্রে বিদ্যমান মূল্য স্তর বা স্ল্যাব কাঠামো বজায় রাখার সুপারিশ করেছে। কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্য তৈরি নিচের দিকের স্ল্যাবগুলোকে একটি বৃহত্তর ক্যাটাগরিতে একীভূত করার একটি প্রস্তাব বাতিল করা হয়েছে, কারণ এর ফলে প্রান্তিক গ্রাহকদের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারত।
ক্রমবর্ধমান ঘাটতি এবং পাইকারি মূল্যের চাপ
পিডিবি জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে মোট খরচ ১,৪৩,১০৮ কোটি টাকায় পৌঁছাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে, যার ফলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ১২.৯১ টাকা। বিদ্যমান মূল্য কাঠামো অনুযায়ী রাজস্ব আদায় অনেক কম হবে, যা বিদ্যুৎ খাতে একটি বিশাল ঘাটতি তৈরি করবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত এই সংস্থাটি জানায়, দাম প্রতি ইউনিটে ১.২০ টাকা বাড়ানো হলে মাসিক লোকসান ১,৩২৯ কোটি টাকা কমবে এবং ১.৫০ টাকা বাড়ানো হলে এই ঘাটতি ১,৬৬৬ কোটি টাকা কমে আসবে। এই মূল্য সমন্বয় অনুমোদিত হলে সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা প্রায় এক-পঞ্চমাংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়।
এর আগে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১.২৯ টাকা থেকে ১.৬১ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। তবে অংশীজনরা বারবার সতর্ক করে আসছেন যে, দাম বাড়ানো হলে তা সাধারণ পরিবার ও শিল্প-কারখানার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
ক্রমবর্ধমান আর্থিক লোকসানের কথা উল্লেখ করে বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাও খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানোর আবেদন করেছে। এর মধ্যে ডেসকো ৯.৬৭ শতাংশ এবং ডিপিডিসি ৬.৯৬ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কমিশন গণশুনানিতে উপস্থাপিত সব পক্ষের মতামত ও যুক্তি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবে।
অংশীজনদের তীব্র বিরোধিতা
বিদ্যুতখাতের অপচয়, দুর্নীতি ও সিস্টেম লস না কমিয়ে দাম বাড়ানোর উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা অধিকার রক্ষাকারী সংস্থাগুলো। তারা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে এই দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় 'মরার ওপর খাঁড়ার ঘা'র মতো আঘাত করবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন টিবিএসকে বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে এবং এটি শিল্প খাতে একটি নেতিবাচক চেইন রিঅ্যাকশন বা ধারাবাহিক প্রভাব তৈরি করবে, যার ফলে ভোক্তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য আরও বেশি টাকা গুনতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, সীমিত আর্থিক সক্ষমতার কারণে সরকার হয়তো এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে, তবে বিদ্যুৎ খাতের গভীরে জেঁকে বসা দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক অপচয় এবং পরিচালনগত অদক্ষতা দূর না করে—রাষ্ট্র বারবার এই খরচের বোঝা সাধারণ নাগরিকদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে।
শিল্প-কারখানাগুলোর টিকে থাকার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, এই মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানোর বিষয়ে সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
তিনি উল্লেখ করেন যে, কারখানাগুলো ইতোমধ্যেই বিদ্যুতের নিম্নমানের সেবা এবং ঘন ঘন ভোল্টেজ ওঠানামার কারণে ভুগছে, যা তাদের মূল্যবান ও ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি নষ্ট করছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না করে দাম বাড়ানো হলে কম মুনাফা করা ধুঁকতে থাকা কারখানাগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে তিনি যোগ করেন।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, এই মূল্যবৃদ্ধি কৃষি, পরিবহন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোতে বাড়তি খরচের চাপ তৈরি করবে। এর ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়বে, যাদের আয়ও কিন্তু মূল্যস্ফীতির সাথে সংগতি রেখে বাড়েনি।
বিইআরসি-র এই শুনানিতে অংশ নেওয়া শিল্প প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা পুরো আলোচনা প্রক্রিয়াটিকেই একটি 'নিছক আনুষ্ঠানিকতা' হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁরা বলেন, কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষের টিকে থাকার লড়াই এবং স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা রক্ষার চেয়ে—রাষ্ট্রীয় হিসাবের খাতা মেলানো বা ব্যালেন্স ঠিক রাখাকেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
