বিইআরসির গণশুনানিতে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব, অংশীজনদের তীব্র বিরোধিতা
বিদ্যুতের পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানি শুরু হয়েছে। বুধবার (২০ মে) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে প্রথম দিনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বর্তমানে ইউনিটপ্রতি ৭ টাকা ০৪ পয়সা গড় পাইকারি মূল্য থেকে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়, যা প্রায় ১৭ থেকে ২১ শতাংশ বৃদ্ধি। সংস্থাটি জানায়, সরকার বর্তমানে প্রতি ইউনিটে প্রায় ৫ টাকা ৪৭ পয়সা ভর্তুকি দিচ্ছে।
তবে শুনানিতে অংশ নেওয়া প্রায় সব পক্ষই এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে।
পাইকারি বিদ্যুৎ হলো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে বড় পরিমাণে বিতরণকারী সংস্থার কাছে বিক্রি করা বিদ্যুৎ, যা পরে ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র, বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং আমদানি করা উৎস থেকে পাইকারিভাবে বিদ্যুৎ কিনে থাকে। এরপর তা ছয়টি বিতরণ কোম্পানির কাছে বিক্রি করা হয়, যারা বাসাবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
বিপিডিবির কাছ থেকে কোন বিতরণ সংস্থা বিদ্যুৎ কিনছে, তার ওপর ভিত্তি করে পাইকারি মূল্য ভিন্ন হয়। বর্তমানে ইউনিটপ্রতি এই মূল্য ৪ টাকা ৩৬ পয়সা থেকে ৬ টাকা ৪৫ পয়সার মধ্যে রয়েছে।
বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) ইউনিটপ্রতি ৪ টাকা ৩৬ পয়সা, বিপিডিবি ৫ টাকা ৯১ পয়সা, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ৫ টাকা ৩৮ পয়সা এবং নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) ৫ টাকা ০৫ পয়সা পরিশোধ করে।
অন্যদিকে, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ও ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) উভয়ই ইউনিটপ্রতি ৬ টাকা ৪৫ পয়সা করে পরিশোধ করে।
বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় দাঁড়াতে পারে ১,৪৩,১০৮ কোটি টাকা এবং গড় ব্যয় হবে ইউনিটপ্রতি প্রায় ১২ টাকা ৯১ পয়সা। বর্তমান ট্যারিফ অনুযায়ী আয় হবে ৭৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা, ফলে ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ৬৫ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।
বিপিডিবি জানায়, ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ালে ১ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা ঘাটতি কমবে, আর ১ টাকা ৫০ পয়সা বাড়ালে ঘাটতি কমবে ১ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, প্রস্তাবিত বাড়তি ট্যারিফ পুরো ঘাটতি পূরণ না করলেও এতে সরকারের ভর্তুকির চাপ প্রায় এক-পঞ্চমাংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত কমে আসবে।
তবে বিপিডিবির এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে রাজনৈতিক দল, ভোক্তা অধিকার সংগঠন, ব্যবসায়ী ও শিল্প প্রতিনিধিরা। তারা এ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন।
এসময় তারা সতর্ক করে জানায়, নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে ভোক্তার ওপর চাপ বাড়বে এবং দেশের শিল্প খাতের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা আরও দুর্বল হবে।
তাদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ খাতের নীতিগত ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও অদক্ষতার দায় সাধারণ ভোক্তা ও শিল্পখাতের ওপর চাপানো হচ্ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সংগঠনিক সম্পাদক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, সরকার জনগণের দুর্ভোগের চেয়ে আর্থিক হিসাব-নিকাশকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি বলেন, 'সবাই ভর্তুকি আর সরকারি ক্ষতির কথা বলছে, কিন্তু যারা বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছে তাদের কথা কেউ ভাবছে না।'
তিনি আরও বলেন, বারবার ট্যারিফ বাড়ানোর পরিবর্তে বিইআরসির আইনি কাঠামোতে সংস্কার প্রয়োজন।
বামপন্থি রাজনৈতিক দলের নেতারাও শুনানির প্রক্রিয়াকে সমালোচনা করেন।
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, এ ধরনের গণশুনানির পর প্রায়ই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়, ফলে এটি একটি 'প্রহসনে' পরিণত হয়েছে।
ভোক্তা অধিকার কর্মী ও ক্যাব নেতা অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির বলেন, প্রয়োজন হলে সরকারকে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা উচিত, তবুও বিদ্যুতের দাম আবার বাড়ানো উচিত নয়।
ব্যবসায়ীরা সতর্ক করে বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর শিল্পকে আরও চাপে ফেলবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক জামাল উদ্দিন মিয়া বলেন, রপ্তানি কমে যাওয়া ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার শিল্পখাত আগে থেকেই চাপে রয়েছে, নতুন করে বিদ্যুৎ খরচ বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
ছোট ব্যবসায়ী ও মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীরাও বিদ্যুতের দাম কমার প্রত্যাশা করেছিলেন। নতুন করে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে তারা হতাশা প্রকাশ করেন।
বিইআরসির টেকনিক্যাল ইভ্যালুয়েশন কমিটি শুনানিতে জানায়, বিদ্যুতের দাম প্রায় ৭৭ শতাংশ বাড়ানো হলে আর ভর্তুকির প্রয়োজন হবে না— এই মন্তব্য উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের সমালোচনার মুখে পড়ে।
শুনানিতে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বেড়েছে।
বিদ্যুৎ খাতের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ অর্থবছরে গড় উৎপাদন ব্যয় ছিল ইউনিটপ্রতি ২ টাকা ১৩ পয়সা, যা বর্তমানে প্রায় ১৩ টাকায় পৌঁছেছে। মূলত জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে এই ব্যয় বেড়েছে।
বিপিডিবি ছাড়াও দেশের একমাত্র ট্রান্সমিশন সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি ট্রান্সমিশন চার্জ ইউনিটপ্রতি ৩০–৩১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪৮–৪৯ পয়সা করার প্রস্তাব দেয়।
এছাড়া বিভিন্ন বিতরণ সংস্থাও খুচরা বিদ্যুৎ মূল্য বাড়ানোর আবেদন করেছে। ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) ৯.৬৭ শতাংশ এবং ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ৬.৯৬ শতাংশ খুচরা বিদ্যুৎ মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জিল্লুর আহমেদ বলেন, 'চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গণশুনানিতে ওঠা সব মতামত বিবেচনা করা হবে।'
