ঋণের প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী, তবু ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ থেকে ব্যাংকগুলোর বড় মুনাফা: কতটা টেকসই খাত?
বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী থাকলেও ২০২৫ সালে বড় অঙ্কের মুনাফা করেছে দেশের ব্যাংকিং খাত। এর প্রধান কারণ হলো সরকারি ট্রেজারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে আসা উচ্চ মুনাফা, যা আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে প্রথাগত ব্যবসায়িক ঋণের জায়গা নিয়েছে। তবে ব্যাংক পরিচালনার এই মডেল দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মধ্যে ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, যমুনা ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করে ঝুঁকিহীন রিটার্ন পেয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো গত বছর বড় অঙ্কের মুনাফা করেছে।
আর্থিক পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান লায়ন সিটি অ্যাডভাইজরির সংকলিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বেশ কয়েকটি ব্যাংক উল্লেখযোগ্য আয় করেছে। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক উভয়ই ১ হাজার কোটি টাকার মুনাফার মাইলফলক পেরিয়েছে।
ব্র্যাক ব্যাংক এ খাতে সর্বোচ্চ ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ১ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে ৮১৯ কোটি টাকা বা ৫৭ শতাংশ। সরকারি ট্রেজারি সিকিউরিটিজে ব্যাংকটির বিনিয়োগ ২৮ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৪০ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা তাদের মোট সম্পদের ৩১ শতাংশ। ব্যাংকটির মোট আয়ের ৩২ শতাংশ এসেছে ট্রেজারি বিনিয়োগ থেকে।
সিটি ব্যাংক ২০২৫ সালে ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা সমন্বিত নিট মুনাফা করেছে, যা ২০২৪ সালের ১ হাজার ১৪ কোটি টাকার তুলনায় ৩১ শতাংশ বেশি। ট্রেজারিতে ব্যাংকটির বিনিয়োগ আগের বছরের ১২ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৯ হাজার ১২৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এটি তাদের মোট সম্পদের ২৩ শতাংশ। এছাড়া গত বছর ব্যাংকটির আয়ের ৩৫ শতাংশ এসেছে ট্রেজারি কার্যক্রম থেকে।
যমুনা ব্যাংক ট্রেজারি সিকিউরিটিজে ১৯ হাজার ৪০২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, যা তাদের মোট সম্পদের ৪৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির এই বিনিয়োগ ছিল ১২ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট পরিচালন আয়ের ২৩ শতাংশ এসেছে সরকারকে দেওয়া ঋণ থেকে।
মিডল্যান্ড ব্যাংক ২০২৫ সালে ট্রেজারি বিল-বন্ডে ৩ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, যা আগের বছরের ২ হাজার ১২৭ কোটি টাকা থেকে অনেকটাই বেশি। বর্তমানে ব্যাংকটির মোট সম্পদের ২৬ শতাংশ সরকারি সিকিউরিটিজে রয়েছে এবং গত বছর আয়ের ৩৭ শতাংশ এসেছে এই খাত থেকে।
এনসিসি ব্যাংকও সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালের শেষে ট্রেজারি সিকিউরিটিজে তাদের বিনিয়োগ ৬ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা থাকলেও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে ৯ হাজার ১০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ট্রেজারি কার্যক্রম থেকে ব্যাংকটি ২০২৫ সালে ৬০৯ কোটি টাকা আয় করেছে, যা তাদের মোট পরিচালন আয়ের ২১ শতাংশ।
সরকারি সিকিউরিটিজে ঝোঁকার কারণ
ব্যাংকাররা বলছেন, ঋণের উচ্চ সুদহার, ব্যবসায়িক আস্থার অভাব এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে গেছে। এই পরিস্থিতি ব্যাংকগুলোকে নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৬.০৩ শতাংশ, যা ২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ডিসেম্বরে এই হার ছিল ৬.১ শতাংশ, যা ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রেকর্ডকৃত ১০.১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক কম।
নভেম্বরে এই প্রবৃদ্ধি সাময়িকভাবে বেড়ে ৬.৫৮ শতাংশ হলেও বিশ্লেষকদের মতে, এটি উৎপাদন খাতে নতুন বিনিয়োগের ফল ছিল না; বরং ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ঋণ পুনর্গঠন করার ফলে এই প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল।
একইসঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ কোটি টাকা। আগের বছর এটি ছিল ১৮.৮৩ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে আমানত বেড়েছে ১১.৫৭ শতাংশ।
এদিকে, ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ এক বছরের ব্যবধানে ৪০ শতাংশের বেশি বেড়ে ৫.৩৮ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল ৩.৮২ লাখ কোটি টাকা।
২০২৫ সাল শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮.০৯ লাখ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় মাত্র ৬ শতাংশ বেশি।
পুটনাম ক্যাপিটাল অ্যাডভাইজরি পিটিই লিমিটেডের পরিচালক এরশাদ হোসেন বলেন, ব্যাংকগুলো এখন ব্যবসায়িক ঋণ দেওয়ার বদলে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে বেশি ঝুঁকে পড়ছে, কারণ সেখান থেকে প্রায় ১০-১২ শতাংশ মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, 'বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে ২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৬.০৩ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ ২৪ শতাংশ বেড়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিলিংও (নির্ধারিত সীমা) ছাড়িয়ে গেছে।'
'এই পরিবর্তনের ফলে ব্যাংকগুলোর আয়ের কাঠামো মৌলিকভাবে বদলে গেছে। এখন তাদের পরিচালন আয়ের বড় অংশই প্রথাগত ঋণের বদলে সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে আসছে।'
এরশাদ সতর্ক করে বলেন, এই প্রবণতা ইতিমধ্যে সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিল্প বিনিয়োগের অন্যতম সূচক মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে ১০.৪৩ শতাংশ কমেছে। সরকারি ঋণের ৬৭ শতাংশ এখন ব্যাংকগুলো ধারণ করছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিএআর) ১.৫৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সর্বনিম্ন ১২.৫ শতাংশের চেয়ে অনেক কম।
বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে 'ক্রাউডিং আউট' পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যায়, যা বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে।
তারা বলছেন, ট্রেজারি আয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরশীলতা শিল্পায়ন ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমিয়ে দেবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর করে দেবে।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন ঋণের বদলে ট্রেজারি বিনিয়োগের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে অর্থনীতির জন্য একটি 'বিরাট অশুভ নেতিবাচক সংকেত' হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, 'গত বছরটি এমন কেটেছে যে ট্রেজারি বিল থেকে মুনাফা করা ছাড়া কার্যত আর কোনো উপায়ও ছিল না। কারণ ব্যবসায়ীরা ঋণ নিচ্ছেন না।'
তার মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বাহ্যিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাবের কারণে ব্যবসায়ীরা বড় অঙ্কের ঋণপত্র (এলসি) খুলছেন না, মূলধনী যন্ত্রপাতিও আমদানি করছেন না। এমনকি যেসব ব্যবসায়ীর ক্যাশ ক্রেডিট নেওয়ার নির্দিষ্ট সীমা আছে, তারা সেই পরিমাণ ঋণও তুলছেন না।
তিনি আরও বলেন, যেসব ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা আছে এবং যারা আমানত সংগ্রহ করতে পারছে, তারা সেই টাকা সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করে মুনাফা করছে। কারণ করপোরেট ঋণের চাহিদা এখনও বেশ দুর্বল।
মাসরুর আরেফিন সতর্ক করে বলেন, এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধান নয়।
'যদি ঋণের প্রবৃদ্ধি না বাড়ে, তাহলে অর্থনীতিতে কোনো প্রবৃদ্ধি থাকবে না; এতে ব্যাংকগুলোও ভুগবে,' বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, করপোরেট ঋণের দুর্বল চাহিদা পুষিয়ে নিতে সিটি ব্যাংক এখন ক্ষুদ্র ঋণ, ডিজিটাল ন্যানো-ক্রেডিট ও বিকাশ-এর মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান ট্রেজারি আয়ের ওপর এই ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতাকে ব্যাংকিং খাতের একটি 'অন্তর্নিহিত দুর্বলতা' হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ এবং উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করা প্রয়োজন। 'সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ নিরাপদ হলেও এটি অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি বা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরাসরি বড় ভূমিকা রাখে না।'
তার মতে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ব্যবসার প্রতিকূল পরিবেশের কারণে ব্যবসায়ীরা ঋণ নিতে অনাগ্রহী থাকছেন।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ চাঙা করতে এবং ব্যাংকগুলোকে পুনরায় উৎপাদনশীল খাতে ঋণ দিতে উৎসাহিত করতে লজিস্টিক সুবিধা বাড়ানো, কার্যকর 'সিঙ্গেল-উইন্ডো' সেবা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসা করার খরচ কমিয়ে আনা জরুরি।
লায়ন সিটি অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের পরিচালক আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল বলেন, ট্রেজারি আয়ের ওপর এই ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি এড়ানোর মানসিকতা এবং ঋণের চাহিদা হ্রাসেরই প্রতিফলন।
তিনি বলেন, 'এই ধরনের আয় ব্যাংকের মূল ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের অংশ নয় এবং এটি সুদের হারের পরিবর্তনের ওপর অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকগুলোর মুনাফার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।'
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা একইভাবে সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, ট্রেজারি বিনিয়োগ এখন আকর্ষণীয় ও নিরাপদ মুনাফা দিচ্ছে। এতে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি নেই বললেই চলে। কিন্তু উৎপাদনশীল খাতে ঋণ দেওয়া থেকে ব্যাংকগুলোর এই ক্রমাগত সরে আসা দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
