অর্থবছরের ৯ মাসে বিদেশি ঋণের অর্থছাড় ও প্রতিশ্রুতি কমেছে, বেড়েছে ঋণ পরিশোধ
চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় ও বাংলাদেশের আগের নেওয়া ঋণ পরিশোধ সমাল তালে এগোচ্ছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে বৈদেশিক ঋণ ছাড় হয়েছে ৩.৮৯১ বিলিয়ন ডলার। আর একই সময়ে সরকার পরিশোধ করেছে ৩.৫২৫ বিলিয়ন ডলার।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ৯ মাসেবৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় উভয়ই কমেছে, অন্যদিকে বেড়েছে ঋণ পরিশোধ। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় জুলাই -মার্চ সময়ে অর্থছাড় কমেছে ১৯ শতাংশ, প্রতিশ্রুতি কমেছে ৬.৬৯ শতাংশ, আর পরিশোধ বেড়েছে ৯.৭৪ শতাংশ।
ইআরডির কর্মকর্তারা বলেন, চলতি অর্থবছরের শুরুর দিকে বা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও গত অর্থবছরের মতো প্রশাসনে অস্থিরতা ছিল । একই সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে আস্থার সংকট ছিল। নির্বাচনের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কম থাকায় চলতি অর্থবছরে এমনিতেই বৈদেশিক ঋণের ছাড় কম হয়েছে।
তারা আরও বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও এখনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আসেনি। আবার চলমান অনেক প্রকল্পই আবার যাছাই-বাছাই হচ্ছে। এ কারণেও বৈদেশিক অর্থছাড় কমেছে।
অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে জ্বালানি সরবরাহে সৃষ্ট চাপ মোকাবিলায় জোর দিতে হচ্ছে সরকারকে। ফলে দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন সরকারে পাইপলাইনে থাকা প্রকল্পগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করেছে।
এতে করে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে নতুন চুকটি কম হচ্ছে। এ কারণে প্রতিশ্রুতি কমেছে। তবে জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকার নতুন করে ৩.২ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ফলে অর্থবছরের বাকি সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিশ্রুতি বাড়বে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-মার্চ সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি এসেছে ২.৮০৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩.০০৫ বিলিয়ন ডলার। আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন সহযোগীদের সুদ ও আসল মিলেয়ে পরিশোধ করেছে ৩.৫২৫ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে বাংলাদেশ পরিশোধ করেছিল ৩.২১২ বিলিয়ন ডলার।
এর মধ্যে আসল বাবদ বাংলাদেশ উন্নয়ন সহযোগীদের পরিশোধ করেছে ২.২৭৬ বিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩.১৯ শতাংশ বেশি। আর একই সময়ে সুদ বাবদ পরিশোধ করেছে ১.২৪৮ বিলিয়ন ডলার, যা এর আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.৯৬ শতাংশ বেশি।
'সরকার ভবিষ্যতে ঋণ গ্রহণে আরও সতর্ক হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে'
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা মাসরুর রিয়াজ বলেন, বাংলাদেশে চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ প্রতিশ্রুতি ও বিতরণ তুলনামূলক কম হওয়ার পেছনে অন্যতম বড় কারণ ছিল রাজনৈতিক পালাবদল।
তিনি বলেন, অর্থবছরের প্রায় আট মাস দেশটি একটি অরাজনৈতিক অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে পরিচালিত হয়েছে। এই সরকার জানত, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসবে। ফলে তাদের কার্যকাল ছিল সীমিত, যা নীতিনির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত গ্রহণে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
মাসরুর রিয়াজ আরও বলেন, 'এই পরিস্থিতিতে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো স্বাভাবিকভাবেই "ওয়েট অ্যান্ড সি" অবস্থানে চলে যায়। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, অর্থায়ন কৌশল এবং অংশীদারিত্বের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে, তা বোঝার আগে বড় ধরনের নতুন প্রতিশ্রুতি দেওয়া থেকে তারা বিরত থাকে। ফলে প্রতিশ্রুতি কমে গেলেও চলমান প্রকল্পের বাস্তবায়ন পুরোপুরি থেমে থাকেনি; বরং নতুন সরকারের অধীনে তা এগোনোর অপেক্ষায় ছিল।'
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বৈদেশিক ঋণের চাপও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে বাংলাদেশ যে হারে বিদেশি ঋণ গ্রহণ করেছে, তার পরিশোধ এখন ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে। ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা আরও বাড়ছে।
'এতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার ভবিষ্যতে ঋণ গ্রহণে আরও সতর্ক হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে যেসব প্রকল্পে উচ্চ অর্থনৈতিক ও মানবিক রিটার্ন পাওয়া যাবে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আগামী কয়েক বছর বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ কিছুটা সংযত রেখে ঋণ পরিশোধের চাপ সহনীয় পর্যায়ে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে,' বলেন তিনি।
সবচেয়ে বেশি অর্থ ছাড় করেছে রাশিয়া, প্রতিশ্রুতিতে শীর্ষে এডিবি
চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি অর্থছাড় করেছে রাশিয়া—৮২৮.৩৮ মিলিয়ন ডলার। রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পেই এই ঋণ ব্যবহার ব্যবহার করা হচ্ছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক—৪৬৪.৫৬ মিলিয়ন ডলার। এই সময়ে ৬০৭.৬০ মিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে এডিবি। এছাড়া চীন ৫২১.২৪ মিলিয়ন ডলার, জাপান ৩১২.৮৫ মিলিয়ন ডলার ও ভারত ২৪০.৮৪ মিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে।
চলতি অর্থবছরে প্রথম ৯ মাসে সর্বোচ্চ ১.২৬৯ বিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতি এসেছে এডিবির কাছে থেকে। বিশ্বব্যাংকর কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি এসেছে ৪১৬.২৫ মিলিয়ন ডলার। ২৩৫.৬৯ মিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতি এসেছে চীনের কাছ থেকে। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর কাছ এই সময়ে প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে ৩৯২.০৭ মিলিয়ন ডলার।
