আগামী পাঁচ বছরে ২৬ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে, বাড়ছে দেশের আর্থিক চাপ
বাংলাদেশ আর্থিক চাপের এক কঠিন সময়ে প্রবেশ করছে, আগামী পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়তে যাচ্ছে, যা আগে থেকেই দুর্বল অবস্থায় থাকা রাজস্ব ভিত্তির সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে তুলছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর থেকে ২০৩০ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশকে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এই চাপের মাত্রা আরও পরিষ্কার হয়।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশ মোট প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করেছে। অথচ এখন সেই মোট অর্থের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই পরিশোধ করতে হবে।
এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এমন সময়ে, যখন দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে—সমমানের অর্থনীতিগুলোর মধ্যে যা সর্বনিম্ন। ফলে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়া বা ব্যয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে।
একই সঙ্গে, কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং চলমান মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনাসহ একাধিক বৈশ্বিক ধাক্কা—রাজস্ব আদায়, রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের ওপর চাপ তৈরি করেছে, যা ঋণ পরিশোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ইআরডি'র আরেক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭৭.২৮ বিলিয়ন ডলার, যা এক বছর আগে ছিল ৬৮.৮২ বিলিয়ন ডলার।
গত অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করেছে, যা চলতি অর্থবছরে বেড়ে ৪.৭৪ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪.৮৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে—আর ২০২৯-৩০ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে এই বাড়তি দায় সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। তারা সতর্ক করে বলছেন, নতুন ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তাদের মতে, বৈদেশিক ঋণের ফাঁদ এড়াতে হলে জরুরি ভিত্তিতে রপ্তানি বাড়ানো, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং রাজস্ব কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে।
কেন বাড়ছে ঋণের চাপ
অর্থমন্ত্রীর ওয়াশিংটন সফরকে সামনে রেখে ইআরডি'র সর্বশেষ প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়। অর্থমন্ত্রী ও গভর্নর বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন, যেখানে তারা বিশ্বব্যাংকের থেকে নতুন বাজেট সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর ঋণের কিস্তি ছাড়ের চেষ্টা করছেন, যাতে রাজস্ব চাপ কিছুটা কমানো যায়।
প্রতিবেদনের হিসাব ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত নেওয়া বৈদেশিক ঋণের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের নতুন ঋণ এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ একাধিক মেগা প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে অর্থায়ন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ১১.৩ বিলিয়ন ডলারের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা মেট্রোরেল, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্প, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ এবং যমুনা রেলওয়ে সেতু।
এসব প্রকল্পের অনেকগুলোরই এখন গ্রেস পিরিয়ড শেষের পথে বা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, ফলে ঋণের আসল পরিশোধ শুরু হয়েছে এবং ধীরে ধীরে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে।
রূপপুর প্রকল্প ঋণের আসল পরিশোধ ২০২৮ সালে শুরু হবে, যেখানে বার্ষিক পরিশোধ ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে নেওয়া বাজেট সহায়তা ঋণগুলোরও পরিশোধকাল শুরু হওয়ায় চাপ আরও বাড়ছে।
কর্মকর্তারা প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বকেও বড় উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিলম্বের কারণে প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল পেতে বিলম্ব হচ্ছে। আবার কিছু প্রকল্প সম্পন্ন হলেও পরিচালনাগত জটিলতায় সেগুলো অলস পড়ে আছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, রূপপুর প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন দুই বছর আগেই শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা বিলম্বিত হয়েছে। ২০২৪ সালে চীনের ৪৬৭.৮৪ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নে সম্পন্ন সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্প এখনো চালু হয়নি। জাপানের প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারে অর্থায়নের ঢাকা বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পও অপারেটর নিয়োগে বিলম্বের কারণে অলস পড়ে রয়েছে।
২০২৯-৩০ অর্থবছরে সর্বোচ্চ চাপ
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে (চলতি অর্থবছরসহ) বাংলাদেশকে মোট ২৫.৯৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে ১৮.৩৮ বিলিয়ন ডলার ঋণের আসল এবং ৭.৬ বিলিয়ন ডলার সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে ২০৩৪-৩৫ অর্থবছর সময়কালে এই পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৫১.৩৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ঋণের ভিত্তিতে ২০২৯-৩০ অর্থবছরকে সর্বোচ্চ চাপের বছর হিসেবে ধরা হয়েছে, যখন প্রায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৫ অর্থবছরে গড়ে মাসিক প্রায় ২.০৩ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয়ের ভিত্তিতে, সর্বোচ্চ চাপের বছরেও তিন মাসের কম সময়ের রেমিট্যান্স দিয়েই বার্ষিক বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ সম্ভব।
বিদ্যমান ঋণ শোধে লাগবে ৩৭ বছর
ইআরডি'র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত নেওয়া ঋণের ভিত্তিতে বিদ্যমান বৈদেশিক ঋণ পুরোপুরি পরিশোধ করতে বাংলাদেশের ৩৭ বছর সময় লাগবে।
যদি নতুন কোনো ঋণ না নেওয়া হয়, তাহলে ২০৬২-৬৩ অর্থবছরের মধ্যে বর্তমান ঋণ পরিশোধ সম্পন্ন হবে—অর্থাৎ বর্তমান দায় পরিশোধের চাপ দীর্ঘমেয়াদে বহাল থাকবে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট বৈদেশিক ঋণ ছিল ৫.৮৩ বিলিয়ন ডলার। কর্মকর্তাদের হিসাবমতে, প্রতি বছর ঋণের পরিমাণ গড়ে ৮ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার করে বাড়ছে।
ঋণ অনুপাতে চাপ
ইআরডি'র 'বাংলাদেশে বৈদেশিক সম্পদের প্রবাহ' শীর্ষক সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত এখনো বৈশ্বিক মানদণ্ডে কম থাকলেও তা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে এই হার দাঁড়িয়েছে ১৮.৯৯ শতাংশ, যা আগের বছর ছিল ১৭.০৩ শতাংশ; যেখানে ৪০ শতাংশকে মানদণ্ড ধরা হয়। একই সময়ে রাজস্বের তুলনায় ঋণের অনুপাত ১৬.৫৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬.৯২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আইএমএফ-এর নির্ধারিত ১৮ শতাংশ সীমার কাছাকাছি।
ইআরডি সতর্ক করেছে, রাজস্ব আয় বাড়ানো না গেলে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশের বর্তমান "স্বস্তিকর অবস্থান" হারাতে পারে।
তবে অন্যান্য সূচকে কিছুটা ইতিবাচক দিকও রয়েছে। পণ্য ও সেবা রপ্তানি এবং প্রবাসী আয়ের তুলনায় ঋণের অনুপাত কিছুটা কমে ১১০.০৯ শতাংশ থেকে ১০৫.৮৭ শতাংশে নেমেছে, যা আইএমএফের ১৮০ শতাংশ সীমার অনেক নিচে।
'রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বাড়ানো জরুরি'
ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এই পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের জন্য "অনিবার্য বাস্তবতা" হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, "রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স তাল মিলিয়ে না বাড়লে অর্থনীতি চাপের মুখে পড়তে পারে।"
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঋণ ঝুঁকি 'নিম্ন' থেকে 'মধ্যম' পর্যায়ে যাওয়ার পেছনে জিডিপির তুলনায় ঋণ নয়, বরং রাজস্ব ও রপ্তানির তুলনায় ঋণের অবনতিই বেশি দায়ী।
তিনি সতর্ক করে বলেন, দুর্বল রাজস্ব আহরণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ইতোমধ্যে অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। "উন্নতি না হলে মধ্যম ঝুঁকি উচ্চ ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।"
তিনি বিশেষ করে জ্বালানি খাতে ঋণনির্ভর প্রকল্প নির্বাচনে কঠোর যাচাইয়ের আহ্বান জানান। যাতে গ্যাস সংকট কমানো, শিল্প উৎপাদন বাড়ানো এবং রপ্তানি সহায়তা নিশ্চিত করা যায়।
তার মতে, ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্তে ঋণের পরিমাণ নয়, বরং ভবিষ্যৎ রপ্তানি আয় ও রাজস্ব সক্ষমতার ভিত্তিতে পরিশোধযোগ্যতা বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত খেলাপি হয়নি। তবে বৈশ্বিক মন্দা, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চাপ এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে এই অবস্থান টেকসই নাও হতে পারে। "ঋণ পুনঃতফসিল বা পরিশোধে বিলম্ব হলে তা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে এবং ভবিষ্যতে ঋণের খরচ বাড়াবে।"
'সামর্থ্য বৃদ্ধি জরুরি'
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, বাড়তি ঋণ পরিশোধ এবং নতুন ঋণ গ্রহণ—দুইয়ের মধ্যে অর্থনীতি এখন একটি সংকটময় মোড়ে রয়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ঋণের সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে পরিস্থিতি সংকটে রূপ নিতে পারে। এ জন্য তিনি চারটি ক্ষেত্রে জরুরি সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলেন—রপ্তানি সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি।
তিনি বলেন, শুধু তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীলতা যথেষ্ট নয়; কৃষিপণ্য, চামড়াজাত পণ্য এবং হালকা প্রকৌশল খাতে বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন।
মুস্তফা কে মুজেরী আরও বলেন, প্রবাসী আয় এখনো অর্থনীতির অন্যতম প্রধান লাইফলাইন, যা বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষণ বাড়ানোর মাধ্যমে শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো সহজ ও আকর্ষণীয় করতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে, যা একটি কাঠামোগত দুর্বলতা। "এই সীমিত রাজস্ব ভিত্তি বড় আকারের ঋণ পরিশোধ এবং উন্নয়ন ব্যয় একসঙ্গে বহন করার জন্য যথেষ্ট নয়।"
তিনি কর ব্যবস্থার সংস্কার, কর ফাঁকি রোধ এবং করের আওতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। "নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ শিল্প উৎপাদন সচল রাখার জন্য অপরিহার্য।"
