বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল, ৫৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরও অনিশ্চয়তায়
দেশে প্রথমবারের মতো বেসরকারি উদ্যোগে সাবমেরিন ক্যাবল চালুর উদ্যোগ নিলেও আন্তঃমন্ত্রণালয় লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। ইতিমধ্যে প্রাথমিক কাজ বাবদ ৫৩ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা) খরচ করা হলেও, প্রকল্পটি বর্তমানে স্থবির হয়ে আছে।
'বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্যাবল সিস্টেম' কনসোর্টিয়াম—যাতে রয়েছে সামিট কমিউনিকেশনস, সিডিনেট কমিউনিকেশনস এবং মেটাকোর সাবকম লিমিটেড—বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এনএসআই-এর অনাপত্তিপত্রের অপেক্ষায় রয়েছে। এই ছাড়পত্র না পাওয়ায় ক্যাবল স্থাপনের বিশেষায়িত জাহাজগুলো বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করতে পারছে না।
এই প্রকল্পটি সিঙ্গাপুর থেকে মায়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত ২,২২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ 'ইউএমও' ক্যাবল সিস্টেমের প্রধান রুটের সাথে কক্সবাজার পর্যন্ত ১,৩০০ কিলোমিটারের একটি সংযোগ শাখা তৈরি করবে। কনসোর্টিয়াম সতর্ক করেছে, এপ্রিলের মধ্যে অনুমোদন না পেলে তারা ২০২৬ সালের ৩১ আগস্টের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা মিস করবে। কারণ বঙ্গোপসাগরের তলদেশে কেব্ল স্থাপনের জন্য নভেম্বর থেকে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়টিই উপযুক্ত।
গত ৩১ মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে, পানামা ও ইন্দোনেশিয়ার পতাকাবাহী জাহাজগুলোকে কেব্ল বেছানোর জন্য বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ জানায় কনসোর্টিয়াম। তবে কর্মকর্তাদের মতে,বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে এর অগ্রগতি থমকে গেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কনসোর্টিয়ামটিকে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে বলা হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত এ সংক্রান্ত কোনো চিঠিপত্র বা যোগাযোগ তাদের কাছে পৌঁছায়নি। তিনি বলেন, "প্রটোকল অনুযায়ী, অন্য একটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা কোনো সংস্থার চিঠির ওপর ভিত্তি করে আরেকটি মন্ত্রণালয় সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারে না।"
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি সচিব বিলকিস জাহান রিমি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তার মন্ত্রণালয় এখনো কোনো চিঠি পায়নি। তিনি বলেন, "চিঠি পাওয়া গেলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।"
যদিও দাপ্তরিক নথিপত্র বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরেই আন্তঃমন্ত্রণালয় সহযোগিতার অনুরোধ জানিয়ে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল কনসোর্টিয়াম।
প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা
কনসোর্টিয়ামটি ইতিমধ্যে প্রকল্পের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি মাইলফলক অর্জন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই, সমুদ্রতলের বিস্তৃত রুট জরিপ, মিয়ানমারের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রুট নির্ধারণ এবং সিঙ্গাপুর-মিয়ানমার অংশের সংযোগ সক্রিয়করণ।
প্রকল্পটি বর্তমানে 'শোভেল-রেডি' বা বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে; ল্যান্ডিং স্টেশন এবং বিচ ম্যানহোল নির্মাণের কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। এর পাশাপাশি, কেব্ল স্থাপনের জন্য বিশেষায়িত জাহাজ এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দলের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছে, যারা এখন কাজ শুরু করার জন্য চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
আসন্ন সময়সীমা
প্রকল্পটির শর্তানুসারে, ২০২৬ সালের ৩১ আগস্টের মধ্যে সেবা চালু করার (রোল-আউট অবলিগেশন) একটি কঠোর সময়সীমা রয়েছে। তবে কারিগরি বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগরের তলদেশে কেব্ল স্থাপনের কাজ কেবল নভেম্বর থেকে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত করা সম্ভব।
প্রয়োজনীয় অনুমোদন না পাওয়ায় যদি এপ্রিলের এই সুযোগ হাতছাড়া হয়, তবে আসন্ন বর্ষা মৌসুমের কারণে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন আরও অন্তত এক বছর পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
সামিট কমিউনিকেশনস-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরিফ আল ইসলাম বলেন, "আমরা ইতিমধ্যে প্রকল্পের মোট ব্যয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ বিনিয়োগ করেছি। আমরা এখন এক জটিল পরিস্থিতির আবর্তে বন্দি। সরকার যদি বেসরকারি সাবমেরিন কেব্ল না-ই চায়, তাহলে কেন আমাদের অবকাঠামো ও লাইসেন্সের পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করতে উৎসাহিত করা হলো?"
উল্লেখ্য, কনসোর্টিয়াম ইতিমধ্যে লাইসেন্স ফি, ভ্যাট এবং অন্যান্য খরচ বাবদ ৫৩ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এর মধ্যে ইউএমও ট্রাঙ্ক কেব্লের জন্য ৪৩.৭৬ মিলিয়ন ডলার প্রদান করা হয়েছে কেব্ল মালিকানা প্রতিষ্ঠান 'কম্পানা প্রাইভেট লিমিটেড'-কে, যার মধ্যে ৩৬ মিলিয়ন ডলার আইআরইউ ফি এবং ৭.৯৬ মিলিয়ন ডলার রক্ষণাবেক্ষণ খরচ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।
একচেটিয়া আধিপত্য বনাম প্রতিযোগিতা
বর্তমানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন 'বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্লস পিএলসি' বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের সি-মি-উই-৪ এবং সি-মি-উই-৫ কেব্লের মাধ্যমে ৭,২২০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ১,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তৃতীয় আরেকটি রাষ্ট্রায়ত্ত কেব্ল সি-মি-উই-৬ আগামী বছর চালু হওয়ার কথা রয়েছে, যার সক্ষমতা হবে ৪০,০০০ জিবিপিএস-এর বেশি।
বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্লস আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, বেসরকারি খাতের প্রবেশে বাজারে 'চরম অস্থিরতা' তৈরি হতে পারে এবং এতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিটির রাজস্ব কমে যেতে পারে। সাম্প্রতিক এক অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে কোম্পানিটি পরামর্শ দিয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত কেব্লের ব্যবহার যাতে ৫০ শতাংশের নিচে না নামে, সে জন্য সরকারের একটি ন্যূনতম সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্লস এর একজন কর্মকর্তা বলেন, পুঁজিবাজারে একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানি হওয়ায় কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সরকারকে অবশ্যই এর শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থও বিবেচনা করতে হবে।
তবে আইটি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, সাবমেরিন কেব্লের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা বর্তমানে একটি একচেটিয়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যবসা। এই প্রেক্ষাপটে, বেসরকারি সাবমেরিন কেব্লের অনুমোদন ছিল বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পথে একটি বড় মাইলফলক।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করবে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য ইন্টারনেটের খরচ কমিয়ে আনবে। তারা যুক্তি দিচ্ছেন যে, কানেক্টিভিটি সাশ্রয়ী হলে বিশাল এক জনগোষ্ঠী ইন্টারনেটের আওতায় আসবে, যা দেশের মাথাপিছু ইন্টারনেট ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে।
ইন্টারনেট ব্যবহারের চিত্র
গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ইন্টারনেটের প্রবেশাধিকার ও ব্যবহার হার ৫৩ শতাংশ, যা প্রতিবেশী দেশ ভুটানের ৮৮ শতাংশ এবং মালদ্বীপের ৮৫ শতাংশের তুলনায় অনেক কম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারিত হলেও কানেক্টিভিটি, সক্ষমতা এবং গ্রামীণ এলাকায় সেবার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সংযোগের ক্ষেত্রে দুটি সমুদ্রতলদেশীয় কেব্লই প্রায় একই রুট অনুসরণ করায় নিরাপত্তার ঝুঁকিও রয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
