ঈদের বন্ধ ও ইরান যুদ্ধে ব্যাহত শিপমেন্ট: মার্চে রপ্তানি আয় কমেছে ১৮ শতাংশ
জাতীয় নির্বাচনের পর রপ্তানিতে ইতিবাচক ধারা দেখার আশা করা হলেও নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্বিতীয় মাস মার্চে রপ্তানিতে বড় ধাক্কা খেল বাংলাদেশ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত মার্চে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮.০৭ শতাংশ কমেছে।
তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের মার্চে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় হয়েছে ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার। আর ২০২৫ সালের একই মাসে রপ্তানি আয় এসেছিল ৪.২৫ বিলিয়ন ডলার।
এই নিয়ে টানা আট মাস বাংলাদেশের রপ্তানি কমল। এর মধ্যে মার্চের রপ্তানি কমে যাওয়ার হার আগের আট মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, মূলত দুটি কারণে রপ্তানি এতটা কমেছে। একটি হলো ঈদের লম্বা ছুটির কারণে পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। দ্বিতীয় কারণ, ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী ক্রয়াদেশে নেতিবাচক প্রভাব।
তৈরি পোশাক খাত দেশের রপ্তানি প্রধানপণ্য। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। কিন্তু আলোচ্য সময়ে খাতটির রপ্তানি কমেছে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ।
তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানান, মার্চ মাসে কারখানাগুলোতে ৭ থেকে ১০ দিন ছুটি ছিল। এই সময়ে উৎপাদন কাজ বন্ধ থাকায় রপ্তানি তেমন হয়নি।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে রপ্তানিকারকরা অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে এখন সতর্ক হয়ে গেছে। এসব কারণে ওই মাসে রপ্তানি কমেছে।'
বিজিএমইএ সভাপতি আরও বলেন, 'আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অপেক্ষা করছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের জন্য। আশা ছিল নির্বাচনের পর ক্রয়াদেশে গতি আসবে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে।'
শিল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেভাবে নেতিবাচক ধারা চলছে, তা বাংলাদেশের পোশাক খাতে নজিরবিহীন। ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা শুল্ক আরোপের মধ্য দিয়ে এই মন্দা অবস্থার শুরু হয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ক্রেতাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ক্রয়াদেশ কমিয়ে দেয়।
উদক্তারা আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে এবং সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম টিবিএসকে বলেন, 'জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় একদিকে চাহিদা কমছে, অন্যদিকে স্থানীয় উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে—যা রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।'
তিনি শিল্প খাতে জ্বালানি তেল সরবরাহে অগ্রাধিকার দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) সভাপতি টিপু সুলতান জানান, সাধারণত মার্চ মাস থেকেই পরবর্তী শীত মৌসুমের ক্রয়াদেশ আসা শুরু হয়।
'কিন্তু এবার যুদ্ধ, জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়াসহ অনিশ্চয়তার কারণে ক্রেতারা খুবেই ধীরগতিতে এগোচ্ছেন। আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতির তেমন উন্নতির সম্ভাবনা দেখা যচ্ছে না। যুদ্ধ যদি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেও শেষ হয়, অনিশ্চয়তা থেকে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যে যে পরিমাণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাতে আগামী এক বছর জ্বালানির দাম প্রতি ব্যারেল ০০ ডলারের নিচে নামার সম্ভাবনা কম,' বলেন তিনি।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তবে চলতি অর্থবছরের বাকি তিন মাসে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ইপিবির তথ্য বলছে, তৈরি পোশাক ছাড়াও প্রধান পণ্যের বেশিরভাগেরই রপ্তানি কমেছে মারছে। এ তালিকায় রয়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য এবং প্রকৌশল পণ্য। তবে এই সময়ে প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি কিছুটা বেড়েছে।
জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত মোট রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৫.৩৯ বিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কম।
