জাহাজ ভাড়ার ঊর্ধ্বগতিতে ঝুঁকির মুখে রপ্তানি, বাড়ছে মূল্যস্ফীতির শঙ্কা
যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে ঝুঁকি বাড়া এবং পরিবহন সক্ষমতা সংকুচিত হওয়ায় জাহাজ ভাড়া দ্রুত বাড়ছে। সম্ভাব্য হামলা এড়াতে অনেক জাহাজ নিরাপদ জলসীমায় অপেক্ষা করছে, আবার কিছু জাহাজ দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বিকল্প পথ বেছে নিচ্ছে। একই সঙ্গে তেলের সরবরাহ সংকুচিত হওয়ায় বাংকার ফুয়েলের (জাহাজের জ্বালানি) দাম বেড়েছে এবং বীমা প্রিমিয়ামও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অভিঘাত এখন বাংলাদেশেও অনুভূত হচ্ছে।
দেশে পরিচালনাকারী শিপিং লাইনগুলো কনটেইনার ডিটেনশন চার্জ ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে এবং জরুরি জ্বালানি সারচার্জ (ইএফএস) আরোপ করেছে। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ বিঘ্ন ও চাহিদা হ্রাসে আগে থেকেই চাপে থাকা ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন বোঝা চেপে বসেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর সম্মিলিত প্রভাব লজিস্টিক ব্যয় প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে—যা আমদানি ব্যয় বাড়াবে, রপ্তানিকারকদের মুনাফা কমাবে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি বাড়াবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সহসভাপতি রকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, অধিকাংশ শিপিং কোম্পানি ডিটেনশন চার্জ ও জ্বালানি সারচার্জ উভয়ই বাড়িয়েছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) তিনি বলেন, "এই মাসের শুরুতে তারা জ্বালানি সারচার্জ আরোপ করেছে, যা আমাদের খরচের হিসাবের মধ্যে ছিল না।"
এর প্রভাব ইতোমধ্যেই ফ্রেইট চার্জ বা জাহাজে মালবহনের ভাড়ায় দেখা যাচ্ছে। সাংহাই থেকে ২০ ফুটের একটি কাপড়ের কনটেইনার আমদানির খরচ ফেব্রুয়ারির ১,৫০০ ডলার থেকে মার্চে বেড়ে ১,৯০০ ডলার হয়েছে। একই রকম কনটেইনারে লস অ্যাঞ্জেলেসে পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে ভাড়া ২,৩০০ ডলার থেকে বেড়ে ২,৯০০ ডলার হয়েছে।
তিনি বলেন, "উভয় রুটেই শিপিং খরচ প্রায় ২৬-২৭ শতাংশ বেড়েছে।"
চীন-বাংলাদেশ সামুদ্রিক রুট দেশের পোশাক বাণিজ্যের প্রধান ভিত্তি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১৮.৪৪ বিলিয়ন ডলারের টেক্সটাইল ও পোশাকের কাঁচামাল আমদানি করেছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশ এসেছে চীন থেকে—এ তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন।
বাংলাদেশে ২০টির বেশি শিপিং লাইন কার্যক্রম পরিচালনা করে। এর মধ্যে মায়েরস্ক একাই দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কনটেইনার পরিবহন করে। এছাড়া ওশেন নেটওয়ার্ক এক্সপ্রেস, সিএমএ সিজিএম, এমএসসি এবং হ্যাপাগ-লয়েড-এর মতো অন্যান্য বড় কোম্পানিও রয়েছে।
জাহাজ ভাড়া, জ্বালানি ও আনুষঙ্গিক খরচ একসঙ্গে বাড়ায় অনেক আমদানিকারক এখন অপেক্ষা করে দেখার নীতি গ্রহণ করছেন।
দেশের বড় পণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তিনি আমদানি স্থগিত রেখেছেন।
তিনি বলেন, "প্রতি টনে ভাড়া ২০-২৫ ডলার বেড়েছে। আর গত ১০ দিনে গমের দাম প্রতি টনে প্রায় ৩০ ডলার বেড়েছে। পণ্যদ্রব্যের দামে এই অস্থিরতা ও বাড়তি ফ্রেইট চার্জের কারণে আপাতত আমরা আউট অব মার্কেট আছি।"
জ্বালানি খরচের চাপ গ্রাহকের ওপর
কনটেইনার ক্যারিয়ার আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের বাড়তি পরিচালন ব্যয় গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। ওশেন নেটওয়ার্ক এক্সপ্রেস বিভিন্ন রুটে নতুন করে জ্বালানি সারচার্জ আরোপ করেছে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী ট্রান্স-প্যাসিফিক, ট্রান্স-অ্যাটলান্টিক, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন রুটে এই চার্জ প্রযোজ্য হয়েছে।
নতুন হারের অধীনে, এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলে ২০ ফুট কনটেইনারে ১৬০ ডলার এবং ড্রাই কার্গোর জন্য ৪০ ফুট কনটেইনারে ৩২০ ডলার সারচার্জ আরোপ করা হচ্ছে। রেফ্রিজারেটেড কনটেইনারে এ হার আরও বেশি—যথাক্রমে ২১০ ও ৪২০ ডলার।
এশিয়া, ইউরোপ এবং ইউরোপের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য রুটগুলোতেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে মূল (হেডহল) রুটে ফিরতি যাত্রার তুলনায় বেশি সারচার্জ আরোপ করা হচ্ছে। ইউরোপ-লাতিন আমেরিকার কিছু করিডোরে এই সারচার্জ ইউরো মুদ্রায় নির্ধারণ করা হচ্ছে, যেখানে ২০ ফুট কনটেইনারের জন্য প্রায় ৬৯ ডলার সমপরিমাণ হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যগামী রুটগুলোও নতুন ট্যারিফ কাঠামোর আওতায় এসেছে, যেখানে কার্গোর ধরন ও গন্তব্য অনুযায়ী জরুরি জ্বালানি সারচার্জ (ইএফএস) ৮০ থেকে ৩২০ ডলারের মধ্যে নির্ধারিত হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানির দামের ওঠানামা এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে বৈশ্বিক শিপিং খাতে যে অস্থিরতা চলছে, এই সমন্বয়গুলো তারই প্রতিফলন।
ডিটেনশন চার্জও বাড়ছে
একই সময়ে প্রায় সব আন্তর্জাতিক শিপিং লাইন কনটেইনার ডিটেনশন ও ডেমারেজ চার্জ বাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএ কর্মকর্তারা।
মায়েরস্ক বাংলাদেশ আগামী ৬ এপ্রিল থেকে কনটেইনার ডিটেনশন চার্জ সংশোধন করেছে, যেখানে বিভিন্ন ধরনের কনটেইনারে প্রতিদিনের চার্জ প্রায় ৭-১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
ফ্রি-টাইম এলাউন্স অপরিবর্তিত থাকলেও নির্ধারিত সময়ের বেশি কনটেইনার রাখার খরচ বেড়েছে। আমদানির ক্ষেত্রে ড্রাই কনটেইনারে চার দিনের ফ্রি-টাইম থাকছে, তবে এরপর প্রতিদিনের চার্জ সব স্তরেই বাড়বে। রেফ্রিজারেটেড কনটেইনার, যেখানে ফ্রি-টাইম মাত্র দুই দিন, সেগুলোর ক্ষেত্রেও দৈনিক ফি বাড়ানো হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, অন্যান্য শিপিং কোম্পানিও একই ধরনের সমন্বয় করেছে। ওশেন নেটওয়ার্ক এক্সপ্রেস ১ এপ্রিল থেকে বিভিন্ন ধরনের কনটেইনারে প্রায় ৪-৭ শতাংশ পর্যন্ত ডিটেনশন চার্জ বাড়িয়েছে।
শিপিং অপারেটরদের মতে, জাহাজের ধারণক্ষমতা সংকুচিত হওয়া, বৈশ্বিক শিপিং নেটওয়ার্কে ব্যাঘাত এবং কনটেইনার স্পেসের ধারাবাহিক চাহিদা বৃদ্ধির কারণেই এসব চার্জ বাড়ানো হয়েছে।
তবে লজিস্টিকস সেবা খাতের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বড় বেশিরভাগ শিপিং লাইন এখনও ডিটেনশন সারচার্জ আরোপ করেনি, যদিও তারা কনটেইনার সংকটের অজুহাত তুলে ধরছে। এ কারণেই এখনো পর্যন্ত ডিটেনশন সারচার্জের প্রভাব পুরোপুরি অনুভূত হয়নি বলে তারা মনে করছেন।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ- এর সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, "পরিস্থিতি এমনই চলতে থাকলে এপ্রিল মাসে এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যেতে পারে।"
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি সারচার্জ ইতোমধ্যেই আরোপ করা হয়েছে, যা বৈশ্বিকভাবে ফ্রেইট কস্ট (ভাড়া) উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে এবং এতে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে। এরশাদ আহমেদ এক্সপেডিটর্স (বাংলাদেশ) লিমিটেডেরও কান্ট্রি ম্যানেজার ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
ব্যবসায়ীরা প্রভাব মোকাবিলার প্রস্তুতিতে
রপ্তানিকারক ও আমদানিকারকরা সতর্ক করে বলেছেন, লজিস্টিক ব্যয় বৃদ্ধি বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বাড়ার প্রভাব মূল্যস্ফীতিতেও পড়তে পারে।
বিজিএমইএ'র পরিচালক আবু আবু তৈয়ব বলেন, বাড়তি খরচ আমাদের বায়ারদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ খুব একটা নেই।
তিনি বলেন, "ক্রেতারা বাড়তি ফ্রেইট বা ডিটেনশন চার্জ পরিশোধ করবে না। এই খরচ আমাদেরই বহন করতে হচ্ছে, ফলে মুনাফা কমছে এবং প্রতিযোগী সক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে।"
ভাড়া বাড়ানোর পক্ষে শিপিং কোম্পানিগুলোর যুক্তি
অন্যদিকে শিপিং কোম্পানিগুলো বলছে, এই ভাড়া বৃদ্ধি এড়ানো সম্ভব নয়। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন জানান, পরিচালন ব্যয় ব্যাপক হারে বেড়েছে।
তিনি বলেন, "মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানির দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের নিচ থেকে বেড়ে প্রায় ১১৮ ডলারে পৌঁছেছে, আর বীমা প্রিমিয়াম ৫০-৬০ শতাংশ বেড়েছে।" তিনি আরও জানান, সংঘাতপূর্ণ এলাকা এড়াতে জাহাজগুলো দীর্ঘ রুট ব্যবহার করছে, যার ফলে জ্বালানি খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
মায়েরস্ক বাংলাদেশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই ডিটেনশন চার্জ সমন্বয় করা হয়।
তিনি বলেন, "ডিটেনশন চার্জ প্রতি বছর বাড়ে না, এটি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।" বাংকার জ্বালানি ও বীমা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সামগ্রিক পরিচালন খরচ বেড়েছে বলেও জানান তিনি।
"শুধু মায়েরস্ক নয়, সব শিপিং কোম্পানিই বাড়তি খরচ সামাল দিতে ডিটেনশন চার্জ বাড়িয়েছে এবং একইভাবে জ্বালানি সারচার্জ আরোপ করেছে," যোগ করেন তিনি।
সামনে পরিকল্পনার চ্যালেঞ্জ
ফ্রি-টাইম শেষ হওয়ার পর ডিটেনশন চার্জ দ্রুত বাড়ায়—ব্যবসায়ীদের এখন আরও দক্ষ লজিস্টিকস পরিকল্পনার চাপ নিতে হচ্ছে।
কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের বিলম্ব, বন্দরের জট বা দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবহন সমস্যার কারণে এখন অতিরিক্ত জরিমানা গুনতে হতে পারে বলে সতর্ক করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকায়—নিকট ভবিষ্যতে জাহাজ ভাড়া ও সংশ্লিষ্ট খরচ উচ্চ পর্যায়েই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে—যা বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
