ঋণ খারাপ হওয়ার আগেই রাখতে হবে প্রভিশন: কেন্দ্রীয় ব্যাংক
দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক প্রতিবেদনের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস-৯) অনুযায়ী এখন থেকে কোনো ঋণ খারাপ হওয়ার আগেই সম্ভাব্য ক্ষতির কথা বিবেচনা করে ব্যাংকগুলোকে 'প্রভিশন' বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হবে। এজন্য প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতি (ইসিএল) পদ্ধতি চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
রোববার (৯ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন বা নীতিমালা জারি করেছে। নতুন এই ব্যবস্থা ২০২৮ সাল থেকে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে।
বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলো 'ইনকারড লস' বা ক্ষতি হওয়ার পর প্রভিশন রাখার পদ্ধতি অনুসরণ করে। অর্থাৎ কোনো ঋণ খারাপ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরই কেবল সেটির বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখা হয়।
তবে নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এখন থেকে ব্যাংকগুলোকে সম্ভাব্য ঋণ ক্ষতির পূর্বাভাসের ভিত্তিতে আগাম প্রভিশন রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে শুধু অতীতের তথ্য নয়, বরং বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সামষ্টিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস—যেমন জিডিপি প্রবৃদ্ধি, সুদের হার ও মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে ঋণের ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ বিষয়ে জানান, বর্তমান পদ্ধতিতে ঋণ খারাপ হওয়ার পর প্রভিশন করতে হয়, যা অনেক সময় ব্যাংকের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু নতুন পদ্ধতিতে ঋণের সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আগেভাগেই প্রভিশন রাখা হবে। এর ফলে কোনো ঋণ শেষ পর্যন্ত খেলাপি হলেও ব্যাংককে পুরো প্রভিশনের চাপ একসঙ্গে নিতে হবে না, যা ব্যাংকের মূলধন ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করবে।
তিনি আরও জানান, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলোকে মূলধন সমন্বয়ের জন্য ২০২৮ সাল থেকে অতিরিক্ত ৫ বছর সময় দেওয়া হয়েছে। এতে করে সম্ভাব্য মূলধন চাপ সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে। এছাড়া নতুন পদ্ধতি চালুর ফলে কোনো ব্যাংকের মূলধন কমে গেলে নির্দিষ্ট হারে তা পুনঃসংযোজনের সুযোগও রাখা হয়েছে গাইডলাইনে।
ঋণ শ্রেণিকরণের ৩ ধাপ
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, আইএফআরএস-৯ অনুসরণ করে ঋণকে তিনটি ধাপে শ্রেণিকরণ করা হবে:
প্রথম ধাপ: স্বাভাবিক ঋণের ক্ষেত্রে পরবর্তী ১২ মাসের সম্ভাব্য ক্ষতির ভিত্তিতে প্রভিশন নির্ধারণ করা হবে।
দ্বিতীয় ধাপ: ঋণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলে পুরো মেয়াদের সম্ভাব্য ক্ষতির ভিত্তিতে প্রভিশন রাখতে হবে।
তৃতীয় ধাপ: 'ক্রেডিট ইমপেয়ার্ড' বা ক্ষতিগ্রস্ত ঋণের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মেয়াদের সম্ভাব্য ক্ষতির ভিত্তিতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে।
এছাড়া নতুন কাঠামোতে সুদ আয়ের স্বীকৃতিতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ঋণের ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী সুদ আয়ের হিসাব নির্ধারণ করা হবে, যার ফলে ব্যাংকের প্রকৃত আয় ও ঝুঁকির চিত্র আরও বাস্তবসম্মতভাবে আর্থিক প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, ২০২০ সালে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) বাংলাদেশে এই মানদণ্ড বাস্তবায়নের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করলেও এতদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন ছিল না। নতুন এই গাইডলাইন জারির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক এই মানদণ্ড আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়নের পথ তৈরি হলো। উল্লেখ্য, দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে এই পদ্ধতি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করেছে।
