ফেব্রুয়ারিতেও রপ্তানি আয় তলানিতে, টানা ৭ মাস কমছে রপ্তানি
বিশ্ববাজারে চাহিদায় মন্দা এবং চলমান ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় টানা সপ্তম মাসের মতো বাংলাদেশের রপ্তানি আয় নেতিবাচক ধারায় রয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) আজ (২ মার্চ) যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা গেছে ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি আয় ৩.৫০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এটি জানুয়ারির তুলনায় ২০ দশমিক ৮১ শতাংশ কম এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ কম।
২০২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) মোট রপ্তানি গত বছরের তুলনায় তিন দশমিক ১৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে।
তৈরি পোশাক (আরএমজি), যা দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি, এই সময়ে গত বছরের তুলনায় তিন দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই পোশাক খাতের আয় আগের মাসের তুলনায় ২২ দশমিক এক শতাংশ এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ কমেছে, যা ক্রয়াদেশের প্রবাহ কমে যাওয়া এবং জাহাজীকরণের অস্থিরতাকে প্রতিফলিত করে। এই খাতের মধ্যে নিটওয়্যার রপ্তানি চার দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক রপ্তানি দুই দশমিক ৭৯ শতাংশ কমেছে।
বিশেষজ্ঞরা যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি কমে যাওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্ক নীতিকে দায়ী করছেন। অন্যদিকে চীন ও ভারতের আগ্রাসী রপ্তানি নীতি ইউরোপের বাজারে পণ্যের দাম কমিয়ে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বেশ কয়েকটি দেশে চাহিদার মন্দা এই চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
রপ্তানি বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, ইরান ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলা এবং ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা রপ্তানি মন্দাকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।
তবে রপ্তানিকারকরা এই সংকোচনের পেছনে একাধিক চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছেন।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান বাবলু দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'ট্রাম্পের শুল্ক নীতির কারণে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় মার্কিন ক্রেতারা পোশাক আমদানি কমিয়ে দিয়েছে। এদিকে চীন ও ভারত ইউরোপ ও অন্যান্য বাজারে কম দামে পণ্য বিক্রি করছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও আমাদের প্রতিযোগিতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।'
বাবলু আরও বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচনের পর পরিস্থিতির উন্নতির যে আশা ছিল, তা ইরান-ইসরায়েল সংঘাতসহ নতুন ভূ-রাজনৈতিক উত্তজনায় ম্লান হয়ে গেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম দীর্ঘমেয়াদী সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'বিশ্ব বাণিজ্যে প্রাসঙ্গিক থাকতে হলে বাংলাদেশকে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে, সুদের হার কমাতে হবে, জ্বালানির দাম স্থিতিশীল করতে হবে এবং প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার বজায় রাখতে হবে।'
তিনি অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বানও জানান। তবে চলমান যুদ্ধ-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা রপ্তানির ওপর প্রভাব অব্যাহত রাখতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সামগ্রিক মন্দা সত্ত্বেও বেশ কয়েকটি অ-পোশাক খাত ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে, যা রপ্তানি বৈচিত্র্যায়নের ইঙ্গিত দেয়।
ইপিবির তথ্য অনুসারে, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের রপ্তানি ২৩ দশমিক ৪২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক পণ্যের ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং বাইসাইকেলের ২৭ দশমিক ৪০ শতাংশ রপ্তানি বেড়েছে। আকরিক, স্ল্যাগ এবং ছাই রপ্তানি ৪৫ দশমিক ৪০ শতাংশ বেড়েছে, ওষুধ শিল্পে ছয় দশমিক ৩২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, জুতা বাদে চামড়াজাত পণ্য ১৮ দশমিক ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং হোম টেক্সটাইল দুই দশমিক ৬৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। হিমায়িত এবং জীবিত মাছের রপ্তানি গত বছরের তুলনায় তিন দশমিক ৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
যাইহোক, মূল্যের দিক থেকে এই অর্জনগুলো পোশাক খাতের বিশাল সংকোচন পূরণ করার জন্য যথেষ্ট না। ফলে সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক অবস্থানেই রয়ে গেছে।
