রমজানে ঢাকায় দীর্ঘ অপেক্ষায় মেলে টিসিবির পণ্য
হাতিরপুলে টিসিবির পণ্য পেতে দেড় ঘন্টা ধরে লাইনে অপেক্ষা করছিলেন বৃদ্ধ আব্দুল কুদ্দুস (৬৫)। বিকেল চারটার দিকে তখনো তার সামনে সারিতে আরও প্রায় ১৫ জন। হাতিরপুলের একটি টাইলসের দোকানে কাজ করেন তিনি। তার আয়ে সাতজনের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। এ কারণে কিছুটা সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবির ট্রাক থেকে রমজানের পণ্য কিনতে আসেন তিনি।
আব্দুল কুদ্দুস টিবিএসকে বলেন, 'এই বয়সে কাজ করা কঠিন। তবু না করলে তো চলবে না। চাল-ডাল-তেল যদি এখানে কম দামে পাই, তাহলে অন্তত বেঁচে যাওয়া টাকা দিয়ে ভালোভাবে ইফতার করতে পারব।'
কথা বলতে বলতে তার হাত কাঁপছিল। বয়সের ভারে হাঁটতেও কষ্ট হয়। তবু লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। তিনি আক্ষেপ করে বললেন, 'আমার মতো বয়স্কদের যদি একটু আগে সুযোগ দিত, তাহলে দাঁড়িয়ে থাকতে এত কষ্ট হতো না।'
রমজান মাস উপলক্ষে সারা দেশে ট্রাকে করে পণ্য বিক্রি করছে টিসিবি। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মোট ৫০টি স্পটে এসব ট্রাকে করে তেল, খেজুর, মসুর ডাল, ছোলা ও চিনি বিক্রি করা হয়।
একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই লিটার সয়াবিন তেল, দুই কেজি মসুর ডাল, এক কেজি চিনি, এক কেজি ছোলা ও আধা কেজি খেজুর কিনতে পারেন। এর মধ্যে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম রাখা হচ্ছে ১১৫ টাকা। এছাড়া প্রতি কেজি চিনি ৮০ টাকা, মসুর ডাল ৭০ টাকা, ছোলা ৬০ টাকা ও আধা কেজি খেজুরের দাম ৮০ টাকা। সব মিলিয়ে এসব পণ্য কিনতে একজনের লাগে ৫৯০ টাকা। বাজার থেকে সমপরিমাণ পণ্য কিনতে প্রায় ৯৫০ টাকা লাগে। অর্থাৎ প্রায় ৩৫০ টাকা সাশ্রয় হয়।
আব্দুল কুদ্দুসের পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন মর্জিনা বেগম। স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার পর এখন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কাছে থাকেন। ছোট দুই ভাই-বোনসহ পুরো পরিবারের ভার তার কাঁধে।
মর্জিনা টিবিএসকে বলেন, 'আমি না দাঁড়ালে তো কেউ দাঁড়াবে না। বাবা-মা লাইনে দাঁড়াতে পারে না। তাই কষ্ট হলেও এখানে আসি।'
কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি আবার বললেন, 'সব জিনিস তো কিনতে পারি না। কিন্তু এখান থেকে যা পাই, তাতেই একটু স্বস্তি পাই।'
হাতিরপুল ছাড়াও রাজধানীর বারিধারা, গুদারাঘাট ও খিলক্ষেতে টিসিবির ট্রাক সেল পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, সব জায়গাতেই পণ্য কিনতে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন। ৩০০-৩৫০ টাকা বাঁচাতে প্রায় তিন-চার ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করেন নিম্ন-আয়ের মানুষ। অনেকসময় পণ্য না পেয়ে খালি হাতে ফিরতে হয় তাদের, কারণ এক ট্রাক থেকে দিনে সর্বোচ্চ ৪০০ জন পণ্য কিনতে পারেন। কিন্তু প্রতিদিন এসব পয়েন্টে এর প্রায় দ্বিগুণ মানুষ পণ্য কিনতে আসেন।
বারিধারায় টিসিবির পণ্য নিয়ে ফিরছিলেন আকলিমা আক্তার। তিনি বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। টিবিএসকে আকলিমা বলেন, 'আগে কখনো টিসিবির পণ্য কিনিনি। এগারোটার দিকে লাইনে দাঁড়িয়েছি। পৌঁনে একটার দিকে পেয়েছি। আজকে নাকি ভিড় কম; তা-ও এতটা সময় লেগেছে। এখান থেকে কিনলে কিছুটা খরচ বেঁচে যাবে, তাই এসেছি।'
বারিধারায় পণ্য বিক্রির দায়িত্বে ছিল শাহজাহান স্টোর। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মো. শাহজাহান টিবিএসকে বলেন, 'আমরা ১০ টার দিকে শুরু করেছি। শেষ হওয়া পর্যন্ত চলে। দিনে ৪০০ জনকে দিতে পারি। এ কারণে অনেকেই ফিরে যান। মানুষের চাহিদা বেশি থাকে।'
ন্যায্যতা নিশ্চিতে চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়ে শাহজাহান বলেন, 'অনেকে ৩-৪ জন একসাথে এসে কয়েকবার করে পণ্য নেয়। এখন এটা তো লাইন অনুযায়ী দিতে হয়। কে দুই-তিনবার নিচ্ছে বের করাও মুশকিল। তবু আমরা যাচাই-বাছাই করে দেয়ার চেষ্টা করি। কারণ সে তিন-চারবার নিয়ে অন্যদের হক নষ্ট করছে।'
টিসিবি সূত্রে জানা যায়, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়ে এ বিক্রি কার্যক্রম, চলবে ১২ মার্চ পর্যন্ত। সারা দেশে মোট ৪৫০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে প্রতিদিন (ছুটির দিন ছাড়া) নিম্ন-আয়ের মানুষের জন্য এসব পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে।
প্রতিটি ট্রাকে ৪০০ জনের জন্য পণ্য বরাদ্দ থাকে। ট্রাক সেলের মাধ্যমে রমজানে প্রায় ৩৫ লাখ ভোক্তার কাছে ২৩ হাজার টন পণ্য বিক্রি করা হবে বলে জানায় টিসিবি।
