ট্রাম্পের শুল্ক বাতিল হওয়ায় ঢাকা-ওয়াশিংটন বাণিজ্য চুক্তি আইনি ভিত্তি হারাতে পারে
শুক্রবার মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা বেশিরভাগ পাল্টা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করে বাতিল করার রায় দিয়েছে। এ রায়ের প্রভাব মূল্যায়নের জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সময় নেওয়া উচিত বলে পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের এই আদেশের প্রতিক্রিয়ায় গতকাল (২০ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা এই পরামর্শ দেন।
বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান টিবিএসকে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এই শুল্কগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করায় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিও আইনি ভিত্তি হারাবে।
তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট মার্কিন ট্যারিফ অবৈধ ঘোষণা করলে বাংলাদেশ যে বাণিজ্য চুক্তি করেছে, সেটাও অবৈধ হয়ে যাবে। ফলে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা আর আমাদের মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থাকবে না।'
ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট-এর (আইইইপিএ) আওতায়। তবে মার্কিন আদালত রায় দিয়েছে, এই আইন পরিধি, মাত্রা ও মেয়াদের দিক থেকে সীমাহীন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা দেয় না।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট-এর চেয়ারম্যান ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, এই রায়টি আইনগতভাবে স্পষ্ট হলেও বাস্তবে বেশ জটিল।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অস্পষ্টতার সুযোগ খুব একটা নেই। তবু এর বাস্তব প্রভাব কী হবে তা এখনও অনিশ্চিত, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কীভাবে এর প্রতিক্রিয়া জানাবেন তা স্পষ্ট নয়।'
মার্কিন প্রশাসনের হাতে থাকা বেশ কয়েকটি আইনি হাতিয়ারের মধ্যে এই আইন একটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'এ সিদ্ধান্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে প্রশাসনের বৃহত্তর ক্ষমতাকে বাতিল করে দেয় না। অন্যান্য আইনি বিকল্পগুলো এখনও উন্মুক্ত রয়েছে।'
তবে সেই বিকল্প পথগুলোর জন্য কংগ্রেসের সম্পৃক্ততা অথবা মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরের আনুষ্ঠানিক তদন্তের প্রয়োজন হতে পারে, যার ফলে বিলম্ব ও রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া মার্কিন আমদানিকারকদের কাছ থেকে আগে আদায় করা শুল্ক ফেরত দেওয়া হবে কি না, তা-ও এখনও স্পষ্ট হয়নি।
আবদুর রাজ্জাক বলেন, এই রায়ের ফলাফল পুরোপুরি বোঝার জন্য বাংলাদেশের কিছু সময় নেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, 'চুক্তি সই করার অর্থ এই নয় যে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যায়। তাছাড়া পাল্টা শুল্ক প্রত্যাহার করা হলেও দ্বিপাক্ষিক প্রতিশ্রুতিগুলোর আলাদা প্রভাব থাকতে পারে।'
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, চুক্তিটি এখনও কোনো পক্ষই র্যাটিফাই (অনুমোদন) করেনি। অর্থাৎ চুক্তিটি এটি এখনও কার্যকর হয়নি।
ডব্লিউটিও সেলের সাবেক মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায় বাংলাদেশের জন্য ভালো খবর। 'আমরা চুক্তি করলেও তা এখনও কার্যকর হয়নি। দুই দেশ চুক্তি র্যাটিফাই করার পর এটি কার্যকর হবে। ট্যারিফ বাতিল হলে বাংলাদেশ চুক্তি র্যাটিফাই করা থেকে বিরত থাকার সুযোগ পাবে,' বলেন তিনি।
জাতীয় জরুরি অবস্থার জন্য তৈরি একটি আইনের অধীনে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ঢালাও শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট গতকাল তা বাতিল করে দিয়েছে।
মূলত বিশ্বের প্রায় সব দেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর আরোপ করা আমদানি শুল্ক নিয়ে ছিল আদালতের এই আইনি লড়াই।
শুরুতে এই শুল্ক মেক্সিকো, কানাডা ও চীনের ওপর আরোপ করা হয়। পরে গত এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর পরিধি বাড়িয়ে আরও ডজনখানেক বাণিজ্য অংশীদারের ওপর তা প্রয়োগ করা হয়।
হোয়াইট হাউস ১৯৭৭ সালের ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট-এর (আইইইপিএ) বরাত দিয়ে দাবি করেছিল, এই আইন প্রেসিডেন্টকে জরুরি অবস্থায় বাণিজ্য 'নিয়ন্ত্রণের' ক্ষমতা দেয়।
কিন্তু এ পদক্ষেপের ফলে দেশে-বিদেশে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। যেসব প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠাতে হুট করে বাড়তি করের মুখে পড়েছিল, তারা প্রতিবাদ জানায়। এ শুল্কের কারণে পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে বলেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
গত বছর আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে প্রতিবাদকারী অঙ্গরাজ্য ও ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনজীবীরা বলেন, ট্রাম্প শুল্কারোপের জন্য যে আইন ব্যবহার করেছেন, সেখানে 'শুল্ক (ট্যারিফ)' শব্দটির কোনো উল্লেখই নেই।
তারা বলেন, কংগ্রেস তাদের কর আদায়ের ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায়নি। এমনকি বিদ্যমান অন্যান্য বাণিজ্য চুক্তি ও শুল্ক বিধিগুলোকে 'বাতিল করার জন্য প্রেসিডেন্টকে সীমাহীন ক্ষমতা' দেওয়ার উদ্দেশ্যও কংগ্রেসের ছিল না।
রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস তার মতামতে এই যুক্তির পক্ষেই অবস্থান নেন।
শুল্ক বাতিলের এই সিদ্ধান্তে আদালতের তিনজন উদারপন্থি বিচারপতির সঙ্গে যোগ দেন ট্রাম্পের মনোনীত দুই বিচারপতি—অ্যামি কোনি ব্যারেট ও নিল গোরসাচ। আর তিন রক্ষণশীল বিচারপতি—ক্ল্যারেন্স টমাস, ব্রেট কাভানাফ ও স্যামুয়েল আলিটো এই রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন।
বিচারপতিদের সমর্থিত এই আইনি নীতি অনুযায়ী, সরকারের নির্বাহী বিভাগের 'ব্যাপক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ' যেকোনো পদক্ষেপে কংগ্রেসের সুস্পষ্ট অনুমোদন থাকতে হয়। এর আগে সাবেক ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী পদক্ষেপ আটকাতেও আদালত এই নীতি ব্যবহার করেছিল।
ট্রাম্প আমদানি শুল্ককে তার অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার করার পর ট্রাম্প যে বৈশ্বিক বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, এই শুল্কগুলো ছিল তার কেন্দ্রবিন্দুতে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য অংশীদাররা দূরে সরে গেছে, আর্থিক বাজারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে।
বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ট্রাম্পের এসব শুল্ক আগামী এক দশকে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয় এনে দেবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
১৪ ডিসেম্বরের পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক আদায়ের কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে গতকাল পেন-ওয়ার্টন বাজেট মডেল-এর অর্থনীতিবিদরা হিসাব করে দেখেছেন, আইইইপিএর ওপর ভিত্তি করে ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক থেকে আদায় করা অর্থের পরিমাণ ১৭৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
আদালতের রায়ের পর সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, 'দেশের জন্য সঠিক কাজটি করার সাহস দেখাতে না পারায় আদালতের নির্দিষ্ট কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে আমি লজ্জিত, ভীষণ লজ্জিত।'
ট্রাম্প আরও বলেন, এ রায়ের কারণে 'যেসব বিদেশি রাষ্ট্র বছরের পর বছর আমাদের ঠকিয়ে আসছিল, তারা এখন উচ্ছ্বসিত। তারা এতটাই খুশি যে রাস্তায় নেচে বেড়াচ্ছে। তবে তারা বেশিদিন এই নাচ নাচতে পারবে না, এটুকু আমি আপনাদের নিশ্চিত করতে পারি।'
বিকল্প হাতিয়ারগুলোর বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, 'আদালত ভুলবশত যেসব সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে, সেগুলোর জায়গায় এখন অন্যান্য বিকল্প ব্যবহার করা হবে। আমাদের কাছে বিকল্প আছে—দারুণ সব বিকল্প। এর মাধ্যমে হয়তো আরও বেশি অর্থ আয় হতে পারে। আমরা আরও বেশি অর্থ আদায় করব এবং আরও অনেক শক্তিশালী হব।'
এই রায়ের কয়েক ঘণ্টা পরই ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি পাল্টা শুল্কের বদলে নতুন করে বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নির্বাহী আদেশে সই করেছেন।
শুক্রবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প নিশ্চিত করেন, তিনি ওভাল অফিসে বসে এই নির্বাহী আদেশে সই করেছেন। তিনি আরও জানান, এই আদেশ 'প্রায় তাৎক্ষণিকভাবেই' কার্যকর হবে।
হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইতোমধ্যে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করে ফেলা দেশগুলোর ওপরও এই নতুন ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ হবে। এসব দেশ এখন নিজেদের চুক্তিতে নির্ধারিত শুল্ক হারের বদলে সেকশন ১২২-এর অধীনে বৈশ্বিক ১০ শতাংশ শুল্ক দেবে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ১০ শতাংশ শুল্ক হারের আওতাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্য, ভারত, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রয়েছে। তবে তালিকাটি এখানেই শেষ নয়।
