চট্টগ্রাম বন্দরের ধর্মঘট স্থগিত, সাত দিনের অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে কাজে ফিরলেন শ্রমিকরা
দীর্ঘ এক সপ্তাহের অচলাবস্থা কাটিয়ে অবশেষে সচল হয়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম। শ্রমিক ও কর্মচারীদের ধর্মঘট স্থগিতের পর আজ সোমবার সকাল থেকে বন্দরের প্রধান টার্মিনালগুলোতে পণ্য ওঠানামা ও কনটেইনার খালাস কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
বন্দর সূত্র জানায়, সকালের শিফট থেকেই শ্রমিক-কর্মচারীরা কাজে যোগ দিয়েছেন। জেটিতে থাকা জাহাজগুলো থেকে পণ্য খালাস শুরু হয়েছে এবং টার্মিনালগুলো থেকে লোড করা কনটেইনার সরবরাহ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে বন্দরে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তার অবসান ঘটল।
গত রোববার সকাল থেকে 'চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ' চার দফা দাবিতে পুনরায় অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করে। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত করা, বন্দর চেয়ারম্যানের পদত্যাগ এবং আন্দোলনকারী শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া সমস্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার করা।
এর আগে ৩১ জানুয়ারি থেকে এনসিটি লিজ দেওয়ার প্রতিবাদে প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা করে কর্মবিরতি শুরু হয়। গত মঙ্গলবার থেকে এটি অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে রূপ নেয়। মাঝে শুক্রবার ও শনিবার নৌপরিবহন উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর ধর্মঘট দুদিনের জন্য স্থগিত থাকলেও, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার অভিযোগে রোববার থেকে তারা আবারও আন্দোলনে নামেন।
সাত দিনের এই অচলাবস্থায় বন্দরের কার্যক্রমে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতে, ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা মূল্যের ১৩ হাজার ৪৮৩ টিইইউএস (একক) রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার আটকা পড়ে। এছাড়া বন্দরের টার্মিনাল ইয়ার্ডে জমা পড়েছিল ৪১ হাজার টিইইউএস-এর বেশি কনটেইনার।
ব্যবসায়ী নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, এই স্থবিরতা দীর্ঘায়িত হলে বৈদেশিক বাণিজ্যে ধস নামতে পারে। বন্দরের বহির্নোঙর ও জেটিতে খাদ্যশস্য ও নিত্যপণ্যসহ বিভিন্ন কার্গো নিয়ে ৯০টিরও বেশি জাহাজ অলস বসে ছিল। এর মধ্যে অন্তত ৪০টি জাহাজে আসন্ন রমজান উপলক্ষে আমদানিকৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও খাদ্যশস্য ছিল।
শেষ পর্যন্ত আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কোনো চুক্তি সই করবে না—এমন ঘোষণা দেওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়। এই ঘোষণার পর সোমবার ভোরে শ্রমিক-কর্মচারীরা ধর্মঘট স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেন।
আজ সকাল থেকে জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালসহ বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস পুরোদমে শুরু হয়েছে।
বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী জানান, পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। তিনি বলেন, 'অচলাবস্থা নিরসন হয়েছে। জিসিবি টার্মিনালে সাতটি জাহাজে কাজ শুরু হয়েছে।'
শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সারোয়ার হোসেন সাগর বলেন, 'ধর্মঘটের সময় শ্রমিকরা উপস্থিত থাকলেও কাজ বন্ধ ছিল। ধর্মঘট প্রত্যাহারের পর আজ ভোর থেকেই খালাস কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং সকাল থেকে পূর্ণোদ্যমে কাজ চলছে।'
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদারও নিশ্চিত করেছেন যে, বন্দর থেকে রপ্তানি কনটেইনার শিপমেন্ট এবং আমদানি কনটেইনার ডেলিভারি আজ সকাল থেকে পুনরায় শুরু হয়েছে।
সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির ও ইব্রাহিম খোকন স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং রমজানের আগে নিত্যপণ্য খালাসের বিষয়টি বিবেচনা করে আজ সকাল ৮টা থেকে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধর্মঘট স্থগিত রাখা হয়েছে।
তবে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার, বদলি ও সাময়িক বরখাস্তের মতো পাঁচটি অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান না হলে নতুন করে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র ও পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
