কর সংস্কার প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে: রাজস্ব এবং প্রবৃদ্ধির জন্য এর গুরুত্ব কতটুকু?
রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং পরোক্ষ করের ওপর অর্থনীতির অতিনির্ভরতা কমাতে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়ে একটি সংস্কার এজেন্ডা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দিয়েছে বাংলাদেশের কর কাঠামো পুনর্বিন্যাসে দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতীয় কমিটি।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তারের নেতৃত্বাধীন ১১ সদস্যের জাতীয় টাস্কফোর্স প্রণীত প্রতিবেদনে কর–জিডিপি অনুপাত বর্তমান প্রায় ১০ শতাংশ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১২ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এতে কর কাঠামো পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করের অংশ বর্তমান ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছে, যা একটি আরও ন্যায্য ও প্রবৃদ্ধিবান্ধব কর ব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে।
'ট্যাক্স পলিসি ফর ডেভেলপমেন্ট: এ রিফর্ম এজেন্ডা ফর রিস্ট্রাকচারিং দ্য ট্যাক্স সিস্টেম' শীর্ষক প্রতিবেদনটি গতকাল মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) জমা দেওয়া হয়েছে। এতে বাংলাদেশের কর ব্যবস্থাকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল, অদক্ষ এবং পরোক্ষ করের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামান্য সংস্কার বা খণ্ডিত পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য যথেষ্ট নয়; বরং মৌলিক ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
টাস্কফোর্স মোট ৫৫টি নীতিগত বিষয় চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে ৭টিকে তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রধান সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশনের মাধ্যমে কর ব্যবস্থাকে সহজ করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ঝুঁকি বিশ্লেষণ চালু করা, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট সম্প্রসারণ এবং কর প্রণোদনা পুনর্গঠন।
প্রতিবেদনে বাণিজ্যনির্ভর কর ব্যবস্থা থেকে সরে এসে দেশীয় কর আদায়ের দিকে কৌশলগত পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
শুল্ক সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে শুল্ক কাঠামো আধুনিকায়নের পাশাপাশি রপ্তানিমুখী ও আমদানি বিকল্প শিল্পের জন্য সমান কার্যকর সুরক্ষা প্রয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।
এতে বন্দরভিত্তিক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে 'পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিট' প্রয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে এবং পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে আলাদা 'ভ্যালুয়েশন ডেটাবেজ'-এর প্রয়োজন নেই বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থায় বর্তমান বহু হারের পরিবর্তে ধীরে ধীরে একক হারে যাওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, যা জটিলতা এবং ব্যবসায়ীদের কমপ্লায়েন্স ব্যয় কমাবে।
প্রতিবেদন গ্রহণ শেষে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, 'অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাতে সময় খুবই কম। আমরা এসব নীতির বাস্তবায়নের পথচলা শুরু করে যেতে চাই।'
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি ও সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই প্রতিবেদন একটি গাইডলাইন হিসেবে কাজ করবে।
অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, প্রতিবেদনে কর ব্যবস্থার বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সংস্কারের জন্য একটি রোডম্যাপ দেওয়া হয়েছে।
রাজস্ব বৃদ্ধি ২৩,০০০ কোটি টাকা
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গত রোববার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে পাঠানো এক বিস্তারিত ব্রিফিংয়ে জানিয়েছে, তাদের সংস্কার উদ্যোগের ফলে রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই–ডিসেম্বর) সরকারী রাজস্ব আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩ হাজার ২০ কোটি টাকা বেড়েছে।
এনবিআর জানায়, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ২২৯ কোটি টাকা। রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার, ডিজিটালাইজেশন, কর ফাঁকি রোধে উদ্যোগ এবং করদাতাবান্ধব ব্যবস্থার ফলেই এই প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
তবে অর্থনীতিবিদ ও সাবেক কর্মকর্তারা এই দাবির বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, রাজস্ব বৃদ্ধির হার বেশি দেখালেও তা মূলত আগের অর্থবছরের নিম্ন ভিত্তির (লো বেস) ফল, তাৎক্ষণিক সংস্কারের প্রভাব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংস্কারের এমন প্রভাব দেখানোর জন্য এখনো সময় খুবই কম।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)-এর চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'কিছু সংস্কার হলেও তার ফল এত দ্রুত পাওয়া যায় না। এতে আরও সময় লাগে।'
তিনি বলেন, 'আমরা যে প্রবৃদ্ধি দেখতে পাচ্ছি, তার প্রধান কারণ হলো গত বছরে রাজস্ব আদায় কম ছিল। সেই নিম্ন ভিত্তির কারণেই বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি মনে হচ্ছে।'
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই–ডিসেম্বর) রাজস্ব আদায় বাড়েনি; বরং প্রায় ১ শতাংশ কমেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা একই মত প্রকাশ করে বলেন, 'যে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা নতুন কোনো সংস্কারের ফল নয়।'
তিনি বরং প্রশ্ন তুলেছেন, গত এক বছরে আদৌ কোনো কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়িত হয়েছে কি না।
কাঠামোগত সংস্কার, আইনি পরিবর্তন
ব্রিফিংয়ে এনবিআর রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব প্রশাসনকে পৃথক করাকে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এতে বলা হয়, 'রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫' জারির মাধ্যমে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথক করা হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে জাতীয় প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় এ সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। এর ফলে এনবিআরের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়েছে।
এনবিআর জানায়, সরকার কর অব্যাহতি সীমিত করতে 'ট্যাক্স এক্সপেন্ডিচার পলিসি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক (টিইপিএমএফ)' চালু করেছে, যা সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়েছে।
আয়কর আইন, শুল্ক আইন ও ভ্যাট আইনের সংশোধনের মাধ্যমে কর অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষমতা এনবিআরের কাছ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যেকোনো কর অব্যাহতির জন্য সংসদের অনুমোদন লাগবে বলে জানানো হয়।
ডিজিটালাইজেশন উদ্যোগ
এনবিআর জানায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে 'স্ট্রেন্থেনিং ডমেস্টিক রেভিনিউ মোবিলাইজেশন প্রজেক্ট (এসডিআরএমপি)'-এর আওতায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বড় ধরনের ডিজিটালাইজেশন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
এই প্রকল্পের লক্ষ্য আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা।
ই-রিটার্ন, অনলাইন পেমেন্ট, ই-রিফান্ড, ভ্যাট স্মার্ট ইনভয়েস ও ঝুঁকিভিত্তিক অডিট চালুর ফলে করদাতাদের ভোগান্তি কমেছে বলে জানিয়েছে এনবিআর।
শুল্ক খাতে বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো চালুর ফলে ১৯টি সংস্থার সনদ, লাইসেন্স ও অনুমতিপত্র অনলাইনে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ সনদ ইস্যু করা হয়েছে এবং অধিকাংশ আবেদন এক ঘণ্টা থেকে এক দিনের মধ্যেই নিষ্পত্তি হচ্ছে।
ভ্যাট খাতে বিশেষ নিবন্ধন অভিযানের মাধ্যমে শুধু ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১ লাখ ৩১ হাজার নতুন ভ্যাট নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। এতে মোট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৭৫ হাজারে।
এনবিআর জানায়, আয়কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিল বাধ্যতামূলক করায় এ পর্যন্ত ৩৪ লাখের বেশি ই-রিটার্ন জমা পড়েছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ই-মেইলভিত্তিক ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, ফলে বিদেশ থেকে রিটার্ন দাখিল সহজ হয়েছে।
এ পর্যন্ত পাঁচ হাজারের বেশি প্রবাসী করদাতা এই সুবিধা ব্যবহার করেছেন বলে জানানো হয়।
ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ব্যবস্থা চালুর ফলে অডিট বাছাই প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হয়েছে বলেও জানিয়েছে এনবিআর।
শুল্ক ও কর ছাড়
এনবিআর জানায়, সরকার বিভিন্ন খাতে শুল্ক ও কর ছাড় দিয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—হজযাত্রীদের বিমান টিকিট ও সংশ্লিষ্ট সেবায় আবগারি শুল্ক ছাড়, রমজান সামনে রেখে খেজুর আমদানিতে শুল্ক ও অগ্রিম আয়কর হ্রাস এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক কর ছাড়।
এনবিআর জানায়, মোবাইল ফোন আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে, ফলে মোট আমদানি শুল্ক ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব ব্যবস্থার সুফল ইতোমধ্যে বেশি রাজস্ব আদায়, করদাতাদের আস্থা বৃদ্ধি এবং আরও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে এসব উদ্যোগ কর–জিডিপি অনুপাত বাড়াতে সহায়ক হবে বলেও তারা আশা প্রকাশ করেছেন।
