রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা ও হয়রানি মুক্ত কর সেবা নিশ্চিতে 'ফেসলেস' সিস্টেম আনছে এনবিআর
রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা আনা, করদাতাদের হয়রানি কমানো এবং আদায়ের পরিধি বাড়াতে এনবিআর একটি সম্পূর্ণ ফেসলেস ও ডিজিটাল কর প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।
শনিবার (১৬ মে) রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে 'পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার' (পিপিআরসি) আয়োজিত এক প্রাক-বজেট আলোচনায় এনবিআর প্রধান এসব কথা জানান।
তিনি আরও জানান, কাস্টমস, ভ্যাট এবং আয়কর বিভাগের সামগ্রিক কার্যক্রমকে অনলাইন সিস্টেম, ঝুঁকি-ভিত্তিক অডিট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত তথ্য বিশ্লেষণ এবং অটোমেশনের আওতায় এনে সংস্কার করা হচ্ছে।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, 'আমরা নিশ্চিত করতে চাই যেন নিয়ম মেনে কর প্রদানকারী নাগরিকরা কর অফিসে সশরীরে না গিয়েই ঘরে বসে তাদের নাগরিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন।'
তিনি উল্লেখ করেন, কর্মকর্তাদের একক বা স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা কমিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এনবিআর ইতোমধ্যে বৈজ্ঞানিক ও ঝুঁকি-ভিত্তিক অডিট নির্বাচন পদ্ধতি চালু করেছে।
নিজের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, 'যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা একটি সঠিক ঝুঁকি-ভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করতে না পেরেছি, ততক্ষণ আমি গত দুই বছরে ভ্যাট ও ট্যাক্স অডিট নির্বাচন প্রায় বন্ধ রেখেছিলাম।'
এনবিআর চেয়ারম্যানের মতে, প্রায় ৪৫ লাখ অনলাইন রিটার্ন জমা হওয়ার ফলে একটি বিশাল ডাটাবেজ তৈরি হয়েছে, যা করদাতাদের মানদণ্ড নির্ধারণ এবং তদারকি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
পাশাপাশি করদাতাদের জন্য ব্যক্তিগত অনলাইন 'ড্যাশবোর্ড' চালুর পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা তাদের বকেয়া পাওনা, দায়ের পরিমাণ এবং কর ফেরতের বর্তমান অবস্থা দেখতে পাবেন। করদাতারা অনলাইনে রিফান্ড দাবি করতে পারবেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে।
এ প্রসঙ্গে খান বলেন, 'আমরা সেই আস্থার সংকট দূর করতে চাই যেখানে করদাতারা মনে করেন তারা শুধু করই দিচ্ছেন, বিনিময়ে কিছুই পাচ্ছেন না।'
কর পরিপালন জোরদার এবং ভ্যাটের আওতা বাড়াতে নগদ লেনদেন কমিয়ে আনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন এনবিআর প্রধান। তিনি জানান, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা না দিয়ে সরাসরি নগদ অর্থে টিটি (টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফার) বা পে-অর্ডার করার সুযোগ বন্ধ করতে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে প্রস্তাব দিয়েছেন।
তিনি বলেন, 'যদি আমরা অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে নগদ লেনদেন কমিয়ে আনতে পারি, তবে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অনেক সহজ হয়ে যাবে।'
তামাকজাত পণ্যের কর বিষয়ে তিনি বলেন, 'অবৈধ বাণিজ্য এবং কর ফাঁকি রোধে আগামী বছর থেকে সিগারেট উৎপাদনকারীদের ওপর নজরদারি আরও জোরদার করা হবে। এনবিআর উন্নত কিউআর এবং এআর কোড সম্বলিত ট্যাক্স স্ট্যাম্প প্রবর্তন করবে, যা দিয়ে ভোক্তারা নিজেরাই স্ক্যান করে যাচাই করতে পারবেন পণ্যটির সঠিক কর পরিশোধ করা হয়েছে কি না।'
'ভোক্তারা যদি কর ফাঁকি দেওয়া সিগারেট শনাক্ত করে তথ্য দেন, তবে তাদের পুরস্কৃত করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে জরিমানার আওতায় আনা হবে,' বলে সতর্কও করেন তিনি।
ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থা পানীয় এবং বোতলজাত পানিসহ অন্যান্য প্যাকেটজাত পণ্যেও সম্প্রসারিত করা হতে পারে বলে তিনি জানান।
কাস্টমস সংস্কারের বিষয়ে চেয়ারম্যান বলেন, 'সরকার 'এসিকাডা ওয়ার্ল্ড'-এর ব্যবহার জোরদার করছে এবং কাগজবিহীন (পেপারলেস) কাস্টমস ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।'
এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, আসন্ন বাজেটে একদিকে যেমন রাজস্ব আদায়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে, তেমনি ব্যবসা সহজীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগে উৎসাহ প্রদানের বিষয়গুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে সরকার।
