পরোক্ষ কর ও উৎসে করের ওপর অতিনির্ভরতা অর্থনীতির ক্ষতি করতে পারে : বিশেষজ্ঞরা
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে পরোক্ষ কর ও উৎসে করের ওপর অতিনির্ভরতা কমাতে হবে। এর বদলে প্রত্যক্ষ কর ও একটি ডিজিটাল পদ্ধতিতে সমন্বিত কর ব্যবস্থায় গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সোমবার (১৮ মে) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিডিবিএল ভবনে ভয়েস ফর রিফর্ম আয়োজিত 'পরোক্ষ করের উপর অতিনির্ভরশীলতা: অর্থনীতির উপর বহুমুখী প্রভাব' শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তারা এই সতর্কবার্তা দেন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যমান কর কাঠামো দিন দিন পশ্চাৎমুখী হয়ে উঠছে এবং সাধারণ ভোক্তা ও আইন মেনে চলা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অসম ও অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে।
অনুষ্ঠানে কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার বর্তমান বড় সীমাবদ্ধতা হলো পরোক্ষ কর ও উৎসে করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, যার চাপ শেষপর্যন্ত সাধারণ জনগণের ওপরই পড়ে।
তিনি শিল্পভিত্তিক গবেষণা ও তথ্যের স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, 'বর্তমান কর কাঠামো কর্পোরেট খাতের প্রকৃত মুনাফার প্রতিফলন ঘটায় না। করহারকে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মুনাফার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।'
তিনি ই-ইনভয়েসিং ও ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়ে বলেন, এগুলো কর ফাঁকি রোধ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, বর্তমান কর ব্যবস্থা রিগ্রেসিভ পশ্চাৎমুখী), ফলে এটি দারিদ্র্য কমানো বা বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে কার্যকর নয়।
তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের রাজস্বের প্রায় ২৭-২৮ শতাংশ আসে কাস্টমস শুল্ক থেকে, যা এলডিসি উত্তরণের পর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম অনুযায়ী কমাতে হবে।
'ভ্যাট ও কাস্টমস-নির্ভর কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে প্রত্যক্ষ কর বাড়াতে হবে,' বলেন তিনি।
মাসরুর রিয়াজ আরও বলেন, ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স দুর্বল এবং কর দিতে গিয়ে হয়রানির ভয়ও কাজ করে করদাতাদের মধ্যে। এটি রাজস্ব আদায় বাড়ানোর অন্যতম প্রধান বাধা। এছাড়া চড়া আমদানি ব্যয় ও বাজেট–জিডিপি অনুপাত কম থাকা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে সীমিত করছে।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট-এর নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফ বলেন, পরোক্ষ করের ওপর অতিনির্ভরতা এবং সীমিত করদাতার ওপর চাপই দেশের প্রধান আর্থিক সমস্যা।
তিনি বলেন, করজাল সম্প্রসারণ করতে হবে এবং শহরের বিপুলসংখ্যক সম্পত্তি ও সক্ষম জনগোষ্ঠীকে করের আওতায় আনতে হবে।
আবু ইউসুফের মতে, ডিজিটাল ইন্টিগ্রেশন ও কার্যকর প্রয়োগ ছাড়া টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থা সম্ভব নয়।
এনবিআরের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ ফরিদউদ্দিন বলেন, কর সংস্কার নিয়ে বারবার আলোচনা হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হyeছে খুবই সামান্য।
ব্যবসা পরিচালনার খরচ বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে তিনি শুল্কায়নের জটিলতা, একাধিক শুল্ক হার ও সম্পূরক শুল্কের কথা উল্লেখ করেন।
ফরিদউদ্দিন বলেন, 'রাজস্ব প্রশাসনের উন্নতির জন্য সমন্বিত ডিজিটাল কর ব্যবস্থা অপরিহার্য।' তিনি আরও বলেন, দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।
ইউনিলিভার বাংলাদেশের সাবেক হেড অভ ট্যাক্স সাঈদ আহমেদ খান বলেন, একাধিক ধাপে কর আরোপ ও ভুল ভ্যালুয়েশন পদ্ধতির কারণে নিয়ম মেনে চলা ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
'এর ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং শেষপর্যন্ত করের চাপ ভোক্তার ওপর চলে যাচ্ছে,' বলেন তিনি।
বাংলাদেশ রেস্টুরেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ইমরান হোসেন বলেন, দেশের রাজস্ব ব্যবস্থা এখন বিভাজিত ও অকার্যকর। তিনি অভিযোগ করেন, রেস্তোরাঁ খাতে একাধিক ধাপে ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও কর আরোপের কারণে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
একক ও সমন্বিত ভ্যাট কাঠামোর দাবি জানিয়ে ইমরান বলেন, 'নীতিনির্ধারণে বাস্তব ডেটার অভাব থাকায় অনেক ক্ষেত্রে করনীতি ভুল পথে যাচ্ছে এবং চাঁদাবাজির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।'
ইকোনমিক রিপোর্টারস ফোরামের সভাপতি দৌলত আকতার মালা বলেন, পরোক্ষ কর ও উৎসে করের অতিনির্ভরতা কর ব্যবস্থাকে ক্রমেই রিগ্রেসিভ করে তুলেছে।
তিনি বলেন, সীমিত করদাতা ও দুর্বল কমপ্লায়েন্সের কারণে গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
