অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় ৫ বছর মেয়াদী কর কাঠামো প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে সরকার: উপদেষ্টা তিতুমীর
বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি এবং দেশের অর্থনৈতিক নীতিতে স্থিতিশীলতা ও পূর্বাভাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে সরকার পাঁচ বছর মেয়াদী একটি দীর্ঘমেয়াদী কর কাঠামো প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছেন সরকারের অর্থনৈতিক ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
শনিবার (২৩ নভেম্বর) রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত এক প্রাক-বজেট সংলাপে তিনি এসব তথ্য জানান।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত এই সংলাপে নীতি-নির্ধারক, ব্যবসায়ী নেতা এবং আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা একটি নতুন 'সামাজিক চুক্তির' আহ্বান জানান। যেখানে করদাতারা তাদের দেওয়া করের বিনিময়ে রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখতে পাবেন।
উপদেষ্টা ড. তিতুমীর বলেন, 'আমাদের রাজস্ব আদায়ে যে নিম্নমুখী ভারসাম্য লক্ষ্য করা যায়, তা মূলত রাজনৈতিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কেবল কারিগরি সমাধানের চেষ্টার ফলাফল। সরকার এখন কেবল প্রযুক্তি-কেন্দ্রিক কর ব্যবস্থাপনা—যা দেশের ক্ষতি করেছে—তা থেকে বেরিয়ে এসে একটি রাজনৈতিকভাবে দায়বদ্ধ রাজস্ব প্রশাসনের দিকে এগোচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো করদাতার হয়রানি বন্ধ করা এবং বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা।'
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সরকার বিদ্যমান কর হার বৃদ্ধি করে নয়, বরং করের আওতা বা পরিধি বাড়িয়ে এবং আগামী পাঁচ বছরের জন্য কর নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চায়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান কর প্রশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের হয়রানির অভিযোগ স্বীকার করে নেন। তিনি কর ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে মানবিক স্পর্শমুক্ত করতে ব্যাপক ডিজিটাল রূপান্তরের পরিকল্পনার কথা জানান।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, 'হয়রানি বন্ধের একমাত্র পথ হলো পুরো ব্যবস্থাটিকে 'ফেসলেস' করা। আমরা ইতোমধ্যে এ বছর ৪৫ লাখ ই-রিটার্ন পেয়েছি। আমরা এখন একটি কাগুজে নথিহীন (পেপারলেস) কাস্টমস এবং ঝুঁকি-ভিত্তিক অডিট ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছি, যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত বিবেচনার সুযোগ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা হবে।'
সংলাপে বর্তমান কর সংস্কৃতির কড়া সমালোচনা করে এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর একে ট্যাক্স টেররিজম (কর সন্ত্রাস) হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, 'প্রবৃদ্ধি মানেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি। মানুষ মূলত দুটি কারণে কর দিতে চায় না— প্রথমত হয়রানির ভয়, আর দ্বিতীয়ত তাদের দেওয়া অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে সে বিষয়ে স্বচ্ছতার অভাব।'
এনবিআরকে 'একই জালে বারবার একই মাছ ধরার' প্রবণতা বন্ধ করার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, 'আমাদের জালের চেয়ে বড় করা দরকার করের আওতা। বিলাসজাত গাড়ি বা ফ্ল্যাটের মতো অনেক খাত করের জালের বাইরে রয়ে গেছে, যা থেকে সহজেই রাজস্ব আদায় করা সম্ভব।'
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. গেইল মার্টিন সতর্ক করে বলেন যে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজস্ব মডেলটি তার সক্ষমতার সীমায় পৌঁছে গেছে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধীর হলেও সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, যা বেসরকারি খাতকে চাপের মুখে ফেলেছে।
মার্টিন বলেন, 'এমন পরিস্থিতি কাম্য নয় যেখানে ভ্যাট অব্যাহতির কারণে সংগৃহীত রাজস্বের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ হাতছাড়া হয়। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। রাজস্ব বাড়ানোর দ্রুততম উপায় হলো কর অব্যাহতির তালিকা যৌক্তিক করা।' একইসঙ্গে তিনি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে করের বিরূপ প্রভাব থেকে রক্ষার ওপর জোর দেন।
অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বর্তমান সংকটকে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা, কর ফাঁকি এবং হয়রানির এক 'ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ' হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
জিল্লুর রহমান বলেন, 'রাজস্ব আহরণ কেবল একটি সংখ্যাগত লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়; এটি হতে হবে সামাজিক অগ্রগতির সংকেত। আমাদের এমন একটি সমাধান-কেন্দ্রিক আলোচনা প্রয়োজন যেখানে প্রক্রিয়ার দক্ষতা এবং সামাজিক চুক্তির সঠিক সমন্বয় থাকবে। নাগরিককে জানতে হবে তার করের টাকা কোথায় ব্যয় হচ্ছে। যদি কর দেওয়ার পরও শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের গুণগত মান নিশ্চিত না হয়, তবে কর দেওয়ার সংস্কৃতি কখনোই শক্তিশালী হবে না।'
