বেসরকারি খাতের ঋণ-প্রবৃদ্ধি কমতির দিকেই
২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি কমেছে। ফলে টানা সাত মাস ধরে এই খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে আটকে রয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশে। আগের মাস নভেম্বরেও এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। আর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তা ছিল ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যাংক ঋণের ধীরগতির প্রধান কারণ নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতা। নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে গেছে, যা ঋণ প্রবৃদ্ধিকে আরও সংকুচিত করছে।
তাদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবেও নতুন বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ীরা বর্তমানে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। আর এই বিনিয়োগ স্থবিরতার অন্যতম কারণ হিসেবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কথাও উল্লেখ করছেন তারা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, "ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ করছেন না। নতুন বিনিয়োগ না বাড়লে ব্যাংক ঋণও বাড়ে না। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন না। এই অবস্থা আগামী নির্বাচন পর্যন্ত থাকতে পারে। দেশে বিনিয়োগ যত কমবে, বেকারত্ব তত বাড়বে, যা জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে কমিয়ে দেবে।"
তিনি আরও বলেন, "মূল্যস্ফীতি যতদিন না কমছে, ততদিন বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধির ওপর এর প্রভাব থাকবে।"
পূবালী ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, "বর্তমানে নতুন কাজের অর্ডার নেই। দেশে এক ধরনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ করবেন না—এটাই স্বাভাবিক। নির্বাচনের পর বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হবে বলে আশা করা যায়।"
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডাইরেক্টর টিবিএসকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেক ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো চালু রয়েছে, সেগুলোর অনেকটাই পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। নাসা, বেক্সিমকো ও গাজীর মতো গ্রুপের অনেক কারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কারখানা সচল না থাকায় তারা ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ নিচ্ছে না। আগে কারখানাগুলো চালু থাকলে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি করা হতো। আবার যেসব প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে, তারাও আগের তুলনায় উৎপাদন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই-নভেম্বর সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির দায় নিষ্পত্তি ১৬ শতাংশের বেশি কমেছে।
সর্বশেষ বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কে পৌঁছেছিল ২০২৪ সালের জুলাইয়ে, যখন তা ছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ। এরপর ওই বছরের আগস্ট থেকেই প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। কমতে কমতে ২০২৫ সালের অক্টোবরে তা নেমে আসে ৬ দশমিক ২৩ শতাংশে, যা বিশেষজ্ঞদের মতে ইতিহাসের সর্বনিম্ন।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রক্ষেপণ ছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণের যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও কম। এই তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, বাস্তবে তার তুলনায় ব্যবসায়ীরা অনেক কম ব্যাংক ঋণ নিচ্ছেন।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই বড় চ্যালেঞ্জ
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এলে পলিসি রেট কমাবে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি সাতের ঘরে নামিয়ে আনা সম্ভব হলে পলিসি রেট কমানো হবে।
বর্তমানে পলিসি রেট ১০ শতাংশে রয়েছে, যার ফলে ব্যাংক ঋণের সুদের গড়হার দাঁড়িয়েছে ১১ থেকে ১২ শতাংশে। দেশের ব্যবসায়ীরা একাধিকবার বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে মূল্যস্ফীতি কমানোর তাগিদ দিয়েছেন।
এ বিষয়ে একটি বেসরকারি ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ বাড়বে না। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে আগ্রহী নন উদ্যোক্তারা, কারণ এতে তাদের 'কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস' বেড়ে যাচ্ছে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, "উচ্চ সুদে ব্যবসা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। অর্ডার না থাকায় অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আবার অনেকের ব্যবসা সম্প্রসারণও হচ্ছে না। এ কারণে আগের তুলনায় অনেক ব্যবসায়ী গ্রুপ ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া কমিয়ে দিয়েছে।"
দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী গ্রুপ টিকে গ্রুপের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করলে বর্তমানে 'কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস' উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার, যা সামগ্রিকভাবে খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সরকারি সিকিউরিটিজের দিকে ঝুঁকছে ব্যাংক
বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন আয়ের জন্য সরকারি সিকিউরিটিজের দিকে ঝুঁকছে। তারা ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলো নিরাপদ এই বিনিয়োগমুখী হয়েছে। অন্যদিকে সরকারও ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিচ্ছে। অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ক্যালেন্ডারের বাইরেও সরকার অতিরিক্ত ১০ হাজার কোটি টাকা ধার নিয়েছে।
বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত থাকায় ব্যাংকগুলো সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করে প্রায় ১১ শতাংশ সুদ পাচ্ছে, যা কার্যত ঝুঁকিমুক্ত। বর্তমানে অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংকের আয়ের বড় একটি অংশ আসছে এই খাত থেকে।
২০২৫ সালের শুরুতে আমানতের সুদহার বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের দুর্বল চাহিদা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও বাস্তবে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর—বিশেষ করে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর—মুনাফা ঋণ সম্প্রসারণের মাধ্যমে নয়, বরং সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে আসা বড় অঙ্কের আয়ের মাধ্যমে বাড়ছে। ফলে এটি ব্যাংকিং খাতের জন্য এক ধরনের নতুন লাইফলাইন হয়ে উঠেছে এবং ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিটের গঠনেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনছে।
