দীর্ঘদিন ধরে নন-পারফর্মিং শেয়ারের জন্য ‘আর-ক্যাটাগরি’ বোর্ডের প্রস্তাব
দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর ও লভ্যাংশ না দেওয়া কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারের মূল বোর্ড থেকে সরিয়ে একটি পৃথক 'আর-ক্যাটাগরি' প্ল্যাটফর্ম গঠনের সুপারিশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয় গঠিত একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি।
কমিটির প্রস্তাব অনুযায়ী, আর-ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত শেয়ারগুলোর ক্ষেত্রে কঠোর লেনদেন বিধি প্রযোজ্য হবে, যাতে জল্পনা (স্পেকুলেশন) ও কারসাজিমূলক কার্যক্রম নিরুৎসাহিত করা যায়। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এই ক্যাটাগরির শেয়ার কেনার পর অন্তত এক মাস তা বিক্রি করা যাবে না। পাশাপাশি সাধারণ শেয়ারের ক্ষেত্রে যেখানে লেনদেন নিষ্পত্তিতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে, সেখানে আর-ক্যাটাগরির শেয়ারের সেটেলমেন্ট সময় বাড়িয়ে সাত দিন করার সুপারিশ করা হয়েছে।
পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে (সিএসই) এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার কথাও বলেছে কমিটি।
গত বছরের মার্চে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরীর নেতৃত্বে চার সদস্যের এই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন—বিএসইসির কমিশনার ফারজানা লালারুখ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম সাদিকুল ইসলাম এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব।
পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি মন্দার কারণ চিহ্নিত করে কমিটি বাজার সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার, বিএসইসির সক্ষমতা বৃদ্ধি, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) শক্তিশালীকরণ এবং স্টক এক্সচেঞ্জে সুশাসন নিশ্চিতের বিষয়ে একাধিক সুপারিশ করে। গত নভেম্বর মাসে এসব সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়, যা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড দেখেছে।
এ ছাড়া পুঁজিবাজারে তারল্য বাড়াতে ১০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য ৪ শতাংশ সুদে ঋণ প্রদানের উদ্দেশ্যে ৩ হাজার কোটি টাকার আলাদা তহবিল গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছে কমিটি।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ৬০ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি কর প্রণোদনার মাধ্যমে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার সুপারিশও করেছে কমিটি। এর মধ্যে এক লাখ টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশ আয় করমুক্ত রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।
বর্তমানে ডিএসইতে সক্রিয়ভাবে দুটি আলাদা প্ল্যাটফর্ম রয়েছে—তালিকাভুক্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য এসএমই বোর্ড এবং মূল বোর্ডের পাশাপাশি তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির লেনদেনের জন্য অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড।
এ ছাড়া অকার্যকর কোম্পানিগুলোর শেয়ার ওভার-দ্য-কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটে লেনদেন হয়।
অকার্যকর কোম্পানির জন্য 'এক্সিট প্ল্যান'
কমিটি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভবিষ্যতে কার্যক্রম চালাতে অক্ষম তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য সুস্পষ্ট প্রস্থান পরিকল্পনা (এক্সিট প্ল্যান) তৈরির পরামর্শ দিয়েছে।
বাজার স্থিতিশীল রাখতে দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন ও কার্যক্রম বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠান, দীর্ঘ সময় ধরে লভ্যাংশ না দেওয়া এবং ভবিষ্যতেও দেওয়ার সম্ভাবনা নেই—এমন কোম্পানি এবং কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই এমন রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় এক্সিট প্ল্যান প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৩২টি কোম্পানি সম্পূর্ণ অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। এর বেশিরভাগই বস্ত্র খাতের, যেগুলোর উৎপাদন বন্ধ রয়েছে চার বছর থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২৩ বছর পর্যন্ত। এর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠান হলো মেঘনা পিইটি ইন্ডাস্ট্রিজ, যা ২০০২ সাল থেকে কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে।
তথ্য অনুযায়ী, এসব কোম্পানির অধিকাংশই ২০২০ সালের পর অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বহু বছর ধরে কোনো লভ্যাংশ দেয়নি।
অকার্যকর কোম্পানিগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কারখানা বন্ধ থাকা, পরিশোধিত মূলধনের চেয়ে বেশি পুঞ্জিভূত লোকসান, বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) না করা, ঘোষিত লভ্যাংশ নির্ধারিত সময়ে বিতরণে ব্যর্থতা এবং অন্যান্য অনিয়মের কারণে জেড-ক্যাটাগরিতে নেমে গেছে।
এদিকে জেড-ক্যাটাগরিতে থাকা সত্ত্বেও কিছু শেয়ারের দরে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ঘটনাও ঘটেছে।
এর সাম্প্রতিক উদাহরণ জিল বাংলা সুগার মিলস। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটি চালু থাকলেও ধারাবাহিকভাবে বড় অঙ্কের লোকসান গুনছে এবং বছরের পর বছর কোনো লভ্যাংশ দেয়নি।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই গত বছরের ২৭ নভেম্বর থেকে ৯ ডিসেম্বরের মধ্যে জিল বাংলা সুগার মিলসের শেয়ারের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৮২ টাকা ৪০ পয়সা থেকে বেড়ে ১৭৫ টাকা ২০ পয়সায় ওঠে। সর্বোচ্চ দামে পৌঁছানোর পর রোববার শেয়ারটির দাম নেমে আসে ১২৯ টাকা ৪০ পয়সায়।
বর্তমানে ডিএসইতে মোট ৩৯৭টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ২০৫টি 'এ'-ক্যাটাগরিতে, যারা ১০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দেয়; ৮২টি 'বি'-ক্যাটাগরিতে, যারা ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেয়; এবং ১১০টি জেড-ক্যাটাগরিতে, যারা বিভিন্ন অনিয়মের কারণে লভ্যাংশ দেয়নি।
