এফওসির শর্ত শিথিলের পক্ষে পোশাক রপ্তানিকারকরা, বিনিয়োগ ও মূল্য সংযোজন নিয়ে উদ্বেগ স্থানীয় সরবরাহকারীদের
ফ্রি অভ চার্জ (এফওসি) সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির শর্ত শিথিল করার সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে তৈরি পোশাক (আরএমজি) রপ্তানিকারক এবং স্থানীয় টেক্সটাইল ও অ্যাকসেসরিজ সরবরাহকারীরা।
বর্তমানে রপ্তানিকারকরা তাদের বিগত বছরের রপ্তানি আয়ের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যের কাপড়, ট্রিমস, অ্যাকসেসরিজ বা নমুনার মতো কাঁচামাল এফওসি সুবিধায় আমদানি করতে পারেন। গত মাসে সরকার এই সীমা তুলে নিয়ে অনির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে স্থানীয় শিল্প খাতের স্টেকহোল্ডারদের উদ্বেগের কারণে বিষয়টি এখন পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া গতকাল (৩ ডিসেম্বর) টিবিএসকে বলেন, 'আমাদের একটা সিদ্ধান্ত ছিল আমদানি নীতি আদেশে এফওসি ভিত্তিতে পণ্য আমদানির কোটার শর্ত তুলে দেওয়ার। তবে এ বিষয়ে সমজাতীয় পণ্য সরবরাহকারী স্থানীয় শিল্প মালিকদের কাছ থেকে আপত্তি এসেছে। ফলে আমরা আবার আলোচনা করব, সম্ভবত আগামী সোমবার বিষয়টি নিয়ে বৈঠক হতে পারে।'
তবে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা এই নিয়ম শিথিলের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন। তাদের যুক্তি, এতে খরচ কমবে, কাঁচামাল সংগ্রহ সহজ হবে এবং রপ্তানি বাড়বে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, 'আমার ক্রেতা যদি আমাদের কাঁচামাল, অ্যাকসেসরিজ নিজে থেকে পাঠাতে চান, তাহলে সেক্ষেত্রে কোনো শর্ত থাকতে হবে কেন? আমি রপ্তানি করছি কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ।'
তিনি বলেন, বর্তমান নিয়মে এফওসি সীমার কারণে ক্রেতারা কাঁচামাল পাঠাতে না পারলে রপ্তানিকারকদের ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি (ঋণপত্র) খুলতে হয়। এতে ব্যাংকের অনুমোদন, সম্পদ বন্ধক রাখা এবং বিপুল পরিমাণ বার্ষিক ফি পরিশোধের ঝক্কি পোহাতে হয়। হাতেম আরও বলেন, 'যদি এই লিমিটের শর্ত প্রত্যাহার করা না হয়, তাহলে বাড়তি যে রপ্তানি আদেশ এফওসির কারণে পেতাম, তা হারাব।'
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এফওসি সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি বাড়ছে। ক্রেতারা সরাসরি পোশাক কারখানায় সব ধরনের কাঁচামাল সরবরাহ করলে রপ্তানিকারকদের কাঁচামাল সংগ্রহের বোঝা ও ঝুঁকি কমে, যা উৎপাদন প্রক্রিয়াকে মসৃণ করে। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের দাবি, কোটা বা সীমা পুরোপুরি তুলে নিলে অপ্রয়োজনীয় আর্থিক ও পরিচালনাগত জটিলতা কমবে এবং রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে।
স্থানীয় শিল্পের উদ্বেগ
স্থানীয় সরবরাহকারীদের আশঙ্কা, এফওসি কোটা তুলে নেওয়া হলে দেশীয় উৎপাদন ও মূল্য সংযোজনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএপিএমইএ) নভেম্বরের শেষ ও ডিসেম্বরের শুরুতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আলাদা চিঠি দিয়ে এই ঝুঁকির কথা তুলে ধরেছে।
২৯ নভেম্বরের এক চিঠিতে বিটিএমএ সতর্ক করে বলেছে, এফওসি কোটা তুলে নিলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতা, কাপড় ও অ্যাকসেসরিজের চাহিদা কমে যাবে। এতে স্থানীয় মূল্য সংযোজন কমবে এবং ২৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়বে। অন্যদিকে ৩ ডিসেম্বরের এক চিঠিতে বিজিএপিএমইএ বলেছে, অ্যাকসেসরিজ উৎপাদনে বিনিয়োগ করা ৪০ হাজার কোটি টাকারও (৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি) বেশি অর্থ হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সংগঠনগুলো জোর দিয়ে বলেছে, পোশাক খাতের চাহিদার শতভাগ অ্যাকসেসরিজ সরবরাহের সক্ষমতা স্থানীয় উৎপাদনকারীদের রয়েছে। কিন্তু অবাধ এফওসি আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে দেশীয় সরবরাহকারীরা অর্ডার হারাতে পারে।
নীতিমালাটি চূড়ান্ত করার আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আরও আলোচনার পরিকল্পনা করছে। এ বিষয়ে বড়ুয়া বলেন, 'ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করতে আমরা স্থানীয় সরবরাহকারী ও তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকসহ সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা করব।'
