যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে ইউরোপের তুলনায় ১০% কম দাম পান বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা: গবেষণা
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের তুলনায় গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ কম দাম পান। এর প্রধান কারণ হিসেবে মূলত যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার না থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে নতুন এক গবেষণায়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, উভয় বাজারেই বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ছোট রপ্তানিকারকদের তুলনায় ৩০ শতাংশের বেশি বেশি দাম পায়। দরকষাকষির সক্ষমতা ও পণ্যের তুলনামূলক উন্নত মানকে এর মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছে গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)। এতে ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ের কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড (ASYCUDA World) সিস্টেমে থাকা প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ রপ্তানি তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে গতকাল অনুষ্ঠিত এক পরামর্শ সভায় গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে র্যাপিডের উপপরিচালক জিল্লুর রহমান বলেন, "গড় হিসাবে প্রতিষ্ঠানগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১০ শতাংশেরও বেশি কম দামে পণ্য বিক্রি করে।"
তিনি আরও বলেন, অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা না থাকায় উচ্চ শুল্কের কারণে রপ্তানিকারকদের নিজেদের মুনাফা কমিয়ে শুল্কের একটি বড় অংশ বহন করতে হয়, যাতে অন্য দেশের সঙ্গে মূল্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যায়।
তিনি বলেন, "আরও অনুকূল বাণিজ্য ব্যবস্থা থাকলে প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে পণ্যের ভালো দাম পাওয়া সম্ভব হতে পারে।"
১০ ধরনের পোশাক পণ্যের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে এসব পণ্যের দাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের তুলনায় ৫ থেকে ১৮ শতাংশ বেশি।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, জার্মানির বাজারে টি-শার্ট রপ্তানিতে রপ্তানিকারকরা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় ২০ থেকে ২৭ শতাংশ বেশি দাম পান। একইভাবে ট্রাউজারের ক্ষেত্রে জার্মানির বাজারে দাম যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ৯ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি পাওয়া যায়।
স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ 'এভরিথিং বাট আর্মস' (ইবিএ) স্কিমের আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ভোগ করে। পাশাপাশি পোশাকের ক্ষেত্রে সিঙ্গেল-স্টেজ ট্রান্সফর্মেশন শর্তসহ তুলনামূলকভাবে নমনীয় 'রুলস অব অরিজিন' সুবিধাও দেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়।
বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৬৬ শতাংশই ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যায়।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় বাজারেই বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেশি দামে পণ্য বিক্রি করে। দরকষাকষির সক্ষমতা, পণ্যের উন্নত মান এবং বেশি লাভজনক ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের আকারের প্রভাব ইউরোপীয় ইউনিয়নের তুলনায় বেশি। এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, যারা নিটওয়্যার পোশাক রপ্তানিতে বেশি মনোযোগী, তারা গড়ে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ কম দাম পায়—যা নিটওয়্যার পণ্যের তুলনামূলক কম মূল্যকে নির্দেশ করে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক আবু ইউসুফ। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবদুর রহিম খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন তৈয়েবুর রহমান এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আক্তার মালা।
