Skip to main content
  • অর্থনীতি
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলা
  • বিনোদন
  • ফিচার
  • ইজেল
  • মতামত
  • অফবিট
  • সারাদেশ
  • কর্পোরেট
  • চাকরি
  • প্রবাস
  • English
The Business Standard বাংলা

Thursday
January 22, 2026

Sign In
Subscribe
  • অর্থনীতি
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলা
  • বিনোদন
  • ফিচার
  • ইজেল
  • মতামত
  • অফবিট
  • সারাদেশ
  • কর্পোরেট
  • চাকরি
  • প্রবাস
  • English
THURSDAY, JANUARY 22, 2026
আমানুল হক : আলোছায়ার ভাস্কর

ইজেল

সাহাদাত পারভেজ
19 January, 2026, 04:15 pm
Last modified: 19 January, 2026, 05:19 pm

Related News

  • শরীরের ভেতরে সময়, শরীরের ভেতরে ঘড়ি! 
  • মাদুরোর ট্র্যাকস্যুট আর হাতকড়া পরা ‘ঝাপসা’ ছবি যেভাবে সাড়া ফেললো
  • বাংলার আকাশে মার্কিন শকুন
  • হাউজ দ্যাট, আম্পায়ার?
  • ছবিতে খালেদা জিয়ার অন্তিম যাত্রা

আমানুল হক : আলোছায়ার ভাস্কর

বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র নন্দনতত্ত্ব বিশারদ মারি সিটন তাঁকে ‘মহৎ আলোকচিত্রের স্রষ্টা’, ‘বিরল প্রতিভা’ ও ‘সত্যজিৎ রায়ের ঘনিষ্ট বন্ধু’ রূপে বর্ণনা করেছেন। আমানুলের তোলা সত্যজিতের বৈচিত্রময় কর্মকাণ্ডের আলোকচিত্রাবলী মারি সিটনের লেখা সত্যজিৎ রায়ের জীবনী গ্রন্থে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। সত্যজিৎ রায় আমানুলের তোলা ছিন্নমূল মানুষের একটি ছবিকে তুলনা করেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত ফরাসী আলোকচিত্রী হেনরি কার্তিয়ের বেস্রোর ছবির সঙ্গে।
সাহাদাত পারভেজ
19 January, 2026, 04:15 pm
Last modified: 19 January, 2026, 05:19 pm
অনাথ মাঝির বজরায় আমানুল হক।

স্বদেশকে জানবার জন্য গ্রাম, গ্রামের মানুষ আর প্রকৃতিকে বুঝতে চেয়েছিলেন তিনি। নদী আর নারী ছিল তাঁর চোখে দেশপ্রেমের মতো এক মহৎ অবলম্বন। গ্রামীণ জীবন ও লোক সংস্কৃতির সামগ্রিক ধারাকে ফুটিয়ে তুলতে তিনি একনিষ্ঠ প্রয়াসে সদা ব্যপৃত ছিলেন, যা তাঁকে মহান শিল্পী হিসেবে স্বীকৃত করেছে। আমাদের চোখে ধরা না পড়া অথবা হারিয়ে যাওয়া জীবনের ছবি তিনি অন্তর্ভেদী দৃষ্টি নিয়ে ক্যামেরাবন্দী করেছেন। অত্যন্ত ডিটেইলের মধ্য দিয়ে ক্যামেরায় ধরা তাঁর ছবিগুলো মানুষের মন ছুয়ে যায়। এ দেশের জীবনভিত্তিক সৃজনশীল আলোকচিত্র রচনার এক প্রধানতম পথিকৃৎ—আমানুল হক।

বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র নন্দনতত্ত্ব বিশারদ মারি সিটন তাঁকে 'মহৎ আলোকচিত্রের স্রষ্টা', 'বিরল প্রতিভা' ও 'সত্যজিৎ রায়ের ঘনিষ্ট বন্ধু' রূপে বর্ণনা করেছেন। আমানুলের তোলা সত্যজিতের বৈচিত্রময় কর্মকাণ্ডের আলোকচিত্রাবলী মারি সিটনের লেখা সত্যজিৎ রায়ের জীবনী গ্রন্থে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। সত্যজিৎ রায় আমানুলের তোলা ছিন্নমূল মানুষের একটি ছবিকে তুলনা করেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত ফরাসী আলোকচিত্রী হেনরি কার্তিয়ের বেস্রোর ছবির সঙ্গে। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে আমানুলের হাত ধরে যে বাংলাদেশের সৃজনশীল আলোকচিত্রের সূচনা হয়—সে কথা জোড়ালোভাবে বলে গেছেন এ দেশের সৃষ্টিশীল আলোকচিত্রের অন্যতম দুই পথিকৃৎ নাইব উদ্দিন আহমেদ ও ড. নওয়াজেশ আহমদ।

আমানুলের জন্ম যমুনার উপকণ্ঠে সিরাজগঞ্জের কড্ডা গ্রামে, নানাবাড়িতে; আজ থেকে ঠিক একশ বছর আগে কার্তিকের এক সন্ধ্যায়। জন্মের পর বাবা ডায়রিতে লিখলেন—'৬ নভেম্বর, ১৯২৫, ২৬ কার্তিক, ১৩৩২ বঙ্গাব্দ।' শনিবার জন্ম নেওয়া এই নবজাতকের ডাকনাম রাখা হয় 'মতি'। ১১ ভাইবোনের মধ্যে মতি দ্বিতীয়। দুই বোন অকাল প্রয়াত। আমানুলের দাদাবাড়ি সিরাজগঞ্জের ঘোরজান গ্রামে। তাঁর বাবা আবদুল হক ছিলেন একজন নামকরা চিকিৎসক। তিনি ছিলেন কিংবদন্তি চিকিৎসা-বিজ্ঞানী, ভারতরত্ন ও 'পথের পাঁচালী'র পৃষ্ঠপোষক ডা. বিধান রায়ের প্রিয় ছাত্র। শেকড়ের টানে বিশাল ক্যারিয়ার ছেড়ে তিনি শাহজাদপুরে চলে এসেছিলেন। তাঁর মা হাজেরা খাতুন ছিলেন ধাত্রীবিদ্যায় প্রশিক্ষিত। চল্লিশের দশকে তাঁর বাবা শাহজাদপুরের মনিরামপুরে বাড়ি কিনে স্থায়িভাবে বসবাস শুরু করেন। 

শরতে কাশবনে

আমানুলের শৈশব কাটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজরিত শাহজাদপুরে। ব্রিটিশ আমলে শাহজাদপুর ছিল মহকুমা। এখন সিরাজগঞ্জের একটি উপজেলা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর বজরা জীবন আমানুলের শৈশবে বেশ প্রভাব ফেলেছিল। বাবার চাকুসিূত্রে শৈশবে তিনি শাহজাদপুর সরকারি হাসপাতালের কোয়াটারে থাকতেন। এই হাসপাতালের পশ্চিমপাড়ে ছিল রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি। কুঠিবাড়ি আর হাসপাতালের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হতো করতোয়া নদীর একটি ক্ষীণ ধারা। শুষ্ক মৌসূমে সেই নদীতে পানি থাকতো না। শুকিয়ে যাওয়া নদীর বুক পেরিয়ে প্রায় কুঠিবাড়িতে চলে যেতেন আমানুল। বাবার বদলিজনিত কারনে কিছু সময় থেকেছেন উল্লাপাড়ায়। 

১৯৩২ সালে শাহজাদপুর মাইনর ইংলিশ স্কুলে [বর্তমানে ইব্রাহিম গার্লস হাইস্কুল] আমানুলের প্রাথমিক বিদ্যাশিক্ষা শুরু হয়। শৈশবে আকৃষ্ট হন ছবি আঁকার প্রতি। ছবি আঁকার হাতেখড়ি পান বাবার কাছে। ১৯৩৯ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন উল্লাপাড়া মার্চেন্ট হাইস্কুলে। অষ্টম শ্রেণিতে উঠতেই তাঁর ছবি তোলার নেশা পেয়ে বসে। শাহজাদপুরে তখন হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বেশ সম্প্রীতি ছিল। হিন্দুরা ছিল বর্ধিষ্ণু। ওখানে তখন দুজন স্টুডিও ফটোগ্রাফার ছিলেন। একজন বীরেন সাহা, আরেকজন অতুল সাহা। বীরেন সাহাকে দেখেই ক্যামেরার প্রতি আকৃষ্ট হন আমানুল। কিন্তু ফটোগ্রাফিটা শেখেন সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায়। 

তখন ১৯৪১ সাল। ওই সময় হিন্দু-মুসলমানের ঘরে ঘরে পঞ্জিকা রাখা হতো। একদিন পঞ্জিকায় দেখলেন জাপানি ক্যামেরার বিজ্ঞাপন। ক্যামেরাটার দাম তিন টাকা চার আনা। ডাকযোগে লিখলেন, 'এই ক্যামেরাটা আমার চাই।' কয়েকদিন পর কলকাতা থেকে তাঁর বাসায় একটা প্যাকেট আসে। প্যাকেটটা খুলেই বুঝতে পারেন, এটা আসল ক্যামেরা নয়, খেলনা! সেদিন মন খারাপ করে কেঁদে ফেলেন ১৬ বছরের আমানুল। এরপর কলকাতা থেকে আবার বেবি ব্রাউনি ক্যামেরা আনান। এই ক্যামেরা নিয়ে তিনি প্রতিদিন বেড়িয়ে যেতেন বাড়ি থেকে বহু দূরে—স্নিগ্ধ গ্রামের সুদূর বিস্তীর্ণ মাঠে, নদীতে, বিলে। বাংলার পথে পথে ঘুরে ক্রমশ যে জীবন আর জাদুযন্ত্রের প্রতি বিচিত্র আকর্ষণ তৈরি হয় তা সারা জীবনেও আর ত্যাগ করতে পারেন নি। 

আমানুল হক। ছবি: শহিদুল আলম

ম্যাট্রিক পাস করে পাবনা অ্যাডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু পড়াশোনায় তাঁর মন নেই। এসময় পেয়ে বসে বেহালা বাজানোর নেশা। সারাদিন পড়ে থাকেন ক্যামেরা, রং-তুলি আর বেহালা নিয়ে। দেশে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর পঞ্চাশের মন্বন্তর পরবর্তী দুর্ভিক্ষ। আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুপ্ত বাসনা নিয়ে পাবনা ছেড়ে ঢাকায় আসেন আমানুল। ঢাকায় থাকা-খাওয়ার জায়গা নাই। প্রথম দিকে এতিমখানার মেঝেতে শুয়ে রাত কাটান। রাস্তার খোলা খাবার খেয়ে জটিল পীড়ায় আক্রান্ত হন। এরমধ্যে পাগলা কুকুরের কামড় খেয়ে জীবন একেবারে পর্যদস্তু। মামার সহযোগিতায় হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অপমৃত্যু থেকে বেঁচে যান আমানুল।

একদিন গেলেন আর্ট স্কুল দেখতে। ঢাকার রাস্তা, আর্ট স্কুল—সবকিছুই তাঁর কাছে নতুন। তখন ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুলের দুটি কামরায় সাময়িকভাবে ক্লাস হতো। ঘরের মধ্যে ডানে-বায়ে সারিবদ্ধভাবে বেঞ্চে বসে ছাত্ররা ক্লাস করতো। ঘরের ভেতর হঠাৎ ঢুকে পড়েন আমানুল। দুই বেঞ্চের মাঝখানে সরু লম্বালম্বি জায়গাটুকু দিয়ে হাঁটছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আনোয়ারুল হক। অচেনা এক যুবকের উপস্থিতিতে হালকা-পাতলা গড়নের একজন বললেন, 'তুমি এখানে কী চাও?' আমানুল বিনীতভাবে বললেন, 'আর্ট স্কুল দেখতে এসেছি।' লোকটি তখন রূঢ় ভাষায় বললেন, 'তুমি ক্লাসে ঘোরাফেরা করতে পারো না।' লোকটার কথা শুনে আমানুলের আর্ট স্কুল দেখার সঞ্চারিত আবেগে হোঁচট লাগে। অনেক দিন তিনি আর ওই পথ দিয়ে যান না।

একদিকে আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুপ্ত বাসনা, অন্যদিকে ঢাকায় বিরূপ বাস্তবতাকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা। ছবি তোলার খরচ আর রুটি-রুজির জন্য শুরু করলেন টাইপিস্টের কাজ। প্রতিদিন ইডেন বিল্ডিং [বর্তমানে গণপূর্ত বিভাগের ইডেন ভবন] থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে টাইপ রাইটারের কাজ করতেন। ক্যামেরাটা সঙ্গেই থাকতো। পথে দরিদ্রপীড়িত মানুষের দুঃখ-দুর্দশার ছবি তুলতেন। এসব মানবিক ছবি তোলার কারনেই শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। শিল্পাচার্য তাঁর ভেতর দেখতে পান এক বিরল শিল্প প্রতিভা। শিল্পাচার্যের অনুপ্রেরণায়ই তিনি আর্ট কলেজে ভর্তি হন। জয়নুলই তাঁকে বোঝান—ছবি আঁকার সুফল কেমন করে তাঁর ফটোগ্রাফি চর্চায় ইন্দন যোগাবে। ওই সময় রমনার নয়নাভিরাম শালবন তাঁকে গভীরভাবে আকর্ষণ করতো। তখনকার দিনের ছোট্ট একটা কোডাক ক্যামেরা নিয়ে সন্ধানী দৃষ্টিতে ঘুরতে ঘুরেতে ক্লান্ত হয়ে ওই শালবনের গাছে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিতেন। ওই সময় আমানুলের তোলা 'রমনার শালবন' নামে একটি ছবি কলকাতার দৈনিক আজাদ-এ ছাপা হয়। এই ছবি প্রকাশের ফলে ঢাকার পাঠক মহলে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু অর্থকষ্ট আর নানা টানাপোড়েনে আর্ট স্কুলে পড়া তাঁর পক্ষে হয়ে ওঠে না।

আমানুল হক যৌবনে

সাতচল্লিশের দেশভাগ পরবর্তী সময়ে ঢাকায় টিকে থাকার জন্য আমানুল একটা কেরানীর চাকরি খুঁজছিলেন। এই সময় কথাসাহিত্যিক শামসুদ্দীন আবুল কালামের মাধ্যমে প্রাদেশিক সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। হবীবুল্লাহ বাহার অনেক আগে থেকেই ফটোগ্রাফিচর্চার সঙ্গে যুক্ত। ঢাকায় তিনি একজন মেধাবি আলোকচিত্রীর খোঁজ করছিলেন। তাঁর সহযোগিতায় আমানুল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে 'শিল্পী' পদে চাকরি পান। তখন আলোকচিত্রীদের 'শিল্পী' বলা হতো। ছবি তোলার পাশাপাশি তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রের শিক্ষার্থীদের জন্য আঁকতেন মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ছবি। এরমধ্যে শুরু হয়ে যায় রাষ্ট্রভাষা অন্দোলন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদ রফিকউদ্দিন আহমদের ছবি তুলে তিনি বিশাল খ্যাতি লাভ করেন। একুশের রক্তঝরা অপরাহ্নে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি এই ছবিটি তুলেছিলেন। এই ছবি তোলার কারণে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান সরকার বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এই ছবিতেই প্রমাণিত হয়, ছত্রভঙ্গ করতে ফাঁকা গুলি নয়, বরং হত্যার উদ্দেশ্যেই ওই দিন মিছিলে গুলি চালানো হয়েছিল। গোয়েন্দারা তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের চাকরি ছাড়েন। শেষে আশ্রয় নেন কলকাতায়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসলে তাঁর মাথার উপর থেকে হুলিয়ার বোঝা নেমে যায়।

বায়ান্ন আমানুলের জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। ওই বছর তেজগাঁও কৃষি কলেজের ফারমারস ফেয়ারে নওয়াজেশ আহমদ, নাইব উদ্দিন আহমদের সঙ্গে তাঁর যৌথ আলোকচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সেই প্রদর্শনীর রিভিউ ছাপা হয়েছিল কালচারাল জিওগ্রাফিতে। ইংল্যান্ডের 'ফেস্টিবল অব ব্রিটেন' প্রদর্শনীতেও প্রদর্শিত হয় তাঁর আলোকচিত্র। ওই বছরই কলকাতার প্রগতিশীল মাসিক পত্র নতুন সাহিত্যের শারদীয় সংখ্যার মুখপাতে 'অলস মধ্যাহ্ন' শিরোনামে ছবিটি ছাপা হয়। এই ছবিই দুই বাংলার শিল্পমহলে তাঁকে বেশ পরিচিত করে তুলে। ১৯৫২ পূর্ব সময়েও আমানুলের তোলা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বহু ছবি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত ও অসংখ্য দেশী-বিদেশী পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তৎকালে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আলোকচিত্রের সংকলনে তাঁর তোলা 'গায়ের বধু' ছবিটি স্থান লাভ করেছিল। 

হাস্যোজ্জ্বল তরুণীরা। ছবি: আমানুল হক

কলকাতায় গিয়ে বেশ কিছু সময় আমানুলের বেকার জীবন কাটে। এ সময় তিনি প্রায় প্রতিদিন নতুন সাহিত্য পত্রিকা অফিসে গিয়ে আড্ডা দিতেন। এই আড্ডায় তিনি সম্পাদক অনিল কুমার সিংহ, পূর্ণেন্দু পত্রী, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও মার্কসবাদী লেখক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের আরো ঘনিষ্ট সাহচর্য পান। অনিল কুমার সিংহের অনুরোধে বেকার আমানুলের কর্মসংস্থানের জন্য দেবীপ্রসাদ বিলেতি বিজ্ঞাপনী সংস্থা ডি জে কিমারে একটি চিঠি লিখলেন। সেই চিঠি নিয়ে আমানুল গেলেন কিমার অফিসে। চিঠি পেয়ে কিমারের কর্তাব্যক্তিরা তাঁর ছবিগুলো খুবই আগ্রহের সঙ্গে দেখলেন। একজন লোক খুবই ব্যতিব্যস্ত। লম্বা চওড়া ও খুবই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোকটি আসা-যাওয়ার সময় আড়চোখে ছবিগুলো দেখলেন। তখনো আমানুল জানতেন না এই ব্যক্তি কে? পরে জেনেছেন—তিনি সত্যজিৎ রায়। কিমারের ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার হিসেবে ছবি তোলার জন্য তিনি সম্মানী পেতেন। ভারতের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী সুনীল জানাকে ছবির জন্য কিমার যে সম্মানী দিত সেই পরিমান সম্মানী আমানুলকেও দেওয়া হতো। কিমারের সম্মানী ও ন্যাশনাল বুক এজেন্সির ডেস্ক ক্যালেন্ডারের ছবি তুলে যে সামান্য সম্মানী পেতেন তা দিয়ে তাঁর জীবন নির্বাহ করতে হতো। 

কলকাতায় থেকে যাওয়ার আরো একটি কারন ছিল। আমানুল ভেবেছিলেন কলকাতায় থেকে সিনেমা বানানোর কাজ শিখবেন। ১৯৫৯ সালের এক রবিবার সকালে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমানুল গিয়ে হাজির হন সত্যজিৎ রায়ের ৩ নম্বর লেক টেম্পল রোডের তিনতলা বাড়িতে। 'পথের পাঁচালি' ছবির কারণে সত্যজিৎ ততদিনে জগদ্বিখ্যাত। তিনি তখন 'দেবী' ছবির স্ক্রিপ্ট লিখছিলেন। সুভাষ বাবুকে দেখেই সত্যজিৎ সহজ ভঙিতে উঠে দাঁড়ালেন; দুজনকে বসতে অনুরোধ জানালেন। কথা বলার এক পর্যায়ে সুভাষ বাবু আমানুলকে ছবি দেখানোর ইঙ্গিত করলেন। ছবিতে চোখ রেখে গম্ভীর গলায় সত্যজিৎ বললেন, 'আমি তো আপনার ছবি আগেই দেখেছি।' ওইদিন আমানুল তাঁর 'অলস মধ্যাহ্ন' ছবিটার একটা বড় প্রিন্ট ফ্রেমে বাঁধিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। ছবিটা তিনি সত্যজিৎকে উপহার দেন। ছবিটা সত্যজিতের মনে ধরে। সেদিন তাঁরা সত্যজিতের বাসায় ঘন্টাখানেকের মতো ছিলেন। সত্যজিৎ ছোট ছোট বাক্যে গুছিয়ে কথা বলছিলেন। কথা শুনে আমানুল সত্যজিতের প্রতি ভীষণ আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। এরপর সত্যজিতের সান্নিধ্য পেতে তিনি প্রায়ই তাঁর বাড়িতে গিয়ে হাজির হতেন। সত্যজিৎও তাঁর উপস্থিতি পছন্দ করতেন। সম্পর্কটা এক সময় এমন কাছের হয়ে যায় যে বিজয়া রায়ও ঘরের ভেতর থেকে এসে আমানুলের খোঁজ নিতেন।

একদিন সত্যজিতের মা সুপ্রভা দেবীর সঙ্গে আমানুলের পরিচয় হয়। পরিচয়ের শুরুতে আমানুল তাঁকে প্রণাম করলেন। আরেক দিন বাসায় গিয়ে দেখেন বৈঠকখানায় বসে তিনি সন্দীপ রায়ের সঙ্গে গল্প করছিলেন। সন্দীপের বয়স তখন চার। সন্দীপ ও সুপ্রভা রায়ের ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা রেডি করতেই সত্যজিৎ ও বিজয়া রায় বৈঠকখানায় এসে বসলেন। সেদিন সত্যজিৎ ছিলেন খোশমেজাজে। থুতনির নিচে হাত রাখলেন। ছবি তোলার সময় কাউকে কিছু বলতে হলো না। আমানুল শুধু ক্যামেরার শাটার চাপলেন। মা, স্ত্রী আর ছেলের সঙ্গে সত্যজিতের এমন ছবি আমানুল ছাড়া আর কোনো আলোকচিত্রী তুলতে পেরেছেন বলে জানা নেই।

আমানুল সম্পর্কে আমাদের কথা বইয়ে [আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, প্রকাশকাল : ৮ মে ২০০৮, পৃ : ২২৫] বিজয়া রায় লিখেছেন, '১৯৫৯ সালে যখন আমরা এ বাড়িতে এলাম, তখন আমানুল হক বলে বাংলাদেশী একটি ছেলে আমাদের বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়। সে ফোটোগ্রাফার, এবং তার মতে মানিকের [সত্যজিৎ রায়ের ডাকনাম] মতো সাবজেক্ট খুঁজে পাওয়া মুশকিল বলে মানিকের ছবি তুলবার অনুমতি চাইল। ছেলেটির কথাবার্তা ভারী সুন্দর, এবং অত্যন্ত অমায়িক। দেখেশুনে আমাদের ভালোই লাগল এবং মানিক সহজেই অনুমতি দিলেন। আমার শাশুড়িকেও সে প্রণাম করল। কিছুদিনের মধ্যে আমাদের বাড়ির লোকের মতো হয়ে গিয়েছিল ছেলেটি। ওকে মানিকের খুব পছন্দ হয়েছিল। সত্যি চমৎকার ছবি তোলে, এবং এখনো কলকাতায় এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করে। ছবিও তোলে। আমার বউমা এবং নাতির বহু ছবি ও তুলেছে। আমাদের চারজনের ছবি একমাত্র ও ছাড়া আর কেউ তোলেনি। আমি, আমার শাশুড়ি, মানিক ও বাবু [সন্দীপ রায়]। বাবু অবশ্য তখন খুবই ছোট, সেও আমানুলের সঙ্গী হয়ে পড়ল। বেচারার স্বাস্থ্য খুব ভালো না। ডাক্তার দেখাতে প্রায়ই কলকাতা আসে।' 

আমানুল সত্যজিৎ রায়ের দেবী, তিন কন্যা, কাঞ্চনজঙ্ঘা, অভিযান, মহানগর, পোস্টমাস্টার, নায়ক, ঘরে-বাইরে চলচ্চিত্র ও রবীন্দ্রনাথ তথ্যচিত্রের শুটিংয়ের ছবি তোলেন। আমানুল কিন্তু ইউনিটের হয়ে ছবি তুলতেন না। তিনি সত্যজিৎকে চিত্রিত করতেন তাঁর শিল্পী মনের তৃষ্ণা থেকে। তিনি ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত সত্যজিৎ রায়ের নানা কর্মকাণ্ডের ছবি তুলেছেন। এরপরও যত বার কলকাতায় গেছেন তাঁর ক্যামেরা সত্যজিৎকেই ঘিরে ছিল। তিনি সত্যজিতকে 'গুরু' মানতেন। আর সত্যজিত তাঁকে বন্ধু ভাবতেন। সত্যজিৎ রায়ের জীবনীকার মারি সিটনের লেখা পোর্ট্রেট অফ এ ডিরেক্টর : সত্যজিৎ রায় বইয়ে এসবের বিস্তারিত উল্লেখ আছে। প্রসঙ্গ সত্যজিৎ ফটো অ্যালবামে আমানুলও বিস্তৃতভাবে লিখেছেন তাঁদের দীর্ঘ সম্পর্কের বয়ান।

১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। বিরূপ পরিস্থিতিতে আমানুলের পক্ষে আর কলকাতায় থাকা সম্ভব হলো না। ঢাকায় এসে উঠলেন ছোট মামা শামসউদ্দিন আলমাজির আজিমপুরের বাসায়। দেশে তখন ছয় দফার উত্তাপ। এই উত্তাপ ছড়াতে থাকে একটি গণঅভ্যুত্থানের দিকে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধপরবর্তী সংগ্রামী ঘটনাবলী তাঁর আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে। বলা যায়, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রায় সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যে তাঁর উপলব্ধির পটভূমি বিস্তৃত। 

নৌকা বাইচ। ছবি: আমানুল হক

মুক্তিযুদ্ধের পর বিশাল বাংলার অপার ঐশ্বর্য ও মহিমার স্বরূপ তাঁকে উতলা করে তোলে। জীবনের মহিমা আর সুন্দরের গান তাঁকে অনুপ্রাণিত করে নতুন ধারার ছবি তোলায় আত্মনিমগ্ন হতে। এই ধ্যানমগ্নতার তীর্থভূমি হিসেবে তিনি বেছে নেন শাহজাদপুরকে। শাহজাদপুরের গ্রাম, নদী, নদীতীরবর্তী মানুষ, শস্যক্ষেত, পালতোলা নৌকা, নৌকা বাইচ, যাত্রাপালা, পুঁথিপাঠ, কবি গান, দোল উৎসব, খেলাধুলা—গ্রামবাংলার এই চিরায়ত রূপের দৃশ্যায়ন তাঁর কাছে আরাধনার মতো হয়ে ওঠে। নতুন উদ্দীপনা নিয়ে আমানুল শাহজাদপুরে যান ১৯৭৫ সালে। এরপর নগর জীবনে স্বচ্ছন্দ তাঁকে আর ধরে রাখতে পারে না। তিনি বার বার গ্রামে চলে যান। গ্রামই হয়ে ওঠে তাঁর সকল প্রেরণার উৎস। ১৯৭৯ সাল থেকে তিনি নিয়মিত শাহজাদপুরে যেতে শুরু করেন। এ সময় তাঁর মাথায় আসে বজরায় করে ছবি তোলার বিষয়টি। দুই যুগের বেশি সময় তিনি বজরায় ভেসে বিপুলা বাংলার ছবি তুলেছেন।

শিল্পীসুলভ অস্থিরতা নিয়ে আমানুল বুঝতে চেয়েছেন, কেন যমুনা নদীর ছবি দেখে বোঝা যাবে না যে এটি যমুনার ছবি? কেন নারীর কমনীয় সুষমা ও মহিমাকে ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস ব্যর্থ হয়ে যাবে? বাংলার লোকশিল্প, লোকসাহিত্য ও শিল্পকর্মে নারী চরিত্রের বিরাট সুষমা ও মহিমাকে তিনি যতবার প্রত্যক্ষ করেছেন ততবারই সেই বিশেষ বৈশিষ্ট্য আলোকচিত্রে ফুটিয়ে তোলার প্রেরণা লাভ করেছেন। আর এই বৈশিষ্ট্যের স্বীকার সম্বলিত ছবিগুলো নিয়ে তিনি যখন তন্ময় হয়ে যেতেন তখন তাঁর চোখ আদ্র হয়ে ওঠতো। শান্তির প্রতীক পায়রা আর নারীর কমনীয় প্রকাশে, ঘনায়মান অন্ধকারে কুপি বাতির আলোতে গ্রামবাংলার শ্যামল সুষমাভরা রূপসী বধু এলিকে ঘিরে আমানুলের ক্যামেরা তন্ময়; কবির বাঙময় কলমের মতো অপসৃয়মান যে কল্পরূপকে ধরে রাখার প্রয়াসে ব্রতি, সেই প্রয়াস আবাহমান বাংলার চিরন্তন লোকজশৈলির অনুপ্রেরণায় সমৃদ্ধ। সাজের কাছে হেরে যাওয়া চিরবঞ্চিত, পরিত্যক্ত, কুরূপা গ্রাম্যবধু হাজেরাও নিবিড় আন্তরিকতায় আমানুলের প্রাণের কাছাকাছি এসে জায়গা করে নেয়। বসন্তের সমারোহে শিমুল ফুলের প্রগলভ হাতছানি তাঁর শিল্পী মনকে এতটাই অস্থির করে তোলে, তখন কুরূপা হাজেরাও হয়ে ওঠে নায়িকা।

শাহজাদপুরে যাওয়ার আগে আমানুল সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন রূপের গয়না, কোমড়ের বিছা, মাদুলি, ধান তাবিজ, তারা হার, আর লাল-হলুদ রঙের বিশেষ বুনটের শাড়ি। আমানুল মনে করতেন, আবহমান কাল ধরে বাংলা একই রকম নেই। যেমন নেই নদীর গতিপথ কিংবা সংস্কৃতির ধারা। কিন্তু প্রাচীন ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করার প্রয়াস আছে শিল্পে-সাহিত্যে। ঐতিহ্যগত জীবনধারা, আচার-আচরণ, রীতি-নীতি, ব্যবহার্য নানা কিছু দ্রুত অপসৃয়মান হয়ে যাচ্ছে। ফলে চেষ্টা করেও কিছুকাল পরে এগুলো আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। এই বোধ থেকে তিনি গ্রামে ছুটে গিয়ে বাংলার এসব লোক ঐতিহ্যকে ক্যামেরায় ধারণ করতেন। 

আমানুল শুরুতে তাঁর মামাতো বোন এলিজা খান এলিকে মডেল করে ছবি তুলতেন। ১৯৭৮ সালে রাউতারা জমিদারবাড়ির তরুণ খানের সঙ্গে এলির বিয়ে হয়ে যায়। সেই থেকে রাউতারা গ্রামের সঙ্গে আমানুলেরও ঘনিষ্ট যোগাযোগ তৈরি হয়। শাহাজাদপুরে গিয়ে আমানুল প্রথমে উঠতেন রাউতারা জমিদারবাড়িতে, যেখানে এলি থাকতেন। কখনো কখনো উঠতেন মামাতো ভাই আবদুল মোমেন আলমাজি মনুর রূপপুরের বাড়িতে কিংবা পৈতৃক বাড়ি রানি কুটিরে। তিনি এলির ছবি তুলেছেন দেড় যুগেরও বেশি সময়। শহুরে বধু নাসরিন জাহান উল্কার ছবি তুলেছেন গ্রামের নারীর বেশে। আরো কয়েকজন অচেনা নারীর ছবি আমরা দেখি। সাপ্তাহিক বিচিত্রার প্রচ্ছদে সেইসব ছবি সময়ের সাক্ষী হয়ে আছে।

রূপসী বধু। ছবি: আমানুল হক

রাউতারা গ্রামের অনাথ আলী মাঝির বজরায় ভেসে যমুনা, পদ্মা, বড়াল, ফুলঝুরি, হুড়াসাগর, করতোয়া, ইছামতি নদী আর গাজনা বিলে ঘুরে বেড়াতেন আমানুল। 

নদীপাড়ের সাধারণ-সরল মানুষরা ছিলেন আমানুলের পরম আত্মীয়ের মতো। গ্রামের অজ্ঞাত-অখ্যাত মানুষের কাছে তিনি যে খাতির যত্ন পেয়েছিলেন তা ছিল তাঁর জীবনের পরম পাওয়ার মতো। এই সব মানুষেরা আমানুলকে ডাকতেন 'মতিন ভাই'। প্রশংসা ও প্রচারবিমুখ আমানুল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন গ্রামের এই অবহেলিত মানুষদের মধ্যেই তাঁর নিজের পরিচয়টুকু লেখা থাকবে। তাঁর বজরা যখন গ্রামের পাশ দিয়ে যেত তখন ছেলেপেলেরা আনন্দে চিৎকার করে বলতো—'ফটক তোলা লাও যায়।' দীর্ঘকাল নদীতে-নৌকায় ভ্রমণ, গ্রামগঞ্জে ঘুরে ছবি তোলার নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে একাগ্র চেতনায় নিমগ্ন থাকার মতো অত্যন্ত শ্রমসাধ্য কর্মসাধনা শরীরকে ভগ্ন করে দিলেও তাঁর মনের তারুণ্যকে কখনো কাবু করতে পারেনি। প্রতি বছর বর্ষা এলে তিনি আবার চলে যেতেন সেইসব গ্রামে, যেখানে নদী বয়ে যায় জীবনের গান গেয়ে। ঘাটে বাঁধা তরণী, যেখান থেকে তাঁর যাত্রা শুরু পদ্মায়, যমুনায়, করতোয়ায়। কয়েক মাস নদী ভ্রমণ শেষে আমানুলের বজরা যে ঘাটে গিয়ে ভিড়তো, বহু বছর আগে রবীন্দ্রনাথও সেই ঘাটে বজরা ভিড়াতেন। এই কথা আমানুল শুনেছিলেন শেশবেই।

আমানুল কখনো যশের কাঙ্গাল ছিলেন না। এসব তাঁকে স্পর্শ করতো না। তবু তাঁর যশ-খ্যাতি—এসব এসেছে জোয়ারের মতো। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের কাছে তৎকালীন প্রতিক্রিয়াশীল মুসলীম লীগ সরকারের পরাজয়ের পর ঢাকার বর্ধমান হাউসে [বর্তমানে বাংলা একাডেমি] 'পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন' অনুষ্ঠিত হয়। দুনিয়ার নানা দেশে থেকে কবি-সাহিত্যিক আর সাংবাদিকরা আসেন সেই সম্মেলনে। ওই সম্মেলনে আমানুলের শতাধিক ছবি দিয়ে 'আমার দেশ' শিরোনামে বিশেষ একটা প্রদর্শনীর আয়োজন হয়। এটাই ছিল তাঁর প্রথম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। প্রদর্শনীটি দুই বাংলার সুধি মহলে অকুণ্ঠ প্রশংসা লাভ করে। 

১৯৫৭ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী টাঙ্গাইলের কাগমারীতে এক মহাসম্মেলনের ডাক দিলেন। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জগতের বহু গুণীজন সেই সম্মলনে যোগ দিয়েছিলেন। ওই সম্মেলনে 'আমার দেশ' শিরোনামে আমানুলের দ্বিতীয় প্রদর্শনীর অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রদর্শনী করার গোপন মানুষ ছিলেন কাজী মোহাম্মদ ইদরিস। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ছবি তুলে আমানুল ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলেন। সেই থেকে মওলানা ভাসানী আমানুলকে চিনতেন। ভাসানী স্নেহ করে আমানুলকে ডাকতেন 'শিল্পী'। মওলানাকে আমানুল  বলতেন, 'হুজুর, আপনার আর্শীবাদ পেলে একদিন অবশ্যই শিল্পী হতে পারবো।' আমানুল মওলানা ভাসানীর প্রথম ছবি তোলেন ১৯৫৪ সালে। তখন তিনি দৈনিক সংবাদ এর জন্য মাঝে মাঝে ছবি তুলতেন। সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরী একবার আমানুলকে বললেন, মওলানার কোনো ছবি নাই। চলুন একদিন তাঁর ছবি তুলে আনবো।'

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আমানুলের তোলা 'আমার দেশ' সিরিজের ছবি ছাপা হতো সে সময়ের বিখ্যাত অবজারভার সানডে ম্যাগাজিন, দৈনিক পাকিস্তান সাময়িকী, মাসিক দিলরুবা, মাহেনও আর সওগাত পত্রিকায়। ইত্তেফাকেও ছাপা হতো। দেশ স্বাধীনের পর সাপ্তাহিক বিচিত্রা ও পাক্ষিক বেতার বাংলার প্রচ্ছদে তাঁর ছবি নিয়মিত ছাপা হতো। দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার বিশেষ আলোকচিত্রী ছিলেন আমানুল। বিভিন্ন দিবসে তাঁর ছবি দিয়ে পত্রিকাটির সাময়িকীর প্রচ্ছদ করা হতো। শেষ জীবনে তাঁর ছবি গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হতো দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায়। সাপ্তাহিক বিচিত্রা ও সাপ্তাহিক চিত্রালীতে লিখেছেন অসংখ্য স্মৃতিগদ্য। একুশের তমসুক, প্রসঙ্গ সত্যজিৎ, ক্যামেরায় স্বদেশের মুখ, স্মৃতিচিত্র—এই চারটি অমর গ্রন্থের রচয়িতা তিনি। তাঁর বইগুলো ঢাকার 'সাহিত্য প্রকাশ' থেকে প্রকাশিত হয়। আমানুল হক তাঁর সারা জীবনের ছবি দিয়ে একটি মননশীল স্বল্পদৈর্ঘ চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রয়াসী ছিলেন। শিল্পীর সেই স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে গেছে।

একজন ভাষাসংগ্রামী হিসেবে ২০১১ সালে একুশে পদক লাভ করেন আমানুল। একুশে পদক প্রাপ্তির সময় তাঁকে সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নগদ পাঁচ লাখ টাকা ও মোহাম্মদপুরে একটি বাড়ি বরাদ্ধ দেন। সেই বাড়িটি ফিরিয়ে দিয়ে তিনি বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, 'এখনো অনেক মুক্তিযোদ্ধা রাস্তায় ঘুমায়। আমার থাকার জায়গা আছে। তাই আমার এই বাড়ির দরকার নাই।' বিনয়ের সঙ্গে তিনি বাড়িটি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। একুশের পদক হিসেবে তিনি যে সোনার মেডেল ও সম্মাননা পত্র পেয়েছিলেন তা তিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে দান করে গেছেন। একুশে পদক ছাড়াও ২০১১ সালে ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক ছবি মেলা আজীবন সম্মাননা, ২০১২ সালে দ্য ডেইলি স্টার সেলিব্রেটিং লাইফ আজীবন সম্মাননা, ১৯৯৯ সালে জনকণ্ঠ প্রতিভা সম্মাননা ও ২০০০ সালে ভাষা আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর থেকে ভাষাসংগ্রামী হিসেবে সম্মাননা লাভ করেন। ২০০৯ সালে পান বাংলা একাডেমির সম্মানসূচক ফেলোশিপ। ওই বছরই ঢাকার চারশ বছর পূর্তি উৎসব নাগরিক কমিটি তাঁকে ভাষাসংগ্রামী হিসেবে সম্মাননা প্রদান করে। ১৯৮৯ সালে তাঁকে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির আজীবন সদস্যপদ প্রদান করা হয়। তিনি বাংলা পিডিয়ার গবেষণাকাজে যুক্ত ছিলেন। 

আমানুল অকৃতদার ছিলেন। তাই সারা জীবন ঘুরে ফিরে ভাইবোনদের কাছেই ছিলেন। বেশির ভাগ সময় ছিলেন বড় ভাই আজমল হকের বাসায়। এছাড়া ছোট ভাই প্রকৌশলী নাজমুল হকের মহাখালির বাসা 'কোলাহল' ও ছোট বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক ড. আয়শা বেগমের এলিফেন্ট রোডের বাসায় থেকেছেন অনেকটা সময়। উপান্ত সময়ে থাকতেন শাহবাগের আজিজ কো-অপারেটিভ সোসাইটিতে, তাঁর বড় ভাইয়ের বাসায়। 

ওই সময় তাঁকে দেখার মতো যথেষ্ট লোক ছিল না। বড্ড একাকি আর অবহেলায় তাঁর শেষ সময় কাটে। ওই সময় বিছানায় শুয়ে তিনি ডায়রিতে লিখেন, 'আমার মৃত্যুর পর কোনো আনুষ্ঠানিকতার অবতারণা দয়া করে করবেন না। এই আমার অনুরোধ এবং শেষ ইচ্ছা। আমি প্রকৃতির কোলে আশ্রয় পেতে চাই।' ২০১৩ সালের ১৫ মার্চ তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে বর্তমান বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি হন। আগের দিন দুপুরে বারান্দায় রাখা নেগেটিভগুলো বৃষ্টিতে ভিজে যায়। নিজের ছবি অনাদরে ভিজতে দেখে আমানুলের চোখে কান্নার বান নামে। হাসপাতালের কেবিন ব্লকের ৫০২ নম্বর কক্ষে অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহর তত্ত্বাবধানে ছিলেন আমানুল। ফুসফুসে পানি জমার কারনে ৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় তাঁর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। বাংলাদেশ মেডিক্যালে আইসিইউয়ের সিট খালি না থাকায় রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকা সেন্ট্রাল হাসপাতালের দিকে রওনা হন স্বজনরা। কিন্তু পথেই মহাজীবনের যতি টানেন আমানুল। 

 [দ্য রোমান্টিক ডকুমেন্টেরিয়ান
এশিয়ার সর্ববৃহৎ আলোকচিত্র উৎসব 'ছবি মেলা' শুরু হয়েছে ১৬ জানুয়ারি। ১১তম এই মেলার মূল প্রতিপাদ্য 'পুনঃ'। ১৬ দিনব্যাপী এই মেলায় বাংলাদেশসহ ১৮টি দেশ অংশ নেবে। মেলায় যোগ দেবেন পাঁচটি মহাদেশের ৫৮ জন আলোকচিত্রী। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা, দৃকপাঠ ভবন ও জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সব মিলিয়ে ৯টি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। এবারের ছবি মেলার বিশেষ আকর্ষণ 'আমানুল হক : দ্য রোমান্টিক ডকুমেন্টেরিয়ান' শিরোনামের প্রদর্শনী। এতে আমানুলের তোলা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, বাংলার নদী-নারী, প্রকৃতি আর সত্যজিৎ রায়ের নানা ছবি প্রদর্শিত হবে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে প্রদর্শনীটি চলবে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রদর্শনী উন্মুক্ত সবার জন্য।]

 

Related Topics

টপ নিউজ

ইজেল / আলোকচিত্রী / আমানুল হক / সত্যজিৎ রায় / ছবি / ফটোগ্রাফি / ফটোগ্রাফার

Comments

While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.

MOST VIEWED

  • ছবি: টিবিএস
    দেশে ১০-১৫টি ব্যাংকই যথেষ্ট, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক দুটি রেখে বাকিগুলো একীভূত করার পরিকল্পনা রয়েছে: গভর্নর
  • ছবি: সংগৃহীত
    ভারত সফরে না গেলে ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়বে বাংলাদেশ: আইসিসি
  • ছবি: রয়টার্স
    মাখোঁসহ অন্য ইউরোপীয় নেতাদের ব্যক্তিগত মেসেজের স্ক্রিনশট ফাঁস করলেন ট্রাম্প, কী আছে তাতে
  • ছবি: সংগৃহীত
    ২৯তম বিসিএসে জালিয়াতি: ৩ উপসচিব ও এক এসপিসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন
  • ছবি: সংগৃহীত
    কাল তিন নেতার মাজার ও ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের মাধ্যমে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করবে এনসিপি
  • প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন পেশ করছেন নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রধান জাকির আহমেদ খান। ছবি: প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং
    সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সর্বনিম্ন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১,৬০,০০০ টাকা

Related News

  • শরীরের ভেতরে সময়, শরীরের ভেতরে ঘড়ি! 
  • মাদুরোর ট্র্যাকস্যুট আর হাতকড়া পরা ‘ঝাপসা’ ছবি যেভাবে সাড়া ফেললো
  • বাংলার আকাশে মার্কিন শকুন
  • হাউজ দ্যাট, আম্পায়ার?
  • ছবিতে খালেদা জিয়ার অন্তিম যাত্রা

Most Read

1
ছবি: টিবিএস
বাংলাদেশ

দেশে ১০-১৫টি ব্যাংকই যথেষ্ট, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক দুটি রেখে বাকিগুলো একীভূত করার পরিকল্পনা রয়েছে: গভর্নর

2
ছবি: সংগৃহীত
খেলা

ভারত সফরে না গেলে ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়বে বাংলাদেশ: আইসিসি

3
ছবি: রয়টার্স
আন্তর্জাতিক

মাখোঁসহ অন্য ইউরোপীয় নেতাদের ব্যক্তিগত মেসেজের স্ক্রিনশট ফাঁস করলেন ট্রাম্প, কী আছে তাতে

4
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ

২৯তম বিসিএসে জালিয়াতি: ৩ উপসচিব ও এক এসপিসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন

5
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ

কাল তিন নেতার মাজার ও ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের মাধ্যমে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করবে এনসিপি

6
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন পেশ করছেন নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রধান জাকির আহমেদ খান। ছবি: প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং
বাংলাদেশ

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সর্বনিম্ন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১,৬০,০০০ টাকা

EMAIL US
contact@tbsnews.net
FOLLOW US
WHATSAPP
+880 1847416158
The Business Standard
  • About Us
  • Contact us
  • Sitemap
  • Privacy Policy
  • Comment Policy
Copyright © 2026
The Business Standard All rights reserved
Technical Partner: RSI Lab

Contact Us

The Business Standard

Main Office -4/A, Eskaton Garden, Dhaka- 1000

Phone: +8801847 416158 - 59

Send Opinion articles to - oped.tbs@gmail.com

For advertisement- sales@tbsnews.net