মার্কিন অভিজাত সমাজের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রোয়াল্ড ডালের গুপ্তচর জীবন
মার্কিন অভিজাত সমাজের আড্ডায় হঠাৎ করেই প্রবেশ করেন তিনি। সহজসরল ব্যক্তিত্ব, নজরকাড়া চেহারা আর যুদ্ধফেরত দুঃসাহসিক অভিযানের চমকপ্রদ গল্প–সব মিলিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই শহরের প্রতিটি আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন এক সুদর্শন ব্রিটিশ কর্মকর্তা। শহরের নারী মহলে তার জনপ্রিয়তাও ছিল রীতিমতো ঈর্ষণীয়।
কিন্তু সেই অভিজাত সমাজের হোমরাচোমরা ব্যক্তিরা তখনো টেরই পাননি–যার সরল ব্যক্তিত্বে এত মুগ্ধ তারা, তিনি মোটেও কোনো সাধারণ ব্রিটিশ কর্মকর্তা নন। তার আসল পরিচয় রোয়াল্ড ডাল; আড়ালে কাজ করছিলেন একজন গুপ্তচর হিসেবে!
১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সে (আরএএফ) যোগ দেন রোয়াল্ড। বাগদাদের পশ্চিমে আরএএফ হাব্বানিয়ায় ছয় মাসের কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৪০ সালের আগস্টে তিনি পাইলট অফিসার হিসেবে কমিশন পান। তখনই ঘোষণা করা হয়, ডাল এখন শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
এরপর মিসরে অবস্থানরত আরএএফের ৮০ নম্বর স্কোয়াড্রনে যোগ দেন তিনি। হাতে তুলে দেওয়া হয় গ্লস্টার গ্ল্যাডিয়েটর নামের এক যুদ্ধবিমান; যা সে সময় পুরোনো মডেলের হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আরএএফের ব্যবহৃত শেষ বাইপ্লেন হিসেবে পরিচিতি পায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, গ্ল্যাডিয়েটর চালানো বা আকাশযুদ্ধের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণই পাননি ডাল। এতে যতটা না তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন, তেমনি ভয়ও পেয়েছিলেন।
তবে কোনো উপায়ও ছিল না। ১৯৪০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি বেরিয়ে পড়েন তার প্রথম মিশনে। মিসরের আবু সুয়ের ঘাঁটি থেকে যাত্রা শুরু করেন মার্সা মাতরুহের ৩০ মাইল দক্ষিণে, স্কোয়াড্রনের অগ্রবর্তী বিমানঘাঁটির উদ্দেশে।
দুর্ভাগ্যবশত ধারণা করা হয়, ভুল নির্দেশনার কারণে ডাল পথ হারান মরুভূমির গভীরে। জ্বালানি ফুরিয়ে আসতে থাকায় তিনি মরিয়া হয়ে গ্ল্যাডিয়েটর বিমানটি নামানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যর্থ হন। মুহূর্তেই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে ভেঙে পড়ে।
এই দুর্ঘটনায় তার নাক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মাথার খুলিতে ফ্র্যাকচার হয়। সাময়িকভাবে দৃষ্টিশক্তিও হারান তিনি। তবে এত গুরুতর আঘাত সত্ত্বেও তিনি জ্বলন্ত গ্ল্যাডিয়েটরের ধ্বংসাবশেষ থেকে নিজেকে টেনে বের করে কোনোমতে নিরাপদ স্থানে হামাগুড়ি দিয়ে চলে যেতে সক্ষম হন। পরে একটি অনুসন্ধান দল তাকে অচেতন অবস্থায় খুঁজে পায়।
তারপর আলেকজান্দ্রিয়ার সামরিক হাসপাতালে শুরু হয় তার দীর্ঘ চিকিৎসা। টানা পাঁচ মাস ধরে চলে নাকে প্লাস্টিক সার্জারি, ধীরে ধীরে ফিরে আসে দৃষ্টিশক্তিও। সে যাত্রায় একেবারেই অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন রোয়াল্ড ডাল।
১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে আবার কর্মক্ষম ঘোষণা করা হয়। ফিরে যান নিজের স্কোয়াড্রনে–-তখন তারা ব্যস্ত গ্রিক অভিযানে। এবার হাতে হকার হারিকেন ফাইটার প্লেন নিয়ে সামনের সারির বিমানযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। বিশেষ করে এথেন্সের যুদ্ধে তার ভূমিকা ছিল দারুণ গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু ফাইটার পাইলট হিসেবে তার সেই অভিযাত্রা খুব বেশি দিন টেকেনি। পুরোনো আঘাত আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। শুরু হয় অসহনীয় মাথাব্যথা, আকাশে উড়ন্ত অবস্থায়ও হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন তিনি। শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও ১৯৪১ সালের জুনে তাকে ফেরত পাঠানো হয় ব্রিটেনে।
দেশে ফিরে এসে নিস্তেজ ও একঘেয়ে জীবন ডালকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। তবে নতুন করে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার পর এক আকস্মিক সাক্ষাৎ তার জীবনের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়। বিমানবাহিনীর আন্ডার-সেক্রেটারি অব স্টেট মেজর হ্যারল্ড বালফোর ডালের অমায়িক ব্যবহার আর কথোপকথনের দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে তাকে ওয়াশিংটন ডিসিতে ব্রিটিশ দূতাবাসে বিমানবাহিনী-সংক্রান্ত সহকারী কর্মকর্তা (assistant air attaché) হিসেবে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। প্রথমে আগ্রহী না হলেও শেষ পর্যন্ত বালফোরের জোরাজুরিতে রাজি হন ডাল। শিগগিরই তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে।
আমেরিকায় পৌঁছে ডাল যেন অন্য এক জগতে এসে পড়েন। যুদ্ধবিধ্বস্ত ব্রিটেনের দারিদ্র্য আর সংকীর্ণতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাচুর্যময় জীবন ছিল একেবারে বিপরীত। ওয়াশিংটনে প্রথম কয়েক সপ্তাহে তিনি চোখের সামনে দেখলেন, মানুষজন সেখানে কতটা স্বাস্থ্যবান, কতটা সুখী। রেশনিং-বিধ্বস্ত ব্রিটেনে যে খাবারের অভাবে তিনি টিকে থাকতে শিখেছিলেন, আমেরিকায় এসে দেখেন, সেই খাবারই চারপাশে অফুরন্ত!
তবে দূতাবাসের কাজ দ্রুতই তাকে বিরক্ত করে তুলল। মূল দায়িত্ব ছিল আমেরিকান শ্রোতাদের সামনে ব্রিটিশপন্থী বক্তৃতা দেওয়া। অথচ যাদের উদ্দেশে বলতেন, তাদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে জড়ানো নিয়ে অনাগ্রহী, এমনকি ব্রিটেন বিরুদ্ধ মনোভাবাপন্ন। এই অভিজ্ঞতা তাকে ভীষণ ক্লান্ত করত, এমনকি বিতৃষ্ণাও জাগাত। আকাশে শত্রুর বোমারু বিমান ভূপাতিত করার উত্তেজনার সঙ্গে তুলনা করলে এই কাজ ছিল নিছক একঘেয়ে।
ডালের জীবনে এক নাটকীয় মোড় আসে, যখন তিনি জনপ্রিয় 'হর্নব্লোয়ার' উপন্যাসের লেখক সি এস ফোরস্টারের সঙ্গে পরিচিত হন। ফোরস্টার সে সময় ব্রিটিশ তথ্য মন্ত্রণালয়ের হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশপন্থী প্রচার চালাচ্ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ডালের যুদ্ধকালীন বীরত্বের গল্পগুলো জনপ্রিয় আমেরিকান ম্যাগাজিন 'দ্য স্যাটারডে ইভনিং পোস্ট'-এর পাঠকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় এবং ব্রিটিশপন্থী লেখা হিসেবে উপস্থাপন করা যেতে পারে।
ফোরস্টার ডালের অফিসে এসে তাকে গল্প শোনানোর জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু ডাল নিজেই সেই গল্পটি লেখার প্রস্তাব দেন। পরে তার লেখা নিবন্ধ 'শট ডাউন ওভার লিবিয়া' প্রকাশ হতেই চারিদিকে তোলপাড় সৃষ্টি করে। দ্রুতই এই সুদর্শন তরুণ কর্মকর্তা আমেরিকার অভিজাত সমাজের প্রভাবশালী পার্টিগুলোতে আমন্ত্রণ পেতে শুরু করেন। আর এভাবেই তিনি কিংবদন্তি ব্রিটিশ গুপ্তচর উইলিয়াম স্টিফেনসনের নজরে আসেন।
স্টিল, বিমান উৎপাদন এবং নির্মাণশিল্পে তুমুল আগ্রহ ছিল উইলিয়াম স্টিফেনসনের। তিনি ছিলেন একজন কানাডিয়ান কোটিপতি ব্যবসায়ী। ফলে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পখাতে তার অসংখ্য পরিচিতি ছিল। যুদ্ধের আগে জার্মানির গোপন সামরিক ও শিল্পোন্নয়ন সম্পর্কে তথ্য ফাঁস করতে তার পরিচিত ইউরোপীয়রা তার দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন। ১৯৩৬ সালে স্টিফেনসন নাৎসিদের কার্যকলাপ সম্পর্কে গোপন তথ্য উইনস্টন চার্চিলের কাছে পাঠানো শুরু করেন। চার্চিল সেই তথ্য ব্যবহার করে পার্লামেন্টে নেভিল চেম্বারলেইনের তোষণনীতির তীব্র সমালোচনা করেন।
যুদ্ধ শুরু হলে এবং চার্চিল প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, ব্রিটেনের জয় নিশ্চিত করতে একমাত্র পথ হলো যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে যুক্ত করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তখন আমেরিকায় যুদ্ধবিরোধী তীব্র জনমত বিরাজ করছিল, যদিও প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট গোপনে চার্চিলের পাশেই ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রকে ব্রিটিশপন্থী মনোভাবের দিকে নিয়ে আসার দায়িত্ব পান উইলিয়াম স্টিফেনসন, যিনি এই সুযোগ পেয়ে সানন্দে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
নিউইয়র্কের রকফেলার সেন্টারের একটি অফিস থেকে স্টিফেনসন দ্রুত একটি গুপ্তচর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। এই নেটওয়ার্কের মূল কাজ ছিল আমেরিকান জনমতকে ব্রিটেনের পক্ষে প্রভাবিত করা, জার্মানপন্থী প্রচারণাকে নস্যাৎ করা এবং ব্রিটিশবিরোধী ও যুদ্ধবিরোধী যেসব ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ ছিলেন, তাদের যেকোনো উপায়ে হেয় করা। ব্রিটিশ পাসপোর্ট অফিসের ছদ্মবেশে পরিচালিত এই সংস্থার আসল নাম ছিল ব্রিটিশ সিকিউরিটি কো-অর্ডিনেশন (বিএসসি) এবং এটি অত্যন্ত সফল অভিযান ছিল।
স্টিফেনসনের গুপ্তচররা ব্রিটেনের উদ্দেশ্য পূরণে যেকোনো কৌশল অবলম্বন করত। এই ধূর্ত কানাডিয়ান বিএসসির হয়ে কাজ করার জন্য যাদের তালিকাভুক্ত করেছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন জেমস বন্ড উপন্যাসের লেখক ইয়ান ফ্লেমিং, ডেভিড ওগিলভি, নাট্যকার ও গল্পকার নোয়েল কাওয়ার্ড এবং 'গন উইথ দ্য উইন্ড' ছবির অভিনেতা লেসলি হাওয়ার্ড। 'দ্য ইরেগুলারস' নামে পরিচিত এই ব্যক্তিরা গুপ্তচরবৃত্তি ও প্রচারণায় এতটাই কার্যকর ছিলেন যে লোকেমুখে শোনা যায়, লেসলি হাওয়ার্ডের যাত্রীবাহী বিমানটি বিস্কে উপসাগরের ওপর গুলি করে ভূপাতিত করার পেছনের কারণ–নাৎসিরা উইলিয়ামসন ও চার্চিলের অন্যতম কার্যকর এই প্রচারককে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল।
বিএসসির সম্ভবত সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল দক্ষিণ আমেরিকা দখলের নাৎসি পরিকল্পনার একটি ভুয়া মানচিত্র তৈরি করা। মানচিত্রটি এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট কংগ্রেসে এটি উপস্থাপন করেন। হিটলার যে যুক্তরাষ্ট্রের দোরগোড়ায় তার ট্যাংক নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছেন; এটি তিনি প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেন। এতে হিটলার অবশ্য বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু এই জালিয়াতি বহু আমেরিকান যুদ্ধবিরোধী ও ব্রিটিশবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদীর মন পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইউরোপকে পদানত করা ছিল এক বিষয়, কিন্তু আমেরিকার দক্ষিণ সীমান্তে নাৎসি বাহিনীর উপস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র।
এদিকে লেখক হিসেবে রোয়াল্ড ডালের বাড়তে থাকা জনপ্রিয়তা এবং সামাজিক মহলে তার অবাধ বিচরণ বিএসসি প্রধান উইলিয়াম স্টিফেনসনের নজরে চলে আসা হয় সময়ের ব্যাপারমাত্র। স্টিফেনসন তাকে গুপ্তচরদল 'দি ইরেগুলারস'-এ অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। ১৯৪২ সালে ডালকে অসদাচরণের অভিযোগে দূতাবাস থেকে বরখাস্ত করে ব্রিটেনে ফেরত পাঠানো হলে সেই সুযোগ আসে। স্টিফেনসন তাৎক্ষণিকভাবে ডালকে যুক্তরাষ্ট্রে ডেকে পাঠান, উইং কমান্ডার পদে পদোন্নতি দেন এবং বিএসসির হয়ে কাজ করার দায়িত্ব দেন।
রোয়াল্ডও কিন্তু তাকে হতাশ করেননি। সামাজিক পার্টিগুলোতে সহজেই মিশে গিয়ে, এই মার্জিত ও জনপ্রিয় কর্মকর্তা তার অসাধারণ বাগ্মিতা ব্যবহার করে তাদের মন পরিবর্তন করতে পারতেন, যারা তখনো আশা করছিলেন যে আমেরিকা যুদ্ধ থেকে সরে আসবে। দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের স্ত্রীদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে ডাল ছিলেন বিশেষভাবে দক্ষ। নারীদের মন জয় করার এই ক্ষমতা বিশেষভাবে স্টিফেনসনের নজরে আসে। তাই তিনি পরবর্তী সময়ে ডালকে পাঠান তার গুপ্তচরবৃত্তির জীবনের সম্ভবত সবচেয়ে কুখ্যাত মিশনে।
ভীষণ ব্রিটিশবিরোধী-বিচ্ছিন্নতাবাদী মুদ্রণ ব্যবসায়ী হেনরি লুসের স্ত্রী ছিলেন ক্লেয়ার বুথ লুস। ব্রিটিশদের প্রতি ছিল তার স্পষ্ট ঘৃণা, প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের প্রতি ছিল প্রবল অনাগ্রহ।'টাইম' ও 'লাইফ' ম্যাগাজিনের মাধ্যমে তিনি ব্রিটিশবিরোধী এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী লেখা প্রকাশ করতেন। স্বাভাবিকভাবেই স্টিফেনসনের কাছে তিনি বেশ সহজ লক্ষ্যবস্তু ছিলেন।
ডালকে দায়িত্ব দেওয়া হলো লুসের স্ত্রী ক্লেয়ারকে প্রলুব্ধ করার। এমন তথ্য সংগ্রহ করতে হবে, যা স্টিফেনসন লুসকে ব্ল্যাকমেল করতে অথবা আমেরিকান জনগণের চোখে তাকে এবং তার ম্যাগাজিনকে হেয় প্রতিপন্ন করতে ব্যবহার করতে পারেন।
ক্লেয়ার লুসের একটি জমকালো ওয়াশিংটন সামাজিক পার্টিতে আমন্ত্রণও পেতে ডালের খুব একটা বেশি সময় লাগেনি। সুদর্শন ব্রিটিশ যুদ্ধবীর ডালের প্রতি মুহূর্তেই আকৃষ্ট হন ক্লেয়ার। তবে ক্লেয়ারের তীব্র যৌন আকাক্সক্ষা সম্পর্কে মোটেও অবগত ছিলেন না ডাল। ফোন করে নিজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে ডাল চিৎকার করে বলেন, 'আমি একেবারেই বিধ্বস্ত!' তাকে অন্য কোথাও বদলি করার জন্য তিনি বারবার আকুতি জানাতে থাকেন। অভিযোগ দেন, 'এই মহিলা গত তিন রাত ধরে আমাকে শারীরিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত করে দিয়েছে, আমি আর পারছি না!'
তবে তার সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়। ডালকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, তিনি ব্রিটেনের স্বার্থে এই কাজ করছেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ক্লান্ত ডাল তার মিশন চালিয়ে যান। যুদ্ধের বাকিটা সময় অবশ্য তিনি স্টিফেনসনের নির্দেশে কাজ করেন। এই দুজনের বন্ধুত্ব কয়েক দশক ধরে অটুট ছিল।
আমেরিকার বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবকে যুদ্ধপন্থী দিকের দিকে মোড়ানোর ক্ষেত্রে উইলিয়াম স্টিফেনসন এবং 'দ্য ইরেগুলারস'-এর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুপ্তচরবৃত্তি, ব্ল্যাকমেল এবং নিখুঁত প্রচারণার মাধ্যমে তারা ব্রিটিশবিরোধী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হেয় প্রতিপন্ন করতে, আগের ব্রিটিশবিরোধী অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির মন পরিবর্তন করতে, আমেরিকানদের নিজেদের পক্ষে টানার নাৎসি প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করতে সক্ষম হন। এ ছাড়া কানাডায় 'ক্যাম্প এক্স' স্থাপন করে তারা ব্রিটিশ ও আমেরিকান গুপ্তচরদের নতুন প্রজন্মকে আন্তর্জাতিক গুপ্তচরবৃত্তির সূক্ষ্ম কলাকৌশল শেখাতেন।
যুদ্ধের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সেবায় উইলিয়াম স্টিফেনসনকে নাইটহুড উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ব্রিটিশ গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাসে আজও তিনি অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্মরণীয়। 'দ্য ইরেগুলারস'-এর সহকর্মী ইয়ান ফ্লেমিংয়ের সঙ্গে মিলে তিনি আমেরিকার আধুনিক নিরাপত্তা পরিষেবার ভিত্তি স্থাপনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
আর এদিকে ১৯৪৫ সালে গুপ্তচরবৃত্তির কর্মজীবনের ইতি টানেন রোয়াল্ড ডাল। এরপর শিশুসাহিত্যের জগতে প্রবেশ করে নিজের এক নতুন পরিচয় গড়ে তোলেন। পরে বিশ্বের অন্যতম সেরা ও সফল শিশুসাহিত্যিক হিসেবেও স্বীকৃতি পান। ১৯৯০ সালের ২৩ নভেম্বর, ৭৪ বছর বয়সে ডাল এ পৃথিবীকে বিদায় জানান।
