করোনা বনাম সম্পর্ক
কে বেশি শক্তিশালী? করোনা নাকি সম্পর্ক? এ প্রশ্নের জবাবে বেশিরভাগ মানুষই নির্দ্বিধায় বলবেন, করোনা। কিন্তু আমার সূক্ষ্ম বিবেচনায় আমি বলব, সম্পর্কের বন্ধন বেশি দৃঢ় ও শক্তিশালী হওয়া বাঞ্ছনীয়। সকলের প্রতি আমার পরামর্শ থাকবে, ঘরে-বাইরে, অফিস-আদালতে সবখানেই যেন করোনার ভয়ে আমরা আমাদের ভালোবাসার অটুট বন্ধনকে নষ্ট না করে ফেলি।
মানুষ স্বভাবতই একটু অগ্রাধিকার বা প্রাধান্য পেতে ভালোবাসে। আর সেই সঙ্গে যদি একটু অসুস্থতা থাকে, তাহলে তো বলার অপেক্ষাই রাখে না! সে সময় পরিবারের ও কাছের মানুষগুলোকে আরও বেশি কাছে পেতে ইচ্ছে করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কাছের মানুষের একটু কথা, উপস্থিতি টনিকের মতো কার্যকরী হয়ে ওঠে। করোনাকালে সংস্পর্শে না এসেও আচরণের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব- পাশেই আছি।
করোনার প্রকোপ হু হু করে বেড়েই চলেছে। আগের চেয়ে আরো শক্তিশালী হয়ে ছদ্মবেশে ফিরে এসেছে করোনাভাইরাস। নিজের অজান্তেই বৈরী আচরণের মাধ্যমে আমরা কাছের মানুষগুলোকে দূরে ঠেলে দিচ্ছি না তো? আজ হয়তো আমার বোন করোনা আক্রান্ত, কাল আমি নিজেও হতে পারে। আবার, কোনো পরিবারে হয়তো স্বামীর করোনা হয়েছে, সামনের দিনগুলোতে স্ত্রীও আক্রান্ত হতে পারেন। কিন্তু তাই বলে কি একজন আরেকজনকে দূরে ঠেলে দেব? কখনোই না। আমি বলব, 'দূরত্ব যতই হোক, পাশে আছি'- এ ছোট্ট বাক্যের সাহায্যেও সম্ভব কাছের মানুষের মনোবল ফিরিয়ে আনা।
মানুষের তরে মানুষ
করোনা হলে অবশ্যই আমরা আইসোলেশনে থাকব। কিন্তু তাই বলে করোনা আক্রান্ত কাছের মানুষগুলোর সামনে এমন কোনো আচরণ করা যাবে না, যাতে সে কষ্ট পায়। কারও করোনা হয়েছে শোনামাত্রই আমরা তার কাছ থেকে দূরে ছিটকে যাই। কিন্তু এই আচরণ মোটেই কাম্য নয়। বরং আমরা অন্যভাবে যোগাযোগের মাধ্যমে মানুষকে আপন করে নেওয়ার কিছু ব্যবস্থা নিতে পারি।
এই যেমন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চ্যাটিং করা বা ফোনে কথা বলার মাধ্যমে প্রিয়জনকে মুগ্ধ করা সম্ভব।
করোনাকালে অনেকের মুখে খাবারের স্বাদ চলে যায়। তাই প্রিয়জনের পছন্দের খাবার বানিয়ে তার সামনে হাজির করতে পারেন। এতে তার মন যেমন আনন্দে পরিপূর্ণ হবে, তেমনি খাওয়ার রুচিও হয়তো বাড়তে পারে।
হোম কোয়ারেন্টিনের বন্দী জীবনটাকে রাঙিয়ে তুলতে খুব ছোট ছোট উদ্যোগই যথেষ্ট। দরজায় কড়া নেড়ে একগুচ্ছ ফুল কিংবা ছোট একটা উপহার বা একটা চিরকুটে ভালোবাসাময় কিছু শব্দসম্ভার লিখেও প্রিয়জনকে মুগ্ধ করে দেওয়া সম্ভব।
কাছের মানুষেরা কেউ করোনা আক্রান্ত হলে 'যত্ন নেওয়া' খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সময়মতো ওষুধ খাচ্ছে কি না, তা তো খেয়াল রাখতেই হবে; সেইসঙ্গে আনুষঙ্গিক পথ্যাদিও নিশ্চিত করতে হবে। গরম পানি, মসলা চা, ভিটামিন সি যুক্ত ফলমূল, প্রোটিনযুক্ত খাবার ইত্যাদি কিছুক্ষণ পর পর দেওয়া যেতে পারে। তবে পথ্যাদি যা-ই হোক না কেন, আপনি যে যত্ন রাখছেন, সেটিই রোগীর মানসিক শক্তি অনেকগুণ বাড়িয়ে দেবে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রোগীর পুরনো ছবির অ্যালবামের ছবিগুলোয় লাইক দেওয়া বা মন্তব্য করার মাধ্যমে তার পুরনো দিনের সুন্দর স্মৃতিগুলো তুলে আনতে পারেন। এটি রোগীকে সুন্দর নস্টালজিয়ায় সময় পার করতে সাহায্য করবে এবং তার করোনাজনিত মানসিক চাপ কমবে।
অফিসের সহকর্মী কেউ কোভিড আক্রান্ত হলে সবসময় তার খোঁজ-খবর রাখতে হবে। সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তো বটেই, মাঝে মধ্যে ফোনকলও করতে হবে। আমরা অনেক সময় শুধুমাত্র ভার্চুয়াল জগতটাকেই যথেষ্ট মনে করি। কিন্তু তা ভুল। কাছের মানুষের গলার স্বর দুই মিনিট শুনতে পেলে যে তৃপ্তি আসে, তা হয়তো আধঘণ্টার চ্যাটিংয়েও পাওয়া যায় না কখনো কখনো।
করোনার সময়টাতে একজন আক্রান্ত ব্যক্তিকে উদ্দীপনামূলক ও ইতিবাচক কথার মধ্য দিয়ে তার মধ্যে বেঁচে থাকার তীব্র আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে হবে, যেন এই তীব্র ইচ্ছার কাছে কোভিড হার মানে।
করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় তরঙ্গ
সারা বিশ্বের মানুষ যখন করোনার ভয়াল থাবা থেকে একটু একটু করে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করছে, তখনই করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় তরঙ্গ আঘাত হানল এবং বুঝিয়ে দিল, এখনই এর শেষ নয়। প্রথমবারের চেয়েও বেশি শক্তিশালী রূপ নিয়ে এই ভাইরাস প্রবেশ করছে মানবদেহে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এখন কোনো উপসর্গ ছাড়াই মানবদেহে প্রকট হয়ে উঠছে এই ভাইরাস।
কোভিডের দ্বিতীয় তরঙ্গ চলাকালীন এ সময়টাতে কর্মস্থলে এবং সামাজিকভাবে- সব জায়গায়ই মানুষের পদচারণা একেবারেই সীমিত করতে হবে। রাস্তাঘাট, পার্ক, ক্লাব বা শিশুদের খেলার মাঠে জনসাধারণের অবাধ বিচরণ এখন মোটেও ঠিক নয়। মাস্ক পরিধান করা তো অত্যাবশ্যক বটেই, কিছুক্ষণ পরপর সাবান দিয়ে হাত ধুতে অথবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে।
করোনা থেকে বাঁচতে হলে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে, তা হয়তো এরই মধ্যে অনেকেই জানেন। করোনার কাছে নয়, পরাজয়ের ভয়টা ওই এক জায়গায়। বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই কী বলতে চাইছি? করোনাকালে কাছের মানুষগুলোকে সহানুভূতি দেওয়ার বদলে এড়িয়ে গেলে জীবন হয়ে উঠবে আরও সংকটময়। তারচেয়ে বরং আমরা সেই চেষ্টা চালিয়ে যাই যে, করোনা পার হয়ে গেলে প্রিয়জন যেন কিছু ভীতিকর ও দুঃস্বপ্নের রাতের স্মৃতি না নিয়ে বরং হাসিমুখের এবং মধুর স্মৃতি নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারে।
প্রিয়জনের প্রিয় সংস্পর্শ যেন সবভাবেই তার মনে লেগে থাকে, সেইটিই আমাদের কামনা।
-
লেখক: মানবসম্পদ প্রধান, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড
