দাম বাড়ানোর পরেও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে চিনি
সম্প্রতি দর বাড়ানো পরেও দেশের খুচরা বাজারে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে নিত্যপণ্য চিনি।
বৃহস্পতিবার (১১ মে) কেজিতে ১৬ টাকা বাড়িয়ে খোলা চিনি ১২০ টাকা ও প্যাকেটজাত চিনির দাম ১২৫ টাকায় নির্ধারণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
তবে শুক্রবার (১২ মে) পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাজারে নির্ধারণ করে দেওয়া দামের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি দরে চিনি বিক্রি করেছেন ব্যবসায়ীরা।
সরকারি বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা টিসিবির (ট্রেডিং কর্পোরেশন অফ বাংলাদেশ) হিসাবে শুক্রবার ১৩০-১৪০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়েছে প্যাকেটজাত ও খোলা চিনি। এটি গত এক বছরের তুলনায় ৬৮ শতাংশ বেশি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন দাম নির্ধারণের পর প্যাকেটজাত চিনি চাহিদার তুলনায় খুব কম এসেছে। অন্যদিকে, খোলা চিনিও আড়ৎ থেকে বেশি দামে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। তাই তারা আড়ৎ থেকে চিনি কিনছেন না।
কারওয়ান বাজারের ইয়াসিন জেনারেল স্টোরের বিক্রেতা আলী হোসাইন বলেন, "ঈদের আগে আমরা চিনির অর্ডার দিয়েছিলাম। কোম্পানি আজ ৪০ কেজির মতো প্যাকেট চিনি দিয়েছে। এই চিনি আমাদের প্রতিকেজি কেনা ১২৪ টাকায়। বিক্রি করছি ১২৫ টাকায়।"
কারওয়ান বাজারের ইউসুফ স্টোরের বিক্রেতা মোহম্মদ সুজন বলেন, "চিনির সরবরাহ এখনও স্বাভাবিক হয়নি। যে কোম্পানিগুলো চিনি দেয়, তারা মাত্র সরবরাহ শুরু করেছে।"
যা বলছেন আমদানিকারকরা
চিনি আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা জানান, ২৫ শতাংশ আরোপিত নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (আরডি), ১৫ শতাংশ ভ্যাট, পরিবহন ও পরিশোধন খরচ যোগ করে প্রতিকেজি চিনির মোট খরচ পড়ে ৯০ টাকা। সেই হিসেবে, খুচরা বাজারে প্রতিকেজি চিনি বিক্রি হওয়ার কথা সর্বোচ্চ ১০০ টাকায়।
কিন্তু রমজানের শেষ সময় হতে বাজারে প্রতিকেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা দরে। যদিও এতদিন সরকার নির্ধারিত পরিশোধিত খোলা চিনির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ছিল ১০৪ টাকা।
বিল অব এন্ট্রির তথ্যমতে, এসব চিনি আমদানির ব্যয় পরিশোধ করা হয়েছে ডলার প্রতি ১০৬ থেকে ১০৭ টাকার মধ্যে। সেই হিসেবে, প্রতিকেজি চিনির বুকিং দর সর্বোচ্চ ৫৭ টাকা। ২৫ শতাংশ আরোপিত নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (আরডি) ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট হিসেবে প্রতিকেজি চিনি আমদানিতে সরকারকে দিতে হয় ২২ টাকা। পাশাপাশি পরিবহন ও পরিশোধন খরচ পড়ে কেজিতে ৭ টাকা। অর্থাৎ, বর্তমানে বাজারে থাকা প্রতিকেজি চিনি কারখানা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৮৬ টাকা।
খাতুনগঞ্জের পাইকারি চিনি ব্যবসায়ী মের্সাস আর এম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী আলমগীর পারভেজ বলেন, আন্তর্জাতিক বুকিং দর অনুযায়ী পাইকরি পর্যায়ে প্রতিকেজি চিনি ৯৫ টাকা এবং খুচরায় সর্বোচ্চ ১০০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসেন বলেন, "আন্তর্জাতিক বাজারের চিনির বর্তমান বুকিং দর এবং দেশিয় বাজারের বিক্রয় মূল্যে যথেষ্ট ফারাক রয়েছে। এ বিষয় সরকারের মনিটরিং প্রয়োজন।"
গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে সরকার বাজারে চিনির দাম নির্ধারণ করে দিতে শুরু করে। এরমধ্যে পাঁচ দফায় চিনির দাম বেঁধে দেওয়া হলেও একবারও চিনির সরকারি মূল্য কার্যকর হয়নি।
গত ৬ এপ্রিল সরকার ঘোষিত পরিশোধিত খোলা চিনির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ছিল কেজিতে ১০৪ টাকা; আর পরিশোধিত প্যাকেটজাত চিনির দাম নির্ধারিত হয়েছিল প্রতিকেজি ১০৯ টাকা।
১১ মে সেটি বাড়িয়ে খোলা চিনি ১২০ টাকা এবং প্যাকেটজাত চিনির দাম নির্ধারণ করা হয় ১২৫ টাকায়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে চিনির বার্ষিক চাহিদা ১৮-২০ লাখ টন, এর বিপরীতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয় মাত্র ৩০ হাজার টন।
বৈশ্বিক পরিস্থিতি
৩৫ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতির সম্মুখীন পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে চিনির দাম বেশি।
গ্লোবাল প্রোডাক্ট প্রাইস ওয়েবসাইট অনুসারে, চিনির দাম সূচকে ৮১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬২তম। অর্থাৎ, বিশ্বের ৬১টি দেশে চিনির দাম বাংলাদেশের চেয়ে বেশি।
মার্কিন ডলারের হিসাবে বাংলাদেশে প্রতিকেজি চিনির দাম ১.০৪ ডলার, শ্রীলঙ্কায় ০.৮৫, ভারতে ০.৫৫, থাইল্যান্ডে ০.৬৫ এবং পাকিস্তানে ০.৩৯ ডলার।
তালিকায় গড়ে সর্বোচ্চ মূল্য হংকংয়ে ১.৪৩ ডলার এবং সর্বনিম্ন মূল্য তুরস্কে ০.২৬ ডলার।
