‘ইরানি ফাঁদ’: স্থল সেনা মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে, বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বর্তমানে তাদের ওয়েবসাইটে ইরানে পরিচালিত সামরিক অভিযানের একটি খতিয়ান নিয়মিত প্রকাশ করছে। সেখানে কতগুলো হামলা চালানো হয়েছে, কী ধরনের সমরাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং লক্ষ্যবস্তুগুলো ঠিক কোন ধরনের—কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম থেকে শুরু করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্র—তার একটি তালিকা দেওয়া হচ্ছে।
তবে এই তালিকার আড়ালে রয়ে গেছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সুনির্দিষ্ট কোন কোন স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছে, কী ধরনের গোলাবারুদ ব্যবহৃত হয়েছে কিংবা অভিযানের কার্যকারিতা যাচাইয়ে যেটিকে সামরিক পরিভাষায় 'ব্যাটল ড্যামেজ অ্যাসেসমেন্ট' (বিডিএ) বলা হয়, তার কোনো বিস্তারিত বিবরণ সেখানে নেই।
মার্কিন সামরিক বাহিনী যে রণক্ষেত্রের সব তথ্য বা উপগ্রহ চিত্র জনসমক্ষে প্রকাশ করবে না, তা অনেকটা নিশ্চিত। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্যের এই অস্পষ্টতার পেছনে অন্য একটি কারণও থাকতে পারে। আর তা হলো—কেবল আকাশপথে বোমাবর্ষণ করে একটি নির্দিষ্ট সীমার বেশি সফলতা অর্জন করা অসম্ভব।
ওয়াশিংটনভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো এবং আকাশযুদ্ধ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. কেলি গ্রিকো ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজকে বলেন, 'সেন্টকমের লক্ষ্যবস্তুর তালিকাটিই আকাশপথের সীমাবদ্ধতাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। আর এই সীমাবদ্ধতার কারণেই বারবার 'ব্যাটলগ্রাউন্ডে' পদাতিক সেনা বা 'বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড'-এর প্রসঙ্গটি সামনে আসছে।'
যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের সাথে আলোচনার সম্ভাবনা এবং ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা স্থগিত রাখার কথা বলছেন; কিন্তু বাস্তবতা হলো, মার্কিন পদাতিক সেনারা ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছেন। গ্রিকো আরও যোগ করেন, 'একটি নয়, বরং দুটি 'মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিট' (প্রায় ৫,০০০ সেনা) মোতায়েনের বিষয়টি কোনো অস্পষ্টতা রাখে না।'
গত বুধবার নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে জানায়, পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে আরও প্রায় ২,০০০ প্যারাট্রুপার মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছে। এরা মূলত একটি 'ইমিডিয়েট রেসপন্স ফোর্স'-এর অংশ, যারা নির্দেশ পাওয়ার মাত্র ১৮ ঘণ্টার মধ্যে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে পৌঁছাতে সক্ষম। সব মিলিয়ে বর্তমানে ইরানকেন্দ্রিক এই অভিযানে প্রায় ৫০,০০০ মার্কিন সেনা নিযুক্ত রয়েছে।
তবে ইরানে মার্কিন পদাতিক বাহিনীর লক্ষ্য কী হবে, সেই প্রশ্নের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে অন্য একটি উদ্বেগ। বিশেষজ্ঞরা একে 'ইরানি ফাঁদ' হিসেবে অভিহিত করছেন। সেই সঙ্গে এমন অভিযানে মার্কিন জনগণের প্রবল অনীহাও প্রশাসনের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক 'কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফট'-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো উইলিয়াম হার্টুং বলেন, 'ইরানে যদি পদাতিক বাহিনী নামানো হয়, তবে ইরাক যুদ্ধকে তখন মনে হবে 'পার্কে হাঁটাহাঁটির' মতো সহজ কাজ।' ড. গ্রিকো মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি স্থল যুদ্ধের প্রতি মার্কিন জনমতের, এমনকি ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকদেরও কোনো আগ্রহ নেই।
তিনি বলেন, 'বিগত দুই দশক ধরে ইরাক ও আফগানিস্তানে প্রাণহানি, বিপুল অর্থ ব্যয় এবং কৌশলগত বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর তিক্ত অভিজ্ঞতা মার্কিনিদের হয়েছে। ট্রাম্প নিজেও তো যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলেই ক্ষমতায় এসেছিলেন।'
বিশ্লেষকরা ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের দুটি লক্ষ্যের কথা বলছেন, যেগুলোর প্রত্যেকটিই চরম ঝুঁকিপূর্ণ। প্রথমটি হতে পারে ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র 'খারগ দ্বীপ' দখল করা। গ্রিকোর মতে, ইরান কয়েক দশক ধরে এমন পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুতি নিয়েছে। ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে সেখানে মার্কিন নৌবাহিনী ও জাহাজগুলো ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। এমনকি দ্বীপটি দখল করা গেলেও ইরান তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো স্থলভাগের আরও গভীরে, বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলে সরিয়ে নিয়ে শত শত মাইল উপকূলরেখা বরাবর পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলবে।
দ্বিতীয় সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা বা তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কব্জা করা। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সাম্প্রতিক লড়াইয়ে পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হেনেছে, তবে গ্রিকো সতর্ক করে বলেন, 'এ ধরনের আকাশ হামলা স্থাপনাগুলোকে সাময়িকভাবে অচল করতে পারে, কিন্তু তা পুরোপুরি ধ্বংস করার বা পুনর্নির্মাণ ঠেকানোর নিশ্চয়তা দেয় না।' আর এখান থেকেই স্থল অভিযানের পক্ষে একটি কাঠামোগত যুক্তি তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের খরচ এবং প্রাণহানি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের আকাশশক্তির আধিপত্য সত্ত্বেও ইরান কেন টিকে থাকছে? ড. গ্রিকোর মতে, তেহরান কখনোই আকাশপথে আমেরিকা বা ইসরায়েলের সাথে সমানে সমান লড়াইয়ের কথা ভাবেনি; তাদের কৌশল হলো 'অপ্রতিসম যুদ্ধ' তথা ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে ফেলা।
ইরানকে সামরিকভাবে জিততে হবে না, তাদের কেবল টিকে থাকতে হবে এবং আক্রমণ চালিয়ে যেতে হবে। হামলাকারীর জন্য চ্যালেঞ্জ হলো সব মোবাইল লঞ্চ সিস্টেম খুঁজে বের করা, আর রক্ষণকারীর সুবিধা হলো মাত্র কয়েকটি লুকিয়ে রাখা।
এই যুদ্ধের আর্থিক খরচও আমেরিকার পক্ষে নেই। হার্টুং বলেন, 'যেখানে ইরানের একটি ড্রোনের দাম মাত্র কয়েক হাজার ডলার, সেখানে তা ধ্বংস করতে ব্যবহৃত মার্কিন ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার। এ পর্যন্ত অভিযানের অর্ধেক খরচই গেছে এই গোলাবারুদ ও ইন্টারসেপ্টরের পেছনে।'
ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে ড. গ্রিকো ও তার সহকর্মী ম্যাক্সিমিলিয়ান 'হাইব্রিড এয়ার ডিনায়াল' নামক একটি ধারণার অবতারণা করেছেন। এর অর্থ আকাশসীমা পুরোপুরি দখল করা নয়, বরং একে প্রতিপক্ষের জন্য এতটাই ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা যেন তারা মুক্তভাবে কাজ করতে না পারে। সস্তা ও সহজলভ্য ড্রোনের মাধ্যমে বিমানবন্দর অচল করে দেওয়া, শিপিং রুট ব্যাহত করা কিংবা বেসামরিক জনজীবনকে অস্থির করে তোলার মাধ্যমে সরকারের সক্ষমতার ওপর জনগণের আস্থা কমিয়ে দেওয়া—এটাই ইরানের রণকৌশল।
পেন্টাগনের তথ্য গোপন রাখা এবং ট্রাম্পের রণকৌশল নিয়েও সমালোচনা করেছেন হার্টুং। তিনি বলেন, 'ট্রাম্প ভেবেছিলেন এটা ভেনেজুয়েলার মতো 'সহজ' হবে, কিন্তু এর বদলে তিনি একটি অঞ্চলব্যাপী যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছেন।' গ্রিকো আরও একটি বিপদের কথা উল্লেখ করেছেন: মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীরা (যেমন রাশিয়া বা চীন) গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ইরান কীভাবে মার্কিন প্রযুক্তির মোকাবিলা করছে।
সবশেষে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েই যায়—এই যুদ্ধ শেষ হলে মধ্যপ্রাচ্যের চিত্রটা ঠিক কেমন হবে? গ্রিকোর মতে, 'একটি দুর্বল ইরান মানেই যে সে অনুগত হবে, তা নয়। বরং এমন অভিযানের পর টিকে থাকা কোনো শাসক গোষ্ঠী আরও বেশি কট্টরপন্থি হয়ে উঠতে পারে এবং নিজেদের নিরাপত্তার গ্যারান্টি হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্র পাওয়ার জন্য আরও মরিয়া হতে পারে।'
আব্রাহাম অ্যাকর্ডস, ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা সম্পর্ক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর স্বার্থ নিয়ে যখন শক্তিশালী আলোচনার প্রয়োজন ছিল, তখন কেবল রাজনৈতিক ফায়দা এবং 'তাৎক্ষণিক বিজয়' খোঁজার নেশায় যুক্তরাষ্ট্র কোনো সুদূরপ্রসারী কৌশল ছাড়াই যুদ্ধের চোরাবালিতে পা বাড়াচ্ছে। গ্রিকোর ভাষায়—যুদ্ধোত্তর শৃঙ্খলা নিয়ে কোনো প্রকাশ্য আলোচনা না থাকাটাই বর্তমান প্রশাসনের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ব্যর্থতা।
