ইরান যুদ্ধের জেরে খাতুনগঞ্জে বেড়ে গেছে নিত্যপণ্যের দাম
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের বৃহত্তম পাইকারি ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জে দামের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা ইরান যুদ্ধের কথা উল্লেখ করলেও তথ্য বলছে, চাহিদার চেয়ে মজুত বেশি রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা ও জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কায় নিত্যপণ্যের মূল্য বেরড়েছে। তবে বাজার-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, যুদ্ধ পরিস্থিতিকে পুঁজি করে কিছু ব্যবসায়ী আগের কেনা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
পাশাপাশি অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ পণ্য মজুত রেখে বিক্রি কমিয়ে দিচ্ছেন, যা বাজারে কৃত্রিম চাপ তৈরি করছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি বিকাল পর্যন্ত খোলা পরিশোধিত পাম অয়েলের মণপ্রতি (৩৭.৩২ কেজি) দাম ছিল ৫ হাজার ৯০০ টাকা। ইরানে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সন্ধ্যার দিকে দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার টাকা। পরদিন কিছুটা কমলেও আবার বেড়ে বর্তমানে ৬ হাজার থেকে ৬ হাজার ২০ টাকার মধ্যে লেনদেন হচ্ছে।
একইভাবে প্রতি মণ গমের দাম বেড়ে ১ হাজার ৩০০ টাকায় পৌঁছেছে, যা আগে প্রায় ১৫০ টাকা কম ছিল। এছাড়া খোলা সয়াবিন তেলের মণপ্রতি দাম ১২০ টাকা বেড়ে ৭ হাজার ১৮০ টাকায় উঠেছে। চিনির দামও মণপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ টাকা বেড়ে ৩ হাজার ৪৭০ থেকে ৩ হাজার ৪৮০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে।
বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হওয়া ডাল ও শুকনো খাদ্যপণ্যের দামও একইভাবে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। যদিও রমজান শুরুর পর পাইকারি বাজারে এসব পণ্যের দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছিল।
একাধিক ব্যবসায়ী জানান, রমজানের মাঝামাঝি সময়ে সাধারণত বাজারে বেচাকেনা কমে যায়। এখন মূলত ঈদকে সামনে রেখে শুকনো খাদ্য ও মিষ্টিজাতীয় পণ্যের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ভবিষ্যতে দাম বাড়তে পারে, এই আশঙ্কায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ভোগ্যপণ্যের আমদানিকারক মো. মহিউদ্দিন টিবিএসকে বলেন, কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়েছে। তবে অধিকাংশ পণ্যের দাম এখনো স্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়তে পারে; তখন সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
ভোক্তা অধিকারকর্মীরা বলছেন, যুদ্ধকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছেন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অভ বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর জন্য একটা ইস্যু খোঁজেন। যুদ্ধের কারণে একটা ইস্যু পাওয়া গেল। যুদ্ধের কারণে এত দ্রুত প্রভাব পড়ার প্রশ্নই আসে না। জ্বালানি তেল সংকট হলে তখন পরিবহন খরচ মিলিয়ে একটা প্রভাব পড়তে পারে; তবে তা এখন নয়।
তিনি আরও বলেন, 'প্রশাসনও এই বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। সরকারকে এই বিষয়ে আরও কঠোর হতে হবে।'
চট্টগ্রাম কাস্টমসের আমদানির তথ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চাহিদার হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুত চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি রয়েছে।
কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, বার্ষিক ২ লাখ ৩০ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৩ লাখ টন ছোলা আমদানি হয়েছে। চাহিদার চেয়েও বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত পণ্য থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধের অজুহাতে দাম বাড়ানো হচ্ছে।
একইভাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ১০ লাখ ৩৮ হাজার টন পাম অয়েল ও ৪ লাখ ৬৩ হাজার টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, রমজানে সয়াবিন তেলের চাহিদা ৩ লাখ টন। একই সময়ে ২ লাখ ৬৯ হাজার টন পরিশোধিত চিনি ও ১ লাখ ৭ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি খালাস হয়েছে। যেখানে রমজানে চিনির চাহিদা ৩ লাখ টন।
পর্যাপ্ত আমদানি ও উদ্বৃত্ত মজুদ থাকার পরও বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়াকে উদ্বেগজনক ও অযৌক্তিক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
