সুনামগঞ্জে ভেসে গেছে ২১ কোটি টাকার মাছ, কুড়িগ্রামে কমেছে বন্যা

সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতিতির উন্নতি হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় সুরমার পানি বিপদসীমার মাত্র ছয় সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সার্বিক দিক দিয়ে সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে চলমান বন্যায় জেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন মৎস্যচাষীরা।
মৎস্য অফিস বলছে, জেলার দুই হাজার ৮৪৬টি পুকুরের প্রায় ২১ কোটি ৪৫ লাখ টাকার মাছ ও রেনু পোনা পানিতে ভেসে গেছে।
এদিকে, উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী ও গাইবান্ধায় নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও কুড়িগ্রামে কমেছে ধরলা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতে অতিবৃষ্টির কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। তবে কুড়িগ্রামে এই মুহূর্তে পানি কমলেও আগামী সপ্তাহে ভারতে আবারও অতিবৃষ্টির শঙ্কা রয়েছে। তখন দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি আবারও বাড়তে পারে।
তবে নেত্রকোনার কলমাকান্দায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে সদর উপজেলার একটি ইউনিয়ন নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। গবাদিপশু নিয়েও চরম বিপাকে পড়েছেন বন্যার্তরা। বেশকিছু গ্রামীণ সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। প্রতিনিধি ও সংবাদদাতার পাঠানো খবর-
সুনামগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মৎস্য খামারিরা
সুনামগঞ্জে বন্যায় সবেচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মৎস্য খামারিরা। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার, ছাতক, ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ বিশ্বম্ভরপুরের মৎস্য খামারিরা এখন পথে বসার অবস্থায় রয়েছেন।
গত ২৫ জুন থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত সুনামগঞ্জে টানা বর্ষণ অব্যাহত ছিল। বর্ষণে সুনামগঞ্জ জেলা শহরের সকল পাড়া মহল্লায় পানি প্রবেশ করে। এতে হাজার ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়। তবে বর্তমানে পানি কমেছে। ১২৭টি আশ্রয় কেন্দ্রে যারা আশ্রয় নিয়েছিলেন তারা সবাই ঘরে ফিরে গেছেন। ঢলের এই পানি দিরাই-শাল্লাসহ নিন্মাঞ্চলে গিয়ে চাপ তৈরি করছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে বন্যায় সুনামগঞ্জের দুই হাজার ৮৪৬টি পুকুরের প্রায় ২১ কোটি ৪৫ লাখ টাকার মাছ ও রেনু পোনা ভেসে গেছে। নষ্ট হয়েছে পুকুরের অবকাঠামো। খামার ডুবে যাওয়ায় পথে বসার মতো অবস্থা হয়েছে ব্যবসায়ীদের। তারা প্রণোদনা দাবি করেছেন।
সুনামগঞ্জ শহরের মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দরিয়াবাজ গ্রামের খামারি জুনেদ আহমদ বলেন, আমার পুকুরের প্রায় ১০ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। দুই বছর আগেও একবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলাম। এখন পথে বসার মতো অবস্থা হয়েছে।
''অন্যান্য ব্যবসায়ীরও আমার মতো অবস্থা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আমাদের সদর উপজেলায়। আমাদেরকে প্রণোদনা না দিলে আর ঘুরে দাড়াতে পারবো না'', যোগ করেন তিনি।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মৎস্যখাতে। পুকুরে যারা মাছ চাষ করেছেন তাদের বেশিরভাগই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত খামারিসহ ক্ষয়-ক্ষতির চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করছি। ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সবিবুর রহমান বলেন, বৃষ্টিপাত কমায় এখন মাত্র ছয় সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে সুরমা। অন্যান্য নদ নদীর পানিও বিপদসীমার নিচে আছে। সার্বিক বিবেচনায় বন্যা পরিস্থিতি এখন উন্নতির পথে।
কুড়িগ্রামে চলতি সপ্তাহে আবারও পানি বাড়ার শঙ্কা
উত্তরাঞ্চলের পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, নীলফামারীর তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে ১৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে বইছে তিস্তার পানি। এ ছাড়া কুড়িগ্রামে ধরলার পানি ১৭ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ৩৯ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি ৯ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ৬০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে বেড়েছে তিস্তার পানি। বৃহস্পতিবার ১০ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ১৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। তিস্তা ব্যারাজের গেজ পাঠক নুরুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
কুড়িগ্রামে ধরলা, দুধকুমার এবং ব্রহ্মপুত্র নদের পানি প্রবাহ এখনও বিপদসীমার উপর থাকায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তীত রয়েছে। নদ-নদীগুলোর পানি কমছে ধীর গতিতে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেকর্ড অনুযায়ী- গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ধরলা ব্রিজ পয়েন্টে ধরলার পানি ১৭ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ৩৯ সেন্টিমিটার উপর এবং নুনখাওয়া পয়েন্টে দুধকুমারের পানি আট সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৫১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া চিলমারী উপজেলার ঘাট পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি ৯ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৬০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, আগামী এক সপ্তাহ দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি এভাবে ধীরে ধীরে কমবে। আগামী ৭-৮ জুলাই ভারতে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তখন নদীগুলোতে পানি আবারও বাড়তে পারে।
এদিকে, গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ঘাঘট নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘন্টায় বৃহস্পতিবার সকাল পযর্ন্ত ব্রহ্মপুত্রের পানি তিস্তামুখ ঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ৩৯ সেন্টিমিটার ও ঘাঘট নদীর পানি নতুন ব্রিজ পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান জানান, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও গাইবান্ধা শহর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বাঁধ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী জ্যোতি প্রসাদ ঘোষ জানান, কিছু কিছু এলাকায় নদীর পানি কমে যাওয়ায় সামান্য ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। ভাঙন কবলিত এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
নতুন করে প্লাবিত নেত্রকোনার আরও একটি ইউনিয়ন
জেলার কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি, খারনৈ ও বড়খাপন ইউনিয়নের অন্তত ৬০টি গ্রাম এখনও পানিবন্দি। অনেকের ঘরের মেঝে পর্যন্ত ডুবে যাওয়ায় রান্নাবান্নার পাশাপাশি বিশুদ্ধ খাবার পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের সংকট দেখা দিয়েছে। গবাদিপশু নিয়েও চরম বিপাকে পড়েছেন বন্যার্তরা। বেশকিছু গ্রামীণ সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয় কৃষিবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় ৫১০ একর আউশ জমি এবং ১৪ একর আমন বীজতলা ডুবে গেছে। কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোহেল রানা জানিয়েছেন, বন্যার্তদের মাঝে এ পর্যন্ত ৪০ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সদর উপজেলার কালিয়ারা-গাবরাগাতি ইউনিয়নে নতুন করে বন্যা দেখা দিয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যান শরীফ আহমেদ খান জানান, পাহাড়ি ঢলের পানিতে নিচু এলাকার হরিদাসপুর, বড়কাঠুরি, কড়ইকান্দি, শৈলনারায়ণ, কালিয়ারা, রাজাপুর ও গাবরাগাতিসহ অন্তত ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এ ইউনিয়নের বাসাটি-নারিয়াপাড়া সড়কটিও ডুবে গেছে।
এছাড়া জনবসতিতে পানি না উঠলেও হাওর জনপদ খালিয়াজুরী উপজেলার ৬৮টি গ্রামই পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সেখানকার যাতায়াত ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নৌকানির্ভর হয়ে গেছে।