মেডিকেল টেকনোলজিস্ট: করোনাকালে অবহেলিত নেপথ্য নায়কেরা
সন্দেহভাজন রোগীর নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করার মাধ্যমে কোভিড রোগী শনাক্ত করেন মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা। গত বছরের মার্চে দেশে করোনাভাইরাসে প্রথম রোগী শনাক্তের আগে থেকে সন্দেহভাজন রোগীদের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করে আসছেন তারা। কোন ধরণের কোয়ারেন্টাইন–আইসোলেশন বা ছুটি ছাড়াই ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন কাজ করছেন টেকনোলজিস্টরা। অথচ প্রথম সারির ফ্রন্ট লাইনার হয়েও অবহেলিত তারা। এখন পর্যন্ত কোন ধরণের প্রণোদনা বা অনুদান পাননি তারা। ঝুঁকি ও বঞ্চনায় বর্তমানে হতাশ হয়ে পরেছেন অনেকেই।
গত বছরের মার্চ মাস থেকে করোনাভাইরাসের নমুনা সংগ্রহ করছেন চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) ঝুমু দাশ (৩৪)। কোয়ারেন্টাইন-আইসোলেশন ছাড়াই প্রতিদিন কাজ করছেন তিনি, আক্রান্তও হয়েছেন করোনাভাইরাসে। সন্তানদের সুরক্ষার জন্য বুকের দুধ খাওয়া শিশুকেও বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। করোনাভাইরাসের নমুনা সংগ্রহ করেন বলে তার পরিবারকে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। তাও টানা কাজ করে যাচ্ছেন ঝুমু দাশ। এখন পর্যন্ত কোন ধরণের প্রণোদনা পাননি তিনি।
ঝুমু দাশ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'বেতন ছাড়া কোন অর্থ পাইনি কখনো। এমনকি আমাদের কোন মূল্যায়নও নেই। আমাদের সাথে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিমাতাসুলভ আচরণ করে'।
ঝুমু দাশের মতই ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত কাজ করে যাচ্ছেন হবিগঞ্জ জেলার সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) গৌতম এন্ডো। তিনি মোটর সাইকেলে করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করেন। নমুনা সংগ্রহের জন্য হাসপাতাল থেকে একটি মোটর সাইকেল দেয়া হলেও সেটির তেলের খরচ তাকেই বহন করতে হয়। প্রতিদিন কাজ করলেও কোন কোয়ারেন্টিনের সুযোগ নেই।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে গৌতম বলেন, 'জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করার পরও আমরা কোন মূল্যায়ন পাচ্ছি না। সরকারি কোন চিঠিতে আমাদের নাম উল্লেখ থাকে না। সরকার স্বাস্থ্যকর্মীদের দুইমাসের মূল বেতনের সম্মানী দিচ্ছে। সেই তালিকায় আমাদের নাম নেই্ বলে জানিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও সিভিল সার্জন। পরে আমরা জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছি যাতে প্রণোদনার লিস্টে আমাদের নাম দেয়া হয়। কিন্তু এখনো সে বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত আসেনি। এভাবে বঞ্চিত হতে হতে এখন আর কাজে যেতে আগ্রহ পাইনা'।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান টিবিএসকে বলেন, 'টেকনোলজিস্ট সংকট ও ব্যবস্থাপনা সংকটের কারণে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো যাচ্ছে না। এক বছরের বেশি সময় ধরে পিসিআর ল্যাবে যারা কাজ করছেন তারা কোন ধরণের প্রণোদনা, পরিবহন সুবিধা বা এক বেলার খাবারের সুবিধাও পাচ্ছেন না। জনবল নেই, কয়েকজনকেই অনেক কাজ করতে হয় তাই সবাই ক্লান্ত হয়ে গেছে। টেস্ট বাড়াতে হলে টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দিতে হবে ও যারা এখন কাজ করছে তাদের যাতায়াত-খাওয়ার ব্যবস্থা বা প্রণোদনা দিতে হবে'।
গত বছরের জানুয়ারি মাসের ১৫ তারিখ থেকে বিদেশফেরত সন্দেহজনক কোভিড রোগীদের নমুনা সংগ্রহের মাধ্যমে করোনাভাইরাসের নমুনা সংগ্রহ শুরু করেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সিনিয়র টেকনোলজিস্ট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। শুরুতে বাসে করে একদিন কুমিল্লা তো পরদিন সিলেট গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করতে হয়েছে তাকে। এখনো ঢাকা শহরের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করেন তিনি। নমুনা সংগ্রহের পাশাপাশি ল্যাবে পরীক্ষাও করতে হয় তাকে।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'দেশে এখন পর্যন্ত ৫১ লাখ নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তার মধ্যে রোগী শনাক্ত হয়েছে ৭ লাখ ৩৬ হাজার। এর মধ্যে দুই লাখ মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে যাদের ডাক্তার ও নার্সরা সেবা দিয়েছে। কিন্তু আমরা তো ৫১ লাখ মানুষের নমুনা সংগ্রহ ও টেস্ট করেছি। অথচ শুধু ডাক্তার নার্সরাই ফ্রন্টলাইনার্স হিসেবে সমাদৃত, আমরা পর্দার আড়ালে রয়েছি মহামারীতেও'।
তিনি আরো বলেন, 'আমাদের অনেক সহকর্মী দুই বার করে কোভিড পজেটিভ হয়েছে। কিন্তু তারপরও আমরা প্রণোদনা পাবো না। কারণ আমরা কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে সেবা দেইনা'।
সরকার এরইমধ্যে ১৪টি হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ সম্মানী হিসেবে দুই মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করেছেন। ১,৪৭৪ জন ডাক্তার, ৪০৬ জন নার্স, ৯৮১ জন অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী আগামী ১ মে তারিখে এ অর্থ পাবেন। তবে এর মধ্যে কতজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আছে তা কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. শেখ মোহাম্মদ হাসান ইমাম টিবিএসকে বলেন, 'কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলো থেকে যেসব স্বাস্থ্যকর্মীদের নাম পাঠানো হয়েছে শুধু তারাই প্রণোদনার টাকা পাবেন। এর মধ্যে কতজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আছেন তা আমাদের জানা নেই। সরাসরি কোভিড রোগীদের চিকিৎসা সেবার জন্য যারা নিয়োজিত শুধু তারাই এ প্রনোদনা পাচ্ছেন'।
ডা. শেখ মোহাম্মদ হাসান ইমাম বলেন, 'আমরা জানি টেকনোলজিস্টরা ঝুঁকি নিয়ে নমুনা সংগ্রহ করে, টেস্ট করে কিন্তু তবুও তাদের অনেকেই প্রণোদনার বাইরে রয়েছে। এ নিয়ে অনেক অসন্তোষ আছে। আমরা বিষয়টা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বুঝিয়েছি। প্রণোদনার বিষয়টি পর্যায়ক্রমে চলবে তাই হয়তো টেকনোলজিস্টরাও প্রণোদনা পেতে পারে, তবে এখনো বিষয়টি নিশ্চিত না'।
এদিকে বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব মো. সেলিম মোল্লা বলেন, 'মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা করোনা মহামারীর প্রথম সারির সৈনিক। টেকনোলজিস্টরা নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করে রোগী শনাক্ত করার পর চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র দেন আর নার্স সেবা করে। কিন্তু করোনা চিকিৎসায় টেকনোলজিস্টদের এই গুরুত্বের কথা স্বীকার করতে চায় না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর। আমাদের নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করে না। অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে আমাদের নাম থাকে'।
তিনি বলেন, 'খাওয়া, যাতায়াত, কোন ধরণের ছুটি, কোয়ারেন্টাইন-আইসালেশন সুবিধা ছাড়া দিনের পর দিন কাজ করলেও আমাদের কোন মূল্যায়ন নেই। মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের কাজের মূল্যায়ন ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি'।
