বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে জন্মহার কমছে
একটি দেশের জনসংখ্যাকে প্রাকৃতিকভাবে প্রতিস্থাপন করতে হলে দেশে অন্তত ২ দশমিক ১ জন্মহার থাকতে হয়। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম সূত্র জানিয়েছে, অধিক জনসংখ্যার দেশ বলে পরিচিত বাংলাদেশেও এখন জন্মহার ১ দশমিক ৭।
বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনসংখ্যার দেশ ভারতকেও কম জন্মহারসম্পন্ন দেশগুলোর তালিকায় ফেলা যায়। প্রতিস্থাপন হারের ক্ষেত্রে তাদের জন্মহার ২ দশমিক ১। এই তালিকায় আরও আছে জাপান (১ দশমিক ৩), রাশিয়া (১ দশমিক ৬), ব্রাজিল (১ দশমিক ৮) ও ইন্দোনেশিয়া (২ দশমিক ০)।
হ্যাঁ, জন্মহার কমছে। অনেক দেশেই কোভিড-১৯ জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে দমন করে ফেলেছে। এর ফলে জন্মহার, অভিবাসন এবং জীবনের আয়ু কমে গেছে। কিন্তু মহামারির আগে থেকেই নগরায়নের ফলে জনসংখ্যা কমতে শুরু করেছিল।
এখনো পর্যন্ত পাকিস্তান (৩ দশমিক ৪) ও নাইজেরিয়ার (৫ দশমিক ১) বড় বড় কিছু দেশে উচ্চ জন্মহার রয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বর্তমানে তাদের জন্মহার ১৯৬০ সালের জন্মহারের চেয়েও কম। সে সময় পাকিস্তানের জন্মহার ছিল ৬ দশমিক ৬ এবং নাইজেরিয়ার ছিল ৬ দশমিক ৪।
মে মাসের শেষের দিকে চীনা সরকার ঘোষণা দেয়, দেশটির নাগরিকরা এখন থেকে সর্বোচ্চ তিনটি সন্তান নিতে পারবেন। ১৯৮০ সালে তাদের 'একটি সন্তান'-নীতি বদলে দেয়ার মাত্র ৫ বছর পরেই এই সিদ্ধান্ত নিলো চীন।
অর্থাৎ, বোঝাই যাচ্ছে কিছু একটা চলছে এখন। আর সেটি হলো, চীন সন্তান উৎপাদন খরায় ভুগছে।
মে মাসে প্রকাশিত, সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, চীন প্রতিবছর ৪০০,০০০ মানুষ হারাচ্ছে। যদিও চীনের দাবি, এখনো তাদের জনসংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু এসব অভিক্ষেপণকে যদি ফেস ভ্যালু ধরা হয়, তাহলে মধ্যশতাব্দী থেকে যে জনসংখ্যা হ্রাস হবে বলে মনে করা হচ্ছিলো, সে প্রক্রিয়া ২০৩০ এর মধ্যেই শুরু হয়ে যাবে। আর যদি তা হয়, তাহলে ২১০০ সালের মধ্যে চীন তাদের বর্তমান জনসংখ্যা থেকে ৬০০-৭০০ মিলিয়ন মানুষ হারাবে। ৬০০-৭০০ মিলিয়ন মানুষ মানে তাদের বর্তমান জনসংখ্যার অর্ধেক।
অতি ক্ষমতাধরদের মধ্যে চীনের জনসংখ্যা হ্রাস নতুন কিছু নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অতি সাম্প্রতিক এক আদমশুমারি অনুযায়ী, টানা ষষ্ঠ বছরের মতো যুক্তরাষ্ট্রের জন্মহার কমে গেছে এবং ২০০৭ সাল থেকে মোট ১৯ শতাংশ কমেছে। চীনের মত আমেরিকার জন্মহারও এখন প্রতিস্থাপন হারের নিচে (১ দশমিক ৬)।
জন্মহার হ্রাসের পেছনে কোভিড-১৯ এর ভূমিকা
কোভিড-১৯ মহামারি একটি পরিবর্তক হিসেবে কাজ করছে ঠিকই, কিন্তু লকডাউন শুরুর পর সাধারণ মানুষ কিংবা কমেডিয়ানরা যেভাবে ভেবেছিল সেভাবে নয়, বরং তার বিপরীত ভাবে।
পাঠকের নিশ্চয়ই 'লকডাউনে ঘরে আটকে যাওয়া মানেই বাচ্চার ঘরের দিকে যাওয়া'-এ ধরনের হাস্যরসাত্মক জোকস মনে আছে। কিন্তু প্রাপ্ত ডেটা আমাদের দেখাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। বর্তমান যুগে বেশিরভাগ সন্তানই পরিকল্পিত বা ইচ্ছাপূর্বক নেয়া হয়, বিশেষত উন্নত দেশে এই চর্চা বেশি। আর সন্তান জন্মদানের ইচ্ছা নির্ভর করে সন্তানের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যত তৈরি করতে পারার উপর। কিন্তু মহামারিকালে নতুন একটি জীবনের নিরাপত্তা সম্পর্কে আশাবাদী হওয়া বেশ কঠিন। এমনকি ব্রুকিংস ইনস্টিটিউট এমন তথ্য জানিয়েছে যে, মহামারি সংক্রান্ত অনিশ্চয়তায় পড়ে যুক্তরাষ্ট্রে ৩০০,০০০ শিশুর জন্ম হয়নি।
বহু উন্নত দেশে মহামারি জন্মহারকে ঠেকিয়ে দিয়েছে-এটি শুধুমাত্র একটি দিক। অন্যটি হলো, সীমান্ত বন্ধ রাখা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অস্ট্রেলিয়ায় সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা হ্রাস পেয়েছে ২০২০ সালে এবং কোভিড-সংক্রান্ত জটিলতায় সীমান্ত বন্ধ রাখাই এর কারণ। ২০২০ সালে কানাডা ১৮০,০০০ আবেদনকারীকে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দিয়েছে, যাদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী কিংবা কাজের ভিসা নিয়ে কানাডায় ছিল।
তৃতীয় যে কারণটি রয়েছে, তা হলো- মহামারির ফলে মৃত্যুর হার। গবেষকরা জনিয়েছেন, কোভিডজনিত মৃত্যুর ফলে আমেরিকায় মানুষের জীবনের আয়ুষ্কাল এক বছর কমে গেছে। জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপর এই প্রভাব আরো জোরাল। আফ্রিকান আমেরিকানদের আয়ু কমেছে দুই বছর এবং লাতিন অঞ্চলের মানুষের আয়ু কমেছে তিন বছর। আনুষ্ঠানিকভাবে কোভিডজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বলা হয়েছে ৩ মিলিয়ন। কিন্তু কিছু দেশে মৃত্যুহার সঠিকভাবে রিপোর্ট না করায় প্রকৃতভাবে মোট মৃত্যুর সংখ্যা আরো বেশিও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের কথা বলা যায় যেখানে প্রতিদিন ৪০০০ মানুষ করোনায় মারা যাচ্ছেন এবং কর্তৃপক্ষের বিশ্বাস, আসল সংখ্যাটা আরো বেশি।
কিন্তু ব্যাপারটা আসলে শুধু মহামারি নয়...
নগরায়ণ সবচেয়ে মূখ্য একটি বিষয়। গত শতাব্দীতে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অভিবাসন ঘটেছে এবং মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসতে থাকায় এটা চলতেই থাকবে। ১৯৬০ সালে মানবজাতির এক-তৃতীয়াংশ শহরে থাকতো। কিন্তু আজ ৬০ শতাংশ মানুষ গ্রাম থেকে শহরে চলে আসায় অর্থনৈতিক সুবিধা ও বড় পরিবারের সমস্যার বিষয়গুলোর মোড় ঘুরে গেছে। গ্রামে অনেক সন্তান থাকা মানে মাঠে কাজ করার জন্য অনেকগুলো হাত, আর শহরে অনেক সন্তান মানে খাবার জোগানোর জন্য অনেকগুলো মুখ। আর সে কারণেই শহরে এসে যেটা যৌক্তিক সেটাই আমরা করি, তা হলো- কম সন্তান নেয়া।
শহরে চলে আসায় নারীদের জীবনযাত্রায়ও পরিবর্তন আসে। অতীতে তাদের নানি-দাদীদের গ্রাম্য জীবনের সঙ্গে তাদের জীবন মিলে না। শহুরে নারীরা শিক্ষা ও ক্যারিয়ার নিয়ে অনেক বেশি সচেতন এবং জন্মনিয়ন্ত্রণের সুবিধাও তাদের হাতের মুঠোয়। ফলে, জন্মহারও কম হয়ে থাকে। সে কারণেই প্রথমবার মা হওয়া নারীদের বয়স এখন বেশি হয় এবং টিনএজ বয়সে গর্ভধারণ বেশ নাটকীয় হারে কমে গেছে।
কোভিড জনসংখ্যা হ্রাসের দিকে আমাদের আগেভাগেই ঠেলে দিলেও, এটিই মূল কারণ নয়।
জনসংখ্যা হ্রাস কেন চিন্তার বিষয়?
কম জনসংখ্যা থাকা জলবায়ু-পরিবেশের জন্য ভালো, কিন্তু এর অর্থনৈতিক ফলাফল হবে চরম নেতিবাচক।
কেউ কেউ মনে করেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রতি আমাদের এই মোহ কাটানো উচিত, কম জনসংখ্যা নিয়েই চলতে শেখা উচিত। শুনতে বেশ ভালো শোনাচ্ছে। কিন্তু আপনি যেসব জিনিস বিক্রি করছেন , এগুলো কে কিনবে তখন? আপনি বৃদ্ধ হলে আপনার স্বাস্থ্যসেবার খরচ ও পেনশন কে দিবে?
কারণ খুব শিগগিরই মানবজাতি আজকের চাইতে অনেক ছোট ও বৃদ্ধ হয়ে আসবে।
