দেশব্যাপী পরিবহন ধর্মঘট, দুর্ভোগে যাত্রীরা
শুক্রবার সকাল থেকে দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট শুরু হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা।
ধর্মঘটের কারণে সকল ধরনের দূরপাল্লার বাস ও পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকায় যাত্রীরা পড়েছেন এই দুর্ভোগে।
লকডাউনের কারণে যেসব গণপরিবহন এবং পণ্য পরিবহন মালিকেরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, তারাই ডিজেল এবং কেরোসিনের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এই ধর্মঘট পালন করছেন। তারা ভাড়া পুনঃনির্ধারণের দাবিও জানিয়েছেন।
ঢাকার রাস্তায় হাতেগোনা মাত্র দুই-তিনটি কোম্পানির বাস এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বাস চলাচল করতে দেখা গেছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকায় গত বুধবার বাংলাদেশে ডিজেল ও কেরোসিন লিটার প্রতি ১৫ টাকা করে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
ট্রাক-কার্ভাড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি মোঃ তফাজ্জল হোসেন বলেন, "পরিবহন মালিকরা ইতোমধ্যেই অনেক চাপের মধ্যে আছে। এখন ডিজেলের দাম বাড়ায় আমাদের পক্ষে যানবাহন চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই পদক্ষেপ (জ্বালানির দাম বৃদ্ধি) পুরোপুরি অযৌক্তিক।"
সরকার এ দাম বাড়ানোর ব্যাপারে পরিবহন নেতাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি বলেও অভিযোগ করেন তফাজ্জল হোসেন।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি তার সর্বব্যাপী প্রভাব নিয়ে অসহনীয় বোঝা হয়ে উঠতে চলেছে ভোক্তাদের জন্য। কৃষির সেচ খরচ থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সবকিছুতেই দেখা দেবে ঊর্ধ্বগতি, শেষ পর্যন্ত যার চাপ পড়বে ভোক্তাদের ওপরই।
নিত্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিতে মানুষের পকেটে টান পড়েই আছে, তার ওপর যোগ হলো কেরোসিন ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি।
এদিকে নেত্রকোনা, গাজীপুর, রাজশাহী, মৌলভীবাজার প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, এসব জেলায় কোন ধরনের গণপরিবহন ও পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল করছে না।
তবে মুন্সীগঞ্জ-ঢাকা বাস চলাচল করছে বলে জানিয়েছেন আমাদের প্রতিনিধি।
রাজশাহী
শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে রাজশাহী থেকে কোনো ধরনের বাস, মিনিবাস ও ট্রাক ছেড়ে যায়নি। কোনো বাস ট্রাক রাজশাহীতে প্রবেশও করেনি।
রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মতিউল হক টিটো জানান, হঠাৎ করে তেলের মূল্য লিটারে ১৫ টাকা বাড়ায় বর্তমান ভাড়ায় বাস চলাচল করা সম্ভব হচ্ছে না। এই ভাড়ায় বাস চলাচল করলে আমাদের অনেক টাকা লোকসান গুণে গাড়ি চালাতে হবে। তাই তেলের দাম কমিয়ে বাস ভাড়ার সাথে সমন্বয় করতে হবে। যতক্ষণ না সরকার এই উদ্যোগ নিচ্ছে ততদিন পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট চলবে।
গাজীপুর
গাজীপুরে দূরপাল্লার বাস, মিনিবাসসহ সব ধরনের গণপরিবহন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে পরিবহন মালিকরা। সকাল থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার যাত্রী ও সাধারণ মানুষ।
এ মহাসড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন রুটের গাড়ি বন্ধ থাকায় কার্যত ঢাকা ও আশপাশের জেলার সঙ্গে গাজীপুরের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সীমিত পরিসরে সিএনজি, অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। তবে এসব পরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।
পরিবহন ধর্মঘটে বন্ধ রয়েছে ট্রাক, পিকআপ ও লরি চলাচল; ফলে জরুরি পণ্য ও মালামাল পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে কিছু দূরপাল্লার বাস, মিনিবাস চলাচল করতে দেখা গেছে।
নেত্রকোনা
শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য গণপরিবহন ও সকল প্রকার পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকলেও নেত্রকোনায় মূলত বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর থেকেই ধর্মঘট চলছে। বৃহস্পতিবার রাতে জেলা সদর থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় চলাচলকারী কোন বাস ছেড়ে যায়নি। এছাড়া শুক্রবার সকাল ৬টার পর থেকে জেলার অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে, বিশেষ করে নেত্রকোনা-কলমাকান্দা, নেত্রকোনা-মদন এবং নেত্রকোনা-মোহনগঞ্জ রুটে কোন বাস চলছে না।
বাস চলাচল বন্ধ থাকায় চরম বিড়ম্বনায় পড়েছেন দূরদূরান্তের যাত্রীরা। সকাল সাড়ে ১০টায় জেলা শহরের পারল এলাকার আন্তঃজেলা বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা যায়, বাস না পেয়ে অনেকে ফেরত যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ সিএনজি বা অটোরিক্সায় চড়ছেন। ট্রেনেও চড়ছেন ধারণক্ষমতার অধিক যাত্রী। এদিকে সিএনজিতেও নেয়া হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া।
পিয়া বৈশ্য নামে জেলা শহরের উকিলপাড়ার এক যাত্রী বলেন, 'আমি এমএড কোর্সের ভাইভা পরীক্ষা দিতে ময়মনসিংহ যাচ্ছি। বাস না পেয়ে বাধ্য হয়ে সিএনজিতে উঠেছি। সিএনজি ভাড়া ৮০ টাকার বদল ১০০ টাকা করে নিচ্ছে।'
সুজন চন্দ্র দে নামে সদর উপজেলার ঠাকুরাকোনা গ্রামের অপর এক যাত্রী বলেন, 'আমার চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহে যাওয়া প্রয়োজন। বাস না পেয়ে এখন ট্রেনের উদ্দেশ্যে রেলস্টেশনে যাচ্ছি। যে কোন একটা ব্যবস্থায় যেতে তো হবেই।'
ময়মনসিংহ
গণপরিবহন বন্ধ থাকায় শুক্রবার সকালে নগরীর মাসকান্দা বাস টার্মিনাল ও পাটগুদাম ব্রিজ মোড়ে গিয়ে সাধারণ মানুষ ও ব্যাংকের চাকরিপ্রত্যাশী পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তি দেখা যায়।
চাকরিপ্রার্থী শামীমা আফরিন জানান, "শুধু ব্যাংক না, খাদ্য ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ বেশ কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা ছিল আজ। ধর্মঘটের ডাক দেওয়ায় বাস বন্ধ থাকায় আমার মতো অনেক চাকরিপ্রার্থী বিপাকে পড়েছেন। ঘোষণা দিয়ে পরিবহন ধর্মঘট ডাকা হলে আমাদের মতো চাকরিপ্রার্থীদের এই ভোগান্তিতে পড়তে হতো না।"
আরেকজন চাকরিপ্রার্থী কামরুল হাসান জানান, তার আজ খাদ্য অধিদফতরে একটি নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেয়ার কথা ছিল।
তিনি বলেন, "ছুটির দিনগুলোতে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা হয়ে থাকে। বেকার যুবসমাজের কথা মাথায় রেখে, ঘোষণা দিয়ে একদিন পরে শনিবার থেকে পরিবহন ধর্মঘট ডাকতে পারতো মালিকরা।"
এনা পরিবহনের চালক খন্দকার হানিফ বলেন, "হঠাৎ সরকারের এমন সিদ্ধান্ত আমাদের মত গরিব মানুষের পেটে লাথি মারা ছাড়া আর কিছুই না। আমাদের মালিক ও পরিবহন নেতাদের সাথে আলোচনা করে দাবি মানলেই রাস্তায় গাড়ি চলবে।"
ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের এনা পরিবহনের সুপারভাইজার অনিক মিয়া জানান, শুক্রবার ফজরের নামাজের পর থেকেই ঢাকায় যাওয়ার জন্য যাত্রীরা টার্মিনালে এসে ভিড় করতে থাকে। সাধারণ যাত্রীদের তুলনায় চাকরিপ্রার্থী যাত্রীদের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল।
ময়মনসিংহ জেলা মোটর মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নুরুল হুদা বলেন, "হঠাৎ করে ডিজেলের ১৫ টাকা বৃদ্ধি করায় সারাদেশের মত ময়মনসিংহের চালক ও মালিকরা গণপরিবহন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমাদের দাবি না মানা পর্যন্ত গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। আশা করছি সরকার মানুষের ভোগান্তির কথা চিন্তা করে দাবি মেনে নেবে।"
