তিন জেলায় ১ লাখ নারী উদ্যোক্তা তৈরী কোকাকোলার
মীরা আক্তার, জামালপুরের মাদারগঞ্জ এএইচজেড কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়াশুনা করছেন। ৯ম শ্রেনীতে অধ্যায়নরত অবস্থায় তারা পাঁচজন নারী মিলে মাত্র ৩ হাজার টাকার ঘর ভাড়া নিয়ে একটি মাল্টিপারপাস শপের মতো চালু করেন। মীরা সেখানে গ্রামের লোকদের টেলিমেডিসিন সেবা দিয়ে থাকেন।
শুরুটা একটু জটিল হলেও বর্তমানে গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে বেশ ভালোই সাড়া পাচ্ছেন। নিয়মিত তার কাছে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে এবং ওষুধ কিনতে আসছেন গ্রামের লোকজন। এ কাজের জন্য বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইউনাইটেড পারপাসকে সঙ্গে নিয়ে তাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে সহযোগিতা করেছে কোকা কোলা।
মীরা আক্তার টিবিএসকে বলেন, 'একটা সময় ছিল ইচ্ছা করলেই প্রয়োজনীয় কিছু কিনতে পারতাম না। পরিবার চলেছে কোনোভাবে টেনেটুনে। কিন্তু ২০১৭ সালে কোকা কোলার ইউনাইটেড পারপাস থেকে প্রশিক্ষণ পেয়ে আশার আলো দেখতে পাই আমরা'।
'আমরা ৫ জন মিলে দোকানটি দেই যেখানে টেলিমেডিসিন সেবাসহ আইটি সুবিধা, প্রিন্ট করা, মুদি পন্য, নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার মত উপাদান বিক্রি করা হয়। যার সেবা পেয়ে গ্রামবাসী নিজেরাও উদ্যোক্তা হতে উদবুদ্ধ হচ্ছে'।
শুধু মীরা আক্তারই নন, তার মতো দেশের জামালপুর, খুলনা ও বাগেরহাট এই তিন জেলাতে এক লাখেরও বেশি প্রান্তিক নারীকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার মাইলফলক অর্জন করেছে কোমল পানীয় কোম্পানি কোকা-কোলা। তাদের এ কাজে সহযোগিতা করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইউনাইটেড পারপাস। এসব উদ্যোক্তার প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা আলাদা সফলতার গল্প।
'ফাইভ বাই টোয়েন্টি' ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে ২০১৫ সালে মাত্র ১০টি সেন্টারে ১০ হাজার নারীকে নিয়ে কোকা-কোলা বাংলাদেশে উইমেন বিজনেস সেন্টার (ডব্লিউবিসি) বা নারী ব্যবসা কেন্দ্র নামে অনন্য ও ব্যতিক্রমধর্মী মডেলের বাস্তবায়ন শুরু করে। নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশে কোকা-কোলা ডব্লিউবিসি কার্যক্রম চালাচ্ছে।
এ কার্যক্রমের আওতায় তারা নারীদের বিভিন্ন কুটির শিল্পের কাজ, আইটি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হাঁস মুরগী পালন, ধান উৎপাদন ও বীজ তৈরী, বিভিন্ন ধরনের ফল, সব্জি চাষ প্রভৃতির প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। তাদের ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে বিভিন্ন ঋণ দাতা ব্যংক ও প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতেও সহযোগিতা করে সংস্থাটি। দলনেতারা তাদের আওতাধীন সদস্যদের নিয়ে উঠোন বৈঠকের মাধ্যমে পর্যালোচনাসহ সমস্যা-প্রতিবন্ধকতা এবং সমাধান খুঁজে বের করেন।
মাদারগঞ্জ এর একটি সেন্টারের দলনেতা বিলকিস পারভিন টিবিএসকে বলেন, 'আমি ইউনাইটেড পারপাস থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে মাত্র ২০টি মুরগির ডিম ফুটিয়ে পালন শুরু করি। আমি এখন একটি পোল্ট্রি খামারের মালিক। এখন আমি নিজেই অন্য নারীদের প্রশিক্ষণ দেই। সাথে সেলাইয়ের কাজ করছি এবং প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। আমিসহ আমার গ্রামের প্রায় ২০০ নারীকে স্বাবলম্বী করতে সক্ষম হয়েছি'।
এই প্রকল্পের লক্ষ্য নারী উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, বাজার তথ্য, কৃষি প্রশিক্ষণ, মোবাইল ব্যাংকিং সহায়তা, স্বাস্থ্য পরামর্শ, দিক নির্দেশনা ও নেটওয়ার্কিং সুবিধা প্রদান এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ ও আর্থিক সহায়তা দেয়া।
নারী উদ্যোক্তারা সচরাচর যেসব বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হন, সেসব সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের কথা মাথায় রেখে নারী পরিচালিত এসব ব্যবসা কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। দেশের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমের জামালপুর, খুলনা ও বাগেরহাট জেলায় বর্তমানে ৭০টির বেশি ডব্লিউবিসি কেন্দ্র ও ২০০ উপকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্র ও উপকেন্দ্রের মাধ্যমে ২০২০ সালের মধ্যে ১ লক্ষেরও বেশি নারীকে ক্ষমতায়িত করার মাইলফলক অর্জন করে কোকা-কোলা।
এদের মধ্যে মূল উদ্যোক্তা ৩৫০ জন এবং এদের সাথে ১ লক্ষ নারী উদ্যোক্তা জড়িত। এ তিন জেলাতে প্রায় ৭০টি সেন্টার রয়েছে তাদের।
ডব্লিউবিসি থেকে জানানো হয়, এ প্রকল্পের মাধ্যমে এক লাখ নারী স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে পরোক্ষভাবে উপকৃত হয়েছেন চার লাখ মানুষ। প্রকল্পের শুরুতে নারীদের (প্রত্যেকের) মূলধন প্রায় ৫০ হাজার টাকার মতো থাকলেও ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায়।
৯০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তার অর্থের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে
৩০টি ডব্লিউবিসি কেন্দ্র থেকে ৫০০জন উপকৃতের ওপর পরিচালনা করা এক জরিপের ৯০ শতাংশ উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, তাদের আয় করা অর্থের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ তাদের নিজেদের কাছে থাকে। শতভাগ উদ্যোক্তা ও কমিউনিটি সদস্য জরিপে বলেছেন, বাইরের অর্থসাহায্য ছাড়াই ডব্লিউবিসি কেন্দ্র টেকসই।
জরিপ মতে, ৬০ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, ডব্লিউবিসি কেন্দ্র ছাড়া তারা আইটি বা তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধা পেতেন না। জরিপে অংশ নেয়া শতভাগ নারী বলেছেন তারা ডব্লিউবিসি সেন্টারের স্বাস্থ্যসেবা পেয়েছেন।
কৃষিকাজের জন্য ডব্লিউবিসি কেন্দ্র থেকে পণ্য কিনেছেন বলে জানিয়েছেন ৭০ শতাংশ নারী এবং ৪৩ শতাংশ নারী ডব্লিউবিসি কেন্দ্রে পণ্য বিক্রি করেছেন। জরিপে অংশ নেয়া শতভাগ নারীই ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা বলেছেন।
৭০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, পরিবারে সিদ্ধান্ত নেবার দায়িত্ব তারা যৌথভাবে পালন করেন, বাকি ৩০ শতাংশ নারী একাই পরিবারে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।
জামালপুরে ৫০ জন দলনেতা নিয়ে উদযাপন
কোকা-কোলা ডব্লিউবিসি প্রকল্পের আওতায় জামালপুর জেলাসহ তিনটি জেলায় ১ লক্ষেরও বেশি নারীকে ক্ষমতায়িত করার মাইলফলক অর্জন করায় গত ১৬ মার্চ জামালপুর লুইস ভিলেইজ পার্কের হলরুমে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদযাপন করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামালপুরের জেলা সিভিল সার্জন প্রনয় কান্তি দাস বলেন, 'নারীর ক্ষমতায়নের জন্য কোকা-কোলা বাংলাদেশ এবং ইউনাইটেড পারপাসের গৃহীত উদ্যোগে আমরা কৃতজ্ঞ। ডব্লিউবিসি প্রকল্পটি শুধু প্রান্তিক নারীদেরই ক্ষমতায়িত করে নি, পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যরাও এর মাধ্যমে উপকৃত হয়েছে'।
ইউনাইটেড পারপাসের বাংলাদেশে নিযুক্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর শ্রীরামাপ্পা গনচিকারা বলেন, 'ইউনাইটেড পারপাসের অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে ডব্লিউবিসি প্রকল্পটি কোনরূপ প্রাথমিক সমর্থন ছাড়াই কার্যকর। আমাদের প্রকল্পের মাধ্যমে নারীদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে এবং তারা এখন আগের চাইতেও আত্মবিশ্বাসী। উদ্যোগটিকে বাস্তবে রূপদানের জন্য কোকা-কোলার প্রতি আমাদের বিশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি'।
অনুষ্ঠানে কোকা-কোলার কান্ট্রি ম্যানেজার (পাবলিক-অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন) ফারাহ শারমিন আওলাদ বলেন, 'নারীদের মাঝে অর্থনীতির অন্যরকম সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। পেছনে ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, আমাদের এই ব্যবসায়িক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নারীদের জীবনে পরিবর্তন এসেছে এবং আমরা সে পরিবর্তনকে উদযাপন করি। ইউনাইটেড পারপাস এবং আমাদের অন্যান্য সহযোগীকে আমরা এ যাত্রায় ধন্যবাদ জানাতে চাই যাদের অবদানের ফলে শত শত নারীর জীবনে পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়েছে'।
