তামাক ছেড়ে তুলা চাষে রংপুরের কৃষকরা
চলতি বছর ১৫ বিঘা জমিতে তুলা চাষ করেছেন কৃষক সিরাজুল ইসলাম। বাড়ি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালিতে। তিন বছর আগেও তামাক চাষ করতেন তিনি। জেলার কাউনিয়া উপজেলার হারাগাছের রফিকুল ইসলাম। তিনিও তুলা চাষ করেছেন ৬ বিঘা জমিতে। আজিজুল ইসলাম চাষ করেছেন সাড়ে পাঁচ বিঘাতে। এভাবেই একে অন্যের দেখাদেখি স্বাস্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ফসল তামাকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব তুলা চাষের দিকে ঝুঁকছেন রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা।
তামাক চাষে অতিরিক্ত পরিশ্রম ও মুনাফা কম হওয়ায় বিষাক্ত তামাকের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা। তুলার সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবে যাবতীয় শাক-সবজি এবং তুলা উঠানোর পর আলুসহ ধান চাষে কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকায় এ অঞ্চলের কৃষকদের দৃষ্টি এখন তুলা চাষের দিকে। দোআঁশ মাটির অঞ্চল রংপুরে রয়েছে তুলা চাষের অপার সম্ভাবনা। ফলে দিন দিন তামাক উৎপাদন অনেকাংশেই হ্রাস পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এদেশের মাটি ও আবহাওয়া দুই’ই তুলা চাষের অনুকুলে থাকায় এ ফসল উৎপাদনে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় লোকবল এবং চাষীদের উদ্বুদ্ধকরণসহ তাদের প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতা দিলে এদেশের মাটিতে তুলা উৎপাদন করে তা থেকেই চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করা সম্ভব।
রংপুর কৃষি উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. সরওয়ারুল হক জানান, দীর্ঘদিনের প্রচলিত ফসল তামাকের চাষ বিগত ৫ বছরের তুলনায় অনেকাংশে কমে এসেছে। স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এ তামাক চাষ পরিহার করে তুলা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন চাষিরা। অপর দিকে তামাকের কুফল সম্পর্কে নানা কর্মসূচির অংশ হিসেবে কৃষি দিবস, মাঠ দিবসসহ ব্যক্তিগত প্রচারণার ফলে সাধারণ কৃষক তামাকের পরিবর্তে তুলা চাষে স্বাছন্দ বোধ করছেন।
তিনি আরও বলেন, তুলার সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবে শীতকালীন সবজি চাষের সুযোগ থাকায় কৃষকরা তুলা চাষকে লাভজনক মনে করছেন। রংপুরে গত বছর তামাক চাষ করা হয়েছিল ১৫৪০ হেক্টর জমিতে। চলতি বছর তা কমে চাষ হয়েছে ১০১০ হেক্টর জমিতে।
রংপুরের প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা কৃষিবিদ জিল্লুর রহমান বলেন, ‘‘বিগত দিনে রংপুরের চরাঞ্চলে যেখানে তামাক ছাড়া অন্য কোনো ফসলের চাষ হতো না, সেখানে তুলা চাষে অভাবনীয় সাফল্য লক্ষ্য করা গেছে। পরিবেশবান্ধব এ ফসল অনেক লাভজনক এবং সকল প্রকার ঝুকিমুক্ত। অপরদিকে তুলা গাছের পাতা মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে। চাষীরা এখন নিজে থেকেই উপলব্ধি করতে পারছেন যে, তামাক চাষ ও প্রক্রিয়াজাত করণে অনেক ঝুঁকি রয়েছে।’’
রংপুর তুলা উন্নয়ন বোর্ডের উপ-পরিচালক আবু ইলিয়াস মিঞা জানান, জেলায় চলতি ২০১৯-২০২০ মৌসুমে ২৬০০ হেক্টর জমিতে তুলা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। তবে চাষ হয়েছে ২৫৩৫ হেক্টর জমিতে। এছাড়া বোর্ডের উদ্যোগে ২৭০টি প্লটে ২৫৩ বিঘা জমিতে প্রদর্শনী চাষ হয়েছে। বীজ উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৬৩৭০ মেট্রিক টন। এই বীজ তারা কৃষকের কাছ থেকে কিনে নেবে।
তিনি আরও জানান, সারা দেশে প্রতি বছর ৭০ লাখ বেল (১ বেল=৪৮০ পাউন্ড) তুুলার চাহিদা রয়েছে। এ চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। দেশে উৎপাদিত তুলা দিয়ে মোট চাহিদার ৪ থেকে ৫ শতাংশ পুরণ করা সম্ভব। অবশিষ্ট তুলা আমদানি করতে হয়। কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা গেলে তুলা চাষ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে।
আবু ইলিয়াস বলেন, তার দপ্তরে জনবল কম থাকায় দাপ্তরিক কাজকর্মে কিছুটা ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। এ বছর রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলা ও কাউনিয়া উপজেলার হারাগাছ এলাকায় প্রচুর তুলা চাষ হয়েছে। সাধারণত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তুলা চাষের মৌসুম হলেও কৃষকরা যাতে অধিক সুবিধা পান সে উদ্দেশ্যে মে-জুুন মাসে আগাম জাতের তুলার চাষের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
রংপুর সিভিল সার্জন ডা. হিরম্ব কুমার রায় জানান, ‘‘তামাক সেবনে যেমন স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি তামাকের পরিচর্যা, কর্তন ও প্রক্রিয়াজাতকরণেও রয়েছে ঝুকির শঙ্কা। কারণ, তামাক প্রক্রিয়াজাত করণের সময় তামাকের গুড়া সরাসরি নাক দিয়ে শ্বাসনালী বেয়ে ফুসফুসে প্রবেশ করে। ফলে সেবনকারিদের মতোই ফুসফুসে ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।’’
তুলা চাষিরা জানান, এক বিঘা জমিতে দেশি জাতের তুলা চাষ করতে কৃষকদের খরচ হয় প্রায় ১৭ হাজার টাকা, লাভ আসে ২৬ থেকে ২৭ হাজার টাকা। অপরদিকে চীন থেকে আমদানীকৃত হাইব্রিড জাতের তুলা চাষে খরচ হয় ১৯ থেকে ২০ হাজার টাকা, লাভ হয় ৩৬-৩৭ হাজার টাকা। সেদিক থেকে দেখা যায় দেশি জাতের চেয়ে হাইব্রিড জাতের তুলা চাষে মুনাফা বেশি। এখানকার মাটি এবং আবহাওয়া দু-ই তুলা চাষে উপযোগী।
হারাগাছের তুলা চাষি নূরুল আমিন জানান, তিনি গত বছর ১ বিঘা জমিতে হাইব্রিড জাতের তুলা চাষ করে ১৮মন তুলা উৎপাদন করেন। প্রতিমন ২৫০০টাকা দরে বিক্রি করায় খরচ বাদে তিনি নীট লাভ করেছেন ২৫ হাজার টাকা। পাশাপাশি সাথি ফসল হিসেবে লালশাক চাষ করে অতিরিক্ত আয় হয়েছে ৭ হাজার টাকা। তার মতে নিবিড় পরিচর্যা করা হলে এ তুলা চাষে অধিক লাভবান হওয়া সম্ভব।
