উত্তরাঞ্চলে শিল্পায়নের উদ্যোগ বেপজার, রংপুর ও সিরাজগঞ্জে নতুন ইপিজেড পরিকল্পনা
দেশের উত্তরাঞ্চলের শিল্পায়ন বৃদ্ধি এবং সৌরশক্তির ব্যবহার উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) রংপুর ও সিরাজগঞ্জে দুটি নতুন রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) স্থাপন করতে চায় বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) সংস্থাটির ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বেপজা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তনের ইতিহাসে ধারাবাহিক ও গভীর অবদান রেখেছে।
বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, 'বর্তমানে চালু ৮টি ইপিজেড ও ২টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের পাশাপাশি যশোর ও পটুয়াখালীতে নতুন ইপিজেড বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এছাড়া রংপুর ও সিরাজগঞ্জে ইপিজেড স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে দেশের শিল্পায়নের ভৌগোলিক বিস্তার আরও বাড়বে।'
জানা গেছে, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ এলাকায় রংপুর চিনিকলের আওতায় ১ হাজার ৮৪২ একর জমি আছে। মোট জমির মধ্যে ৪৫০ একর জমি বেপজাকে বুঝিয়ে দেয় চিনিকল কর্তৃপক্ষ। ইপিজেড হলে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
পণ্যের বৈচিত্র্যে নতুন দিগন্ত
বেপজা জানায়, ১৯৮০ সালে 'বেপজা আইন' পাস হয়। ১৯৮১ সালের ১৫ এপ্রিল প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে বেপজা আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে, যা পরিকল্পিত শিল্পায়নের এক নতুন যুগের সূচনা করে।
শুধু তৈরি পোশাক নয়, ইপিজেডগুলোতে এখন গাড়ির যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক্স, ক্যামেরা লেন্স, উইগ, জুতা, বাইসাইকেলসহ নানা পণ্য উৎপাদন হচ্ছে। মোট কারখানার মাত্র ৩২ শতাংশ তৈরি পোশাক উৎপাদন করে, বাকি ৬৮ শতাংশে রয়েছে বৈচিত্র্যময় শিল্প।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক (জনসংযোগ) এ.এস.এম. আনোয়ার পারভেজ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, 'দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, পণ্যের বৈচিত্রায়নের মাধ্যমে রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেপজার অধীনে পরিচালিত জোনগুলো দেশের শিল্প খাতে অনন্য অবদান রাখছে।'
তিনি বলেন, 'বেপজার অধীনে পরিচালিত আটটি ইপিজেড এবং বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের মোট আয়তন মাত্র ৩,৫৫০.৩৩ একর বা ১৪.৩৭ বর্গ কিলোমিটার, যা দেশের মোট আয়তনের মাত্র ০.০০১% এর-ও কম। এই ক্ষুদ্র জমি থেকে প্রতিবছর বেপজা দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ১৫-২০% অবদান রাখছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় রপ্তানিতে বেপজা জোনগুলোর অবদান ছিল ১৭.০৩%।'
তিনি আরও বলেন, 'গত ৪৫ বছরে বেপজা ৭.২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে এবং মোট ১২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে। বেপজার জোনগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৫.৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, যার একটি বড় অংশ নারী। এই কর্মসংস্থান শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নয়, সামাজিক পরিবর্তন ও নারী ক্ষমতায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।'
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ৮টি ইপিজেডের সাফল্যের পর ২০১৮ সালে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বেপজার নতুন সংযোজন বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কাজ শুরু হয়। এখান থেকে ইতোমধ্যে পণ্য রপ্তানি শুরু হয়েছে।
শুরু থেকেই বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছে এবং জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে একটি আইকনিক শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইতোমধ্যে ৮টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করেছে এবং আরও পাঁচটি প্রতিষ্ঠান পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করেছে। আরও ৩৪টি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
ক্রমবর্ধামান বিনিয়োগ আকর্ষণের অংশ হিসেবে যশোর ও পটুয়াখালীতে দুটি ইপিজেড স্থাপনের কাজ শুরু করেছে, যার উন্নয়ন কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
বেপজা আশা করছে, এই বছরের মধ্যেই পটুয়াখালী ও যশোর ইপিজেডের প্লট বরাদ্দ শুরু হবে।
গতকাল 'বেপজা ডে ২০২৬'- উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, 'দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেপজা গত ৪৫ বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। বেপজার এই অবদান শুধু বিনিয়োগ আকর্ষণ ও রপ্তানিতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মূল স্রোতধারায় নিয়ে এসে স্বনির্ভর করে তুলেছে। বিশেষত কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে নারীদের ক্ষমতায়নে বেপজা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।'
তিনি আরও বলেন, 'এছাড়াও বেপজা জোনগুলোতে আধুনিক হাসপাতাল ও স্কুল স্থাপনের মাধ্যমে শ্রমিক কল্যাণেও বেপজা অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।'
