সুইস গেরো কাটিয়ে শেষ ষোলোয় নেইমারবিহীন ব্রাজিল
রেকর্ড পক্ষে ছিল না, দলে ছিলেন না প্রাণভোমরা নেইমার। খেলায় ব্রাজিলীয় ছন্দও মিলছিলো না। এর মধ্যে অফসাইডে একটি গোল বাতিল হওয়ায় আত্মবিশ্বাসেও পড়েছিল টান। কিন্তু চাপ, পুরনো রেকর্ড; সবকিছু দূরে সরিয়ে দ্বিতীয়ার্ধে চেনা চেহারায় ফেরে ব্রাজিল, চলতে থাকে অবরিত আক্রমণ। সেই ধারায় হলুদ ঢেউ তুলে সাম্বার ছন্দে চোখ ধাঁধানো গোল করলেন কাসেমিরো। বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডকে প্রথমবারের মতো হারিয়ে শেষ ষোলোয় উঠলো ব্রাজিল।
সোমবার কাতারের ৯৭৪ স্টেডিয়ামে 'জি' গ্রুপের ম্যাচে সুইজারল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারিয়েছে ব্রাজিল। বিশ্বকাপে সুইসদের বিপক্ষে এটাই প্রথম জয় রেকর্ড পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। আগের দুই সাক্ষাতেই (১৯৫০ ও ২০১৮) তাদের বিপক্ষে ড্র করে মাঠ ছেড়েছিল সেলেসাওরা। ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের আসরে এবার ৭২ বছরের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইউরোপের দেশটির বিপক্ষে প্রথম জয়ের স্বাদ নিলো পেলে-রোনালডোদের দেশ।
'জি' গ্রুপ থেকে দুই জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে ব্রাজিল। এই ম্যাচে হারলেও ৩ পয়েন্ট নিয়ে দুই নম্বরেই আছে সুইজারল্যান্ড। একটি করে ড্র ও হারে এক পয়েন্ট নিয়ে যথাক্রমে তিন ও চার নম্বরে আছে ক্যামেরুন ও সার্বিয়া। নিজেদের শেষ ম্যাচে সার্বিয়ার বিপক্ষে লড়বে সুইজারল্যান্ড, এই ম্যাচে জিতলে ব্রাজিলের পর তারাই উঠবে পরের রাউন্ডে। ড্র করলেও থাকবে সুযোগ।
পুরো ম্যাচে ব্রাজিলই আধিপত্য ধরে রেখে খেলে। বল দখল, আক্রমণ সাজানোয় তারাই দাপট দেখায়। ৫৪ শতাংশ সময় বল নিজেদের পায়ে রাখেন কাসেমিরো-রিচার্লিসনরা। শিরোপা প্রত্যাশী দলটি গোলমুখে ১৩টি শট নেয়, এর মধ্যে ৫টি শট লক্ষ্যে ছিল। রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে অনেকটা সময় নিজেদের জাল অক্ষত রাখা সুইসরা সেভাবে আক্রমণই সাজাতে পারেনি। তাদের নেওয়া ৬টি শটের একটিও লক্ষ্যে ছিল না।
১২তম মিনিটে উল্লেখযোগ্য আকমণ সাজায় ব্রাজিল। লুকাস পাকেতার বাড়ানো বল পেয়ে ডান প্রান্ত দিয়ে আক্রমণে গিয়ে ডি-বক্সে ভিনিুসয়ুসকে পাস দেন রিচার্লিসিন। কিন্তু ভিনিসিয়ুসের আগেই সুইজারল্যান্ডের সেন্টারব্যাক নিকো এলভেদি এগিয়ে গিয়ে দলকে বিপদমুক্ত করেন। পরের মিনিটে কাসেমিরো, ফ্রেডের পা ঘুরে ডি-বক্সের মুখে বল পান রিচার্লিসন। কিন্তু ব্রাজিলিয়ার স্ট্রাইকার বলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেননি।
১৫তম মিনিটে আক্রমণে যায় সুইজারল্যান্ড। সুইজ ফরোয়ার্ড ব্রিল এমবোলো বল নিয়ে ব্রাজিলের ডি-বক্সের দিকে এগিয়ে যান। কিন্তু তার আক্রমণ সহজেই প্রতিহত করেন কাসেমিরো। ১৯তম মিনিটে সূবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেন রিচার্লিসন। ভিনিসিয়ুসের পাস থেকে বল পেয়ে বাঁ পাশ দিয়ে আক্রমণে যান পাকেতা। ডি-বক্সে থাকা রিচার্লিসনের উদ্দেশ্যে দারুণ এক ক্রস দেন তিনি। পা ছোঁয়ালেই জালের দেখা মিলতে পারতো, কিন্তু রিচার্লিসন তা পারেননি।
২৭তম মিনিটে আরও সহজ সুযোগ নষ্ট করেন ভিনিসিয়ুস। ডান প্রান্ত থেকে রাফিনহার বাড়ানো দারুণ ক্রসে ঠিকঠাক পা দিতে পারলেই এগিয়ে যেতে পারতো সেলেসাওরা। কিন্তু ভিনিসিয়ুস কোনোমতে বলে পা ছোঁয়ান, যা ঝাঁপিয়ে পড়ে কর্নারের বিনিময়ে ফেরান সুইজারল্যান্ডের গোলরক্ষক ইয়ান সমার। ৩১তম মিনিটে ২৫ গজ দূর থেকে নেওয়া রাফিনহার শট সহজেই গ্লাভসবন্দি করেন সমার।
৩৯তম মিনিটে ব্রাজিলের ডি-বক্সে হানা দেয় সুইসরা। রিকার্ডো রদ্রিগেসের ক্রস ছোট বক্সে পান রুবেন ভার্গাস। কিন্তু তিনি শট নেওয়ার আগেই মার্কিনিয়োস ও থিয়াগো সিলভা মিলে ব্রাজিলকে বিপদমুক্ত করেন। ৪৪তম মিনিটে রাফিনহার নেওয়া দুটি কর্নার থেকে তেমন সুযোগ তৈরি করতে পারেনি ব্রাজিল। দ্বিতীয় কর্নার শটটি বেশি এগিয়ে এলে পাঞ্চ করে বল দূরে পাঠাস সুইস গোলরক্ষক সমার।
৫৪ তম মিনিটে ব্রাজিলের গোলরক্ষককে একা পেয়েই সুবিধা কাজে লাগাতে পারেননি এমবোলো। ৫৬তম মিনিটে পরিষ্কার আক্রমণ সাজায় ব্রাজিল। ফ্রেডের পাস থেকে বল পেয়ে বাঁ পাশ দিয়ে আক্রমণে গিয়ে ডি-বক্সে ক্রস বাড়ান ভিনিসিয়ুস, পা ছোঁয়াতে পারলেই জালের দেখা মিলতো। কিন্তু রিচার্লিসন পা বাড়িয়েও বলের নাগাল পাননি। ৬৪তম মিনিটে ঠিকানা খুঁজে পায় ব্রাজিল। কাসেমিরোর পাস থেকে বাঁ প্রান্ত দিয়ে আক্রমণে গিয়ে লক্ষ্যভেদ করেন ভিনিসিয়ুস। কিন্তু বলের যোগানদাতা রিচার্লিসন অফসাইড ছিলেন, ভিএআরের সাহায্য নিয়ে গোল বাতিল করেন রেফারি।
এরপর কয়েক মিনিটের ব্যবধানে কয়েকটি আক্রমণ সাজিয়ে সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেনি ব্রাজিল। ৭৩তম মিনিটে রিচার্লিসন ও রাফিনহাকে তুলে আন্তনি ও গ্যাব্রিয়েল হেসুসকে নামায় ব্রাজিল। ৭৬তম মিনিটে সুইজারল্যান্ডও পরিবর্তন আনে। ফরোয়ার্ড ব্রিল এমবোলোকে তুলে হ্যারিস সেফেরোফিসকে নামায় তারা।
দুই মিনিট পরে আসরে শুভক্ষণ। চোখ ধাঁধানো ভলিতে গোল করে ব্রাজিলকে এগিয়ে নেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার কাসেমিরো। ডি-বক্সের বাইরে থেকে বল বাড়ান রদ্রিগো, ফাঁকায় থাকা কাসেমিরো ডান পায়ের জোরালো শটে লক্ষ্যভেদ করেন। এরপর ব্রাজিলের আক্রমণের ধার বাড়ে। ৮৭তম মিনিটে রদ্রিগোর নেওয়া শট কর্নারের বিনিময়ে ফেরান সমার। যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে পাল্টা-আক্রমণ থেকে ব্যবধান বাড়ানোর দারুণ সুযোগ হাতছাড়া করেন ভিনিসিয়ুস। এরপর রদ্রিগোর চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।
