মাশরাফিকে বের করে দিও না: মাসাকাদজা
হ্যামিল্টন মাসাকাদজা। ক্রিকেট বিশ্বে পরিচিত নাম। জিম্বাবুয়ের সাবেক এই ক্রিকেটার বাংলাদেশে আরও বেশি পরিচিত। আন্তর্জাতিক ম্যাচসহ ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতে বহুবার বাংলাদেশে এসেছেন জিম্বাবুয়ের সাবেক এই অধিনায়ক। গত বছর বাংলাদেশ থেকেই ক্রিকেটকে বিদায় জানানো মাসাকাদজা আবারও এসেছেন। তবে এবার তার পরিচয় ভিন্ন।
দিকহারা জিম্বাবুয়েকে পথ দেখানোর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি। জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করা মাসাকাদজা নিজ দেশের ক্রিকেট, আইসিসির নিষেধাজ্ঞা, নতুন দায়িত্ব, লক্ষ্য, বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে কথা বলেছেন।
টিবিএস: জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটে আপনার ভূমিকা নিয়ে একটু বলবেন…
হ্যামিল্টন মাসাকাদজা: আমি জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করছি। প্রশাসনিক বিভাগে যা কিছু হয়, প্রধান হিসেবে আমি সব নিয়ন্ত্রণ করি। ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট যেমন বয়সভিত্তিক, সিনিয়র দল, সাপোর্টিং স্টাফ; এসব কিছুই আমি দেখি।
টিবিএস: নতুন দায়িত্ব কতটা উপভোগ করছেন?
মাসাকদজা: এটা অবশ্যই রোমাঞ্চকর ব্যাপার। অনেক কাজ করার আছে এখানে। শেখার জন্য এটা অনেক বড় জায়গা। একজন খেলোয়াড় হিসেবে পর্দার আড়ালের অনেক কিছু আপনি জানবেন না। আপনি আসছেন এবং খেলছেন, কিন্তু জানেন না পরের ম্যাচের জন্য কী কী করতে হয়। শেখার জন্য জীবনের এই বাঁকটা আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি অনেক কিছুর সন্ধানে আছি। খেলোয়াড়রা কীভাবে ভাবছে, সেটা বুঝে ম্যাচে তা প্রয়োগ করার জন্য অনেক কিছু নিয়ে আমাকে কাজ করতে হচ্ছে।
এটা আমার কাজেরই অংশ। এখানে অনেক ভুল বোঝাবুঝির জায়গা থাকে, কারণ ছেলেরা জানে না একটা কাজের পেছনে কত পরিশ্রম দিতে হয়। ধরুন স্বার্থের কারণেই আপনাকে সূচি পরিবর্তন করতে হবে। কী কারণে এটা হলো সেটা যদি খেলোয়াড়রা না জানে, তারা বলবে কেন আমরা এই ম্যাচ খেলছি বা কেন এই খেলা বাতিল করা হলো। ছেলেরা যেন বুঝতে পারে কেন আর কী কারণে হচ্ছে, আমার কাজ এটা নিশ্চিত করা।
টিবিএস: জিম্বাবুয়ের টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে আপনার কী পরিকল্পনা? নিশ্চয়ই অনেক বেশি টেস্ট খেলানোর চেষ্টা থাকবে আপনার?
মাসাকাদজা: টেস্ট খেলুড়ে দেশ হিসেবে যত পারেন আপনাকে টেস্ট খেলতে হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি ক্রিকেটের সবচেয়ে বিশুদ্ধতম ও আদর্শের ফরম্যাট হচ্ছে টেস্ট। এটা নিয়ে বেশি চেষ্টা করতেই হবে। তবে এখানে অনেক বিষয় আছে, এটাও মাথায় রাখতে হবে। আপনি চাইলেই এটা হবে না। এটা করতে কী কী লাগবে আর কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে, এসবও মাথায় রাখতে হবে।
টিবিএস: জিম্বাবুয়ে এখন বেশ ভালো করছে। আইসিসি যে জিম্বাবুয়ের সদস্য পদ বাতিল করেছিল, সেটা কি তাহলে আপনাদের জন্য আশীর্বাদ ছিল?
মাসাকাদজা: যেকোনো খারাপের মাঝেও কিছু ইতিবাচক বিষয় থাকে। অবশ্যই অনেক খারাপ ঘটনা ঘটেছে। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে আমরা অনেক কিছু হারিয়েছি। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে পারব না, মেয়েরা তাদের বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি। অনেক খারাপ হয়েছে আমাদের সাথে।
তবে এটা আমাদের গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগও তৈরি করে দিয়েছে। সুযোগ হয়েছে আমাদের সিস্টেমে নতুন করে দৃষ্টি দেওয়ার। কীভাবে আমরা আমাদের কাজ করি বা করেছি সেটা নুতন করে দেখার সুযোগ হয়েছে। অনেক খারাপের ভীড়ে কিছু ভালো জিনিস পেয়েছি আমরা, যা দিয়ে আমাদের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারব।
টিবিএস: আপাতত আপনার লক্ষ্য কী?
মাসাকাদজা: সব সময়ই স্বল্প, মাঝারি এবং দীর্ঘমেয়াদীর লক্ষ্য থাকে। আমরা আপাতত পরবর্তী বিশ্বকাপে সুযোগ করে নেওয়ার জন্য মাঝারি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। পরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও এটার অংশ, যা কয়েক বছর পরে থাকবে। আপাতত এসবই আমাদের লক্ষ্য। অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় এবং তাদের উন্নতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে আমরা কাজ করব। আমার মনে হয় আমরা যদি আমাদের পরিকল্পনা মতো এগোতে পারি, ভবিষ্যতে অনেক খেলোয়াড় পাব।
টিবিএস: শ্রীলঙ্কাতে ভালো করে এসেছে জিম্বাবুয়ে। বাংলাদেশে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি আপনাদের দল। সামনের কয়েক ম্যাচের জন্য কীভাবে ভাবছেন?
মাসাকাদজা: সবাই জেতার জন্যই খেলে সব সময়। খেলতে নামার আগে ভালো করার মানসিকতাই থাকে সবার। বাংলাদেশে আমরা একটু পিছিয়ে। তবে এর আগে শ্রীলঙ্কাতে আমরা ভালো করে এসেছি। এখানেই সব শেষ নয়। এ কারণে আমরা স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে দলের উন্নতিতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। সামনের দিকে তাকিয়ে আমরা। এটা বড় ব্যাপার, বোর্ডের পক্ষ থেকে আমাকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। এই মুহূর্তে তারা আমাকে অনেক কিছু করার সুযোগ দিচ্ছে। এটা আমাকে খুবই অনুপ্রাণিত করছে।
টিবিএস: আপনাদের দলের বেশ কয়েকজন সিনিয়র ক্রিকেটার ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে। এটা কি জিম্বাবুয়ের গোল্ডেন জেনারেশন শেষ হওয়ার অধ্যায়?
মাসাকাদজা: একটা সময়ের মধ্যে যেতেই হবে, এটা কঠিন হবে। আমাদের বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে। তাদের জায়গায় আমাদের ক্রিকেটার আনতে হবে। এতে কিছুটা গতি কমবে আমাদের। তবে ইতোমধ্যে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা পরিকল্পনা করেছি।
টিবিএস: নতুন দায়িত্ব নিয়ে অনেক কাজ করছেন। এসব কাজ করার পথে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন?
মাসকাদজা: সবখানেই চ্যালেঞ্জ থাকবে। আমি নতুন পদে নতুন চাকরি নিয়েছি। তবে আমার জন্য এতটা চ্যালেঞ্জ নেই, কারণ আগেই বলেছি বোর্ডের পক্ষ থেকে আমাকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। তারা আমার কাজ সহজ করে দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলি, ক্রিকেটাররা যদি আমাকে সাহায্য না করে, তাহলে আমার কাজ কঠিন হয়ে যাবে।
টিবিএস: ক্রিকেটারদের কতটা বুঝতে পারছেন? কীভাবে কাজ করতে হবে, সেই রাস্তা পেয়ে গেছেন?
মাসাকাদজা: কোন খেলোয়াড়ের কী লাগবে এ সম্পর্কে আপনার ধারণা থাকতে হবে। বুঝতে হবে খেলোয়াড়রা কী সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। খেলোয়াড়দের সামনে এগিয়ে নিতে কী করতে হবে, এসব প্রশ্ন আমার মাথায় এসেছে। সেই ধারণা আমার হয়ে গেছে ইতোমধ্যে।
টিবিএস: এক সময় বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে কাছাকাছির দল ছিল। এখন দুই দলের মধ্যে বেশ ব্যবধান। জিম্বাবুয়ে পিছিয়ে গেছে নাকি বাংলাদেশ বেশি এগিয়ে গেছে?
মাসাকাদজা: অবশ্যই বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে। আগে যেসব দেশকে হারাতে পারেনি, বাংলাদেশ এখন সেসব দেশকে হারাচ্ছে। তারা অনেক উন্নতি করেছে। আফগানিস্তানও বেশ উন্নতি করেছে।
টিবিএস: অনেক ক্রিকেট খেলেছেন এই দেশে। মাশরাফিকে কাছ থেকে দেখেছেন। মাশরাফিকে নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
মাসাকাদজা: মাশরাফি বাংলাদেশের জন্য দারুণ কাজ করেছে। সে যা করেছে, সেই অনুযায়ী প্রশংসা পায়নি। আমরা প্রায় একই সময়ে ক্যারিয়ার শুরু করেছি। সে বাংলাদেশের সত্যিকারের বাঘ। আমি একটি মৌসুম তার সঙ্গে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেছি। সে সময় তার গল্প শুনেছি, তার পেছনের কথা জেনেছি। শুনেছি কতটা লড়াই করে আসতে হয়েছে তাকে।
আমার মনে হয় সে এখনও বাংলাদেশের জন্য সেটা মাঠে করে যাচ্ছে। এটা আমাকে আমার জীবনে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে। আমার মতে সে বাংলাদেশ ক্রিকেটের উজ্জ্বল নক্ষত্র। আমি তাকে অনেকবার বলেছি এবং আমার আশা সে তার জীবনের গল্প নিয়ে বই লিখবে- যা অনেক মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে।
টিবিএস: মাশরাফির অবসর ইস্যুতে আপনার মতামত কী?
মাসাকাদজা: আমার মনে হয় না এটা মাশরাফিকে বিদায় জানানোর সময়। আমার মনেহ য় অধিনায়কত্ব থেকে সরে আসার সময় হয়েছে তার। তবে আরও কয়েক বছর সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে পারে, সেই সামর্থ্য তার আছে এখনও। বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য সে যা করেছে, তাকে বরে করে দেওয়া উচিত হবে না। এই সিদ্ধান্ত কেবল তার কাছ থেকেই আসা উচিত। তবে এখানে একটা জিনিস ভালো হতে পারে, সেটা হচ্ছে সে অধিনায়কত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে পারে। তবে তার বাংলাদেশের জন্য খেলে যাওয়া উচিত এবং বাংলাদেশের হয়ে খেলার মতো সব সমার্থ্য তার আছে।
