লিওনেল মেসি: মহাকালের প্রলয়
বারবার স্বপ্নের হাত ছোঁয়া দূরত্বে এসে শূন্য হাতে ফিরে যেতে হয়েছে তাকে। তিনি হেরেছেন ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল, ২০১৫, ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনাল। হার তাকে করেছে আরো শক্ত, শাণিত, দৃঢ়। ২০২১ কোপা আমেরিকা জিতে ভেঙেছেন আন্তর্জাতিক শিরোপা না জেতার খরা। এবার কী তবে পরম আরাধ্য বিশ্বকাপ?
যা দেখাচ্ছেন তাতে প্রত্যাশা করাই যায়, ফাইনালটাও হবে লিওনেল মেসিময়। সেমি-ফাইনালে আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলে হুলিয়ান আলভারেজকে সহায়তা করার আগে প্রায় অর্ধ-মাঠ সাথে ক্রোয়াট ডিফেন্ডার নিয়েই দৌড়ালেন, বয়স হয়ে গেছে ৩৫। গতি নেই আগের ধারেকাছেও, ধারটাও যেন কিছুটা কমে গেছে। কিন্তু এইবেলা যা করলেন তিনি, তাতে বয়স, শারীরিক অবস্থা সবকিছুকে তুচ্ছই মনে হচ্ছে।
কোয়ার্টার-ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২-০ গোলে এগিয়ে থেকে শেষ মুহূর্তে গোল খেয়ে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গিয়েছিল, টাইব্রেকারে নায়ক হয়ে শেষ রক্ষা করেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। সেমি-ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ৭২ মিনিট পর্যন্ত ২-০ এগিয়ে থেকেও তাই স্বস্তিতে ছিল না আর্জেন্টিনা। সেটি ফেরানোর দায়িত্ব নিজের 'পায়ে' তুলে নিলেন মেসি।
নিজের অর্ধ থেকে বল গ্রহণ করে সাথে লেগে থাকা জসকো গাভারদিওলকে একবার এদিক, আরেকবার ওদিক, একবার সামনে তো আরেকবার পেছনে কয় পাক খাওয়ালেন, সে এক তিনি আর সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দর্শকেরাই ভালো বলতে পারবেন। গাভারদিওলের বলতে পারার কথাও না, মাথা নিশ্চয়ই ঘুরপাক খাচ্ছিল তার।
এই চরকির মতো প্যাঁচ খাটানো আর ঘূর্ণিপাক দেখে কে বলবে যে লোকটার বয়স ৩৫ পেরিয়ে ছমাস! যাকে গোত্তা খাওয়ালেন সেই গাভারদিওলের বয়স মোটে ২০, এবারের বিশ্বকাপের সেরা ডিফেন্ডারের তকমা পেয়েছেন অনেকের কাছ থেকেই। ক্লাব ফুটবলের বাজারেও তার দর এখন আকাশছোঁয়া।
তাতে মেসির বয়েই গেল। ক্যারিয়ারে নামীদামী কতশত ডিফেন্ডারের ঘুম হারাম করে দিয়েছেন, গাভারদিওল আর এমন কী! অবশ্য ম্যাচের আগে ক্রোয়াট ডিফেন্ডারকে নিয়ে এত কথা শুনে হয়তো তাকে একবার হলেও 'দ্যা টেস্ট অফ মেসি ম্যাজিক' দিবেন বলে ভেবেছিলেন মেসি। হয়তো ভাবেননি, সেমি-ফাইনাল ম্যাচের আগে প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড় নিয়ে অতশত ভাবার সময় মেসির নেই।
তবে এক খেলোয়াড় নিয়ে ভাবতে চায়নি ক্রোয়েশিয়াও। সংবাদ সম্মেলনে ক্রোয়াট খেলোয়াড়দের 'মেসি একাই আর্জেন্টিনা' নন বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলাটাই ইঙ্গিত দিচ্ছিল এই ম্যাচে মেসি কী সেটা তারা হাড়েহাড়ে টের পাবেন। অস্ট্রেলিয়া আর নেদারল্যান্ডসের খেলোয়াড়েরাও যে একই ভুলটা করেছিলেন! ফলাফল চোখের সামনেই ছিল, সেখানেই ক্রোয়েশিয়ার নামটাও যোগ করে নিলেন মেসি।
ফাইনালে ফ্রান্স অথবা মরক্কোর যে দলই উঠুক, অন্তত এভাবে প্রকাশ্যে 'মেসিকে ভয় পাই না', এ ধরণের কথা বলতে আসবেন না, সেটা নিশ্চিত। আর যদি বলেও ফেলেন, তাহলে উদাহরণগুলো চোখের সামনেই দেওয়া রইল।
যে যাই বলুক, মেসি নিজে নিশ্চিত করেছেন যে এটিই তার শেষ বিশ্বকাপ। সেটি তিনি জিতে বিদায় নিন আর না জিতেই নিন, বিশ্বকাপে আর পড়বে না মেসির পদচিহ্ন। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আসতে আসতে তার বয়স দাঁড়াবে ৩৯ পেরিয়ে ৪০ এর শুরুতে। তখন ক্র্যাচে ভর দিয়ে মাঠে নামার ইচ্ছে নিশ্চয়ই তার নেই।
যেহেতু তিনি জানতেন এটি তার শেষ সুযোগ, ক্যারিয়ারের একমাত্র অপবাদ ঘোচানোর সর্বশেষ যুদ্ধ, ম্যারাডোনার একা বিশ্বকাপ জেতানোর গল্পের পাশে নিজের গল্প লেখার অন্তিম পর্ব, মেসিকে যে তার সেরাটা দিতে হতোই। সে যতোই বয়স বাগড়া দিক না কেন।
সৌদি আরবের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হারের পর হইচই পড়ে গেল চারিদিকে। গেল গেল রব! পরের দুই ম্যাচ না জিতলেই নয়। প্রতিপক্ষও যেনতেন নয়, কীভাবে কী হবে? 'মেসি' হলো, মেক্সিকোর বিপক্ষে যে মুহূর্তের জন্ম দিলেন, সেখান থেকে যে অনুপ্রেরণা পেল গোটা আর্জেন্টিনা দল, আর ঠেকায় তাদের সাধ্য কার! পরের ম্যাচে পোল্যান্ডের বিপক্ষে নিজে পেনাল্টি মিস করলেও সতীর্থরা মেসির জন্যই ম্যাচটা জিতলেন। এতদিন শুধু মেসিই দিয়ে গিয়েছেন, এবার তাকে একটু হলেও ফিরিয়ে দিলেন বাকিরা।
ওই একটা পেনাল্টি মিস, এরপর গা ঝাড়া দিয়ে উঠা। মেসি জানতেন, আরেকটু হলেই ফসকে যেতে পারতো সোনালি ট্রফি পাওয়ার স্বপ্নটা। তাই নক-আউটে উঠেই সেই 'ভুল'র প্রায়শ্চিত্ত করতে শুরু করলেন। শেষ ষোলোয় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ট্রেডমার্ক 'ওয়ান টাচ' আদান-প্রদানে কোণাকুণি শটে ফিনিশ, পুরো ম্যাচে অজিদের মাস্টারক্লাস নিলেন।
কোয়ার্টার-ফাইনালে তাকে আটকানোর ছক কষে নামা ডাচদের বুঝিয়ে দিলেন তিনি মাঠেই জবাব দিতে পছন্দ করেন, যে পাসে মলিনাকে গোলের সামনে ছেড়ে দিলেন, সেটি পাবলো পিকাসোর তুলির আঁচড়ের থেকে কম কিছু নয়। পেনাল্টি থেকে নিজে গোল করলেন, টাইব্রেকারের প্রথম শটে গোল করে দলের উপর থেকে চাপ কমালেন, যোগ্য নেতা যাকে বলে।
আর সেমি-ফাইনালে যা করলেন তা তো শব্দে আটকানো সম্ভব না, যদিও উপরে চেষ্টা করা হয়েছে কিছু একটা দাঁড় করানোর। কিন্তু কিছুই যে বোঝানো যায়নি সেটি নিয়েও সন্দেহ নেই। আপনি যদি না দেখে থাকেন, ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে মেসি কী করেছেন, কোনো শব্দ বা লিখা দিয়ে সেটি বোঝানোর সামর্থ্য কারোর নেই। না, তিনি বিশ্বকাপ জিতে ফেলেননি। জিতবেনই, সেটিও বলা যাচ্ছে না। কিন্তু যদি না জিতেন, তাতেও কাতারে যা করেছেন, সেটি মুছে যাবে কী করে?
২০০৬ বিশ্বকাপে ৩৪ বছর বয়সী জিনেদিন জিদান ফিরে এসেছিলেন ফ্রান্সের ডাকে। প্রায় একা হাতেই দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন ফাইনালে। সেখানে সেই 'বিখ্যাত' ঢুস কাহিনি। ফাইনালটা নিজের রঙে রাঙাতে পারেননি শেষ পর্যন্ত। কিন্তু জিদানের সেই বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স ফুটবল ফোকলোরের অংশ।
কাতার বিশ্বকাপে মেসির পারফরম্যান্স পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো অসম্ভব। যদিও পরিসংখ্যান বলে, ৬ ম্যাচে ৫ গোল এবং ৩ টি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি। সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও শীর্ষে এখন মেসি। তার সমান ৫ গোল করলেও, গোলে সহায়তা করার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ২০১৪ বিশ্বকাপের পর আবারও বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল জেতার দৌড়েও সবথেকে এগিয়ে মেসি।
বিশ্বকাপের ৯২ বছরের ইতিহাসে এর আগে দুইবার গোল্ডেন বল জেতেনি কেউ, একই বিশ্বকাপে গোল্ডেন বল এবং গোল্ডেন বুট জেতার নজির আছে কেবল একটি, ১৯৮২ বিশ্বকাপে ইতালির হয়ে এই কীর্তি গড়েন পাওলো রসি।
এই গেল পরিসংখ্যানের হিসাব। কিন্তু মেক্সিকোর বিপক্ষে তার গোলের পর আর্জেন্টিনার জিইয়ে উঠা, শেষ ষোলোয় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মাঝামাঠ থেকে বল নিয়ে পুরো দলকে নাচানো, কোয়ার্টার-ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে হৃদপিন্ড ছিঁড়ে ফেলা সেই পাস আর নিজের গোলের পর সেই উদযাপন, পুরো ম্যাচে ঠান্ডা মুখভঙ্গি, সেমি-ফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে ঘূর্ণিধাঁধায় ঘোরানো, এসব কীভাবে পরিসংখ্যান দিয়ে দেখাতে পারবে কেউ!
আসলে লিওনেল মেসি মানে কী? মেসি মানে একটা বিশ্বকাপ না জিততে পারা হতাশা না, মেসি মানে স্বপ্ন, মেসি মানে হৃদয়, মেসি মানে অসম্ভব কে সম্ভব করা। মেসি মানে প্রবল পরিশ্রম, মেসি মানে নিজের স্বপ্নকে মরে যেতে না দিয়ে স্বপ্নের পিছু ধাওয়া করা। মেসি মানে এক ঝলক মুক্ত বাতাস, মেসি মানে হাজার রাত জেগে থেকে সবুজ ঘাসে ঘূর্ণিধাঁধা দেখার প্রত্যাশা। মেসি মানে হারতে ঘৃণা করা, মেসি মানে জেতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। মেসি মানে সৌন্দর্য, মেসি মানে মায়াবী বিভ্রম।
পরিসংখ্যানে কুলাবে না বলেই লিওনেল মেসিকে শব্দে বাঁধার চেষ্টা বৃথা। এই লেখায় অবশ্য তাই করা হয়েছে, কিন্তু উদ্দেশ্য সফল নয়।
ফাইনালে হয়তো তিনি জিতবেন, রূপকথার মতোই পূর্ণতা পাবে তার ক্যারিয়ার। হয়তো তিনি জিতবেন না, হয়তো আরেকবার তিনি হবেন ট্র্যাজিক হিরো। কিন্তু একজন লিওনেল মেসি, তার মোহ, মানুষের মনে তার স্পর্শ, সবুজ মাঠে প্রতিপক্ষকে লাটিমের মতো চারপাশে চক্কর খাওয়ানো, এসব কিছুই অমর করে রাখবে তাকে।
তিনি যে এক অশান্ত সমুদ্র, যার ঢেউ কখনো থামবার নয়। তিনি হাজারো 'সত্যিকারের' রূপকথার গল্পের নায়ক, তিনি লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।
