অধিনায়কদের কাছেও সেরা অধিনায়ক মাশরাফি
পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষী, এমন স্বীকারোক্তি কজন মানুষের ভাগ্যে জোটে। ক্রিকেট ইতিহাস অতীত থেকে বর্তমানে পা রেখে সুদুর ভবিষ্যতেও হবে একমত। অধিনায়কদের 'অধিনায়ক' হতে পারেন সেই ক্ষণজন্মা মানুষ, যার তুলনা কেবল তিনি। মাশরাফি বিন মুর্তজার মনের ভেতরে কিছু না কিছু আক্ষেপ থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের অধিনায়ক হিসেবে অনেক অগ্রজের প্রশংসিত শব্দমালার সঙ্গে কুর্নিশও পাচ্ছেন মাশরাফি। বাংলাদেশের ইতিহাসের পেছনের অধিনায়করা এই একটি জায়গায় পুরো একমত; মাশরাফি 'অধিনায়কদেরও অধিনায়ক।'
বৃহস্পতিবার অধিনায়কত্ব ছাড়া মাশরাফিকে নিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন সাবেক অধিনায়ক।
খালেদ মাহমুদ সুজন, সাবেক অধিনায়ক (২০০৩-০৩)
সন্দেহাতীতভাবে সে বাংলাদেশের সেরা অধিনায়ক। ওর রেকর্ডই এটা বলে। আর একটা কথা আছে অধিনায়ক হিসেবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া, সেই নেতৃত্ব মাশরাফি দিয়েছে। দলকে একাত্ম করে রাখা, সবকিছু ঠিক করে রাখা, ওর মধ্যে এটা খুব করে ছিল। আমার মনে হয় মাশরাফি দারুণ একটা অনুপ্রেরণা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য। এত ইনজুরি থাকা সত্ত্বেও যেভাবে ও খেলেছে, দলের প্রয়োজনে চেষ্টা করেছে শতভাগ দিয়ে। সব মিলয়ে অসাধারণ একজন অধিনায়ক মাশরাফি। বাংলাদেশকে অনেক অর্জন এনে দিয়েছে সে। খেলোয়াড় হিসেবে এনে দিয়েছে, আবার অধিনায়ক হিসেবেও এনে দিয়েছে। সুতরাং এক কথায় বলতেই হবে যে, বাংলাদেশের সেরা অধিনায়ক মাশরাফি।
তবে এটা চিরন্তন সত্য যে, আপনি সারা জীবন খেলতে পারবেন না। একটা সময় না একটা সময় কাউকে নেতৃত্বে আসতেই হবে। মাশরাফির আগেও অনেকে অধিনায়ক ছিলেন। হাবিবুল বাশার সুমন ভালো অধিনায়ক ছিলেন। আকরাম ভাই, দুর্জয়, বুলবুল ভাইরা পরিবর্তন এনেছেন। এর পর আমিও ছিলাম। মাশরাফি অনেকদিন নেতৃত্ব দিল। এখন একটা পরিবর্তন আসবে এটাই স্বাভাবিক। তবে মাশরাফিকে সবাই মিস করবে। আশা করি যে পরবর্তী অধিনায়ক হবে, মাশরাফির চেয়ে ভালো অধিনায়ক হবে। মাশরাফির কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে দেশকে নেতৃত্ব দেবে, বাংলাদেশকে ম্যাচ জেতাবে, দেশকে অনেক উপরে নিয়ে যাবে, এটাই আমরা সবাই আশা করি।
হাবিবুল বাশার, সাবেক অধিনায়ক (২০০৪-০৭)
বাংলাদেশের হয়ে খেলাটাই তো বড় সম্মানের ব্যাপার। অধিনায়কত্ব তো অবশ্যই বড় সম্মান। সবচেয়ে বড় সম্মান যদি বলেন সে রকম। অনেক দিন থেকে দলকে নেতৃত্ব দেওয়া সহজ কাজ না। কষ্ট বলব না। সবাই তো চায় দলকে নেতৃত্ব দিতে। মাশরাফি দলের হয়ে সেরাটা দিয়েছে। দলটাকে বদলে দিয়েছে। আমাদের জেতার হার দেখেন, অনেক বেশি। যখন একটা দলে অনেক তারকা থাকে, তখন সেই দলকে নেতৃত্ব দেওয়া সহজ না। তারকা থাকলে খেলাটা সহজ হয়ে যায়, কিন্তু তারকাদের নিয়ে একসঙ্গে খেলাটা কিন্তু কঠিন। মাশরাফি এই কাজটা খুব ভালো মতো করে এসেছিল এতদিন। ও খেলাটা ছাড়ছে না, নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যেই থাকছে। ওর অধিনায়কত্বটা অবশ্যই মিস করব। অধিনায়ক মাশরাফি আমার দেখা অন্যতম সেরা অধিনায়ক।
নাঈমুর রহমান দুর্জয়, সাবেক অধিনায়ক (২০০০-০১)
ওর পারফরম্যান্সই ওর হয়ে কথা বলে। ভালো নেতা হিসেবে সে সব সময় নেতৃত্ব দিয়েছে। ওর অনেক ইনজুরি সমস্যা ছিল, তারপরও ও বারবার ফিরে এসেছে। নেতৃত্বগুণ সবার মধ্যে থাকে না। ওর মধ্যে এটা অনেক বেশি ছিল। এর পাশাপাশি সে অত্যন্ত ভালো মনের মানুষও। অধিনায়কের যে মূল কাজটা, অন্যদের কাছ থেকে সেরা পারফরম্যান্সটা বের করে নেওয়া, সেই ব্যাপারে সে সফল।
কাউকে না কাউকে দায়িত্ব ছাড়তে হবে আবার কাউকে দায়িত্বে আসতে হবে। ওর কাছ থেকে দায়িত্ব সামলানোর ব্যাপারগুলো বাকিরা শিখে নিতে পারে। হয়তো একটু সময় লাগবে, কিন্তু হয়ে যাবে আস্তে আস্তে।
খালেদ মাসুদ পাইলট, সাবেক অধিনায়ক (২০০১-০৬)
অসাধারণ একজন খেলোয়াড় সে। ১৮ বছর বাংলাদেশকে সার্ভিস দেওয়া কম ব্যাপার না। যদিও মাঝে ইনজুরি ছিল অনেক। কিন্তু যোদ্ধা হিসেবে সে অসাধারণ। ১৮ বছর খুব সামনে থেকেই সে ক্রিকেট খেলেছে। দুর্ভাগ্যবশত ইনজুরির কারণে অনেক ম্যাচ মিস হয়েছে তার। খুব ভালো লিডারকে মিস করব আমরা। অসম্ভব একজন ভালো লিডারকে মিস করব আমরা। মাঠের একজন সত্যিকারের নেতাকে মিস করব। তার নেতৃত্বে অনেক ভালো ভালো অর্জন এসেছে। বিপিএল বা প্রিমিয়ার লিগ বলেন, সে চ্যাম্পিয়নশিপ নিয়ে এসেছে তার নেতৃত্বে। অধিনায়ক হিসেবে ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক সবখানেই সে ভালো পারফর্ম করেছে। তার জায়গা পূরণ হবে, এটা বলা কঠিন। আমি বলব খুব উঁচু মানের খেলোয়াড় সে। বাংলাদেশ বলে যে জায়গাটা তার পাওয়া উচিত ছিল, সেই জায়গাটা সে পায়নি। সাকিব, তামিম, মুশফিকদের মতো আরও কিছু ভালো খেলোয়াড় দলে থাকলে সে আরও বড় অর্জন নিয়ে আসতে পারত।
একজন খেলোয়াড় যতক্ষণ পর্যন্ত উপভোগ করবে, ততক্ষণ খেলবে। সিদ্ধান্তটা তার। সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা সবাইকে দিতেই হবে। সে যেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমি সাধুবাদ জানাই। মাঠে সে সুন্দর একটা জীবন সে পার করেছে, সৎ মাশরাফিকে দেখেছে সবাই। তাই তার কাছে একটাই আশা থাকবে, পরবর্তী জীবনেও যেন সে এভাবে মানুষকে সার্ভিস দেয়। মাঠের বাইরেও মাশরাফির কাছ থেকে সেটা আশা করে মানুষ। সে এখন রাজনীতিতে। তবে শুধু তার এলাকার মাশরাফি নয়, দেশের মাশরাফি হয়ে যেন সে থাকতে পারে। ক্রীড়াঙ্গনে তার বিশাল একটা ভূমিকা আছে। এখন রাজনীতিতে তার বড় বড় কাজ করার সুযোগ আছে। সেখানেও সে যেন ওইভাবে নেতৃত্ব দেয়। যেন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে সুস্থ ধারায় নিয়ে আসতে পারে।
ফারুক আহমেদ, সাবেক অধিনায়ক (১৯৯৪-৯৪)
আমার মনেহয় মাশরাফি বাংলাদেশকে ভিন্ন একটা উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এটা সবাইকে স্বীকার করতে হবে। আমরা একটা পর্যায়ে খেলেছি। আমি প্রধান নির্বাচক ছিলাম তখন আমরা ম্যাচ জিতেছি, ২০০৭ সালে আমরা ভারতকে হারিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলেছি, ওখানে হাবিবুল বাশার অধিনায়ক ছিল। তবে বাংলাদেশ দল যে বিশ্ব ক্রিকেটে ওয়ানডেতে শক্তিশালী একটা দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এর পেছনে মাশরাফির অবদান অনস্বীকার্য। মাঠ এবং মাঠের বাইরে সে দলটাকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। জাতি হিসেবে আমাদের অনেক আনন্দের এবং গর্বের জায়গায় নিয়ে গেছে সে তার অধিনায়কত্ব দিয়ে। কিন্তু একটা সময় বিদায় বলতেই হয়। দুনিয়ার যতো গ্রেট খেলোয়াড়ই হোক না কেন, সবাইকে বিদায় বলতে হয়।
আর মাশরাফির এখন আরেকটা পেশাও আছে। সে এখন আমাদের জনপ্রতিনিধি। আমি আশা করব সে ওখানে মানুষের জন্য কাজ করবে। তাকে আমরা মিস করব কিন্তু এটা স্বাভাবিক। একটা খেলোয়াড়ের জীবনে এই সময়টা আসবেই। আমার মনে হয় এটাই ঠিক সময় সে চিন্তা করেছে। আরও কিছুদিন থাকলে ভালো হতো কিন্তু সে যেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার সিদ্ধান্তকে আমরা সাধুবাদ জানাই।
মোহাম্মদ আশরাফুল, সাবেক অধিনায়ক (২০০৭-০৯)
অধিনায়ক হিসেবে তো সে অসাধারণ করেছে। আমার পরই ও অধিনায়কত্ব পেয়েছিল ২০০৯ সালে। কিন্তু ইনজুরির কারণে লম্বা সময় অধিনায়কত্ব করতে পারেনি। আবার পেয়ে আবার ইনজুরি হয়েছে। ও সব সময়ই টিম ম্যান হিসেবে ছিল এক নম্বর। আমি আর ও রুমমেট ছিলাম। বন্ধু ছিলাম, এক সাথে থাকতাম। কিন্তু ও যে এত বড় অধিনায়ক হবে, এটা আসলে আমি চিন্তা করিনি। সবাই ওকে পাগলা হিসেবে চিনত। আগে অধিনায়কত্ব নিয়ে ইনজুরিতে পড়ে গিয়েছিল। তারপর ২০১৪ থেকে যে অধিনায়কত্বটা করল, এটা অসাধারণ। ওর জায়গা পূরণ করা আসলেই খুব কঠিন। যারা ব্যাটে-বলে পারফর্ম করতে পারে, তাদের জন্য অধিনায়কত্ব করাটা সহজ হয়। মাশরাফি পারফর্মার, এই জন্য ওর অধিনায়কত্বের রেকর্ড ভালো।
