যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর একজনের মরদেহ উদ্ধার, রুমমেট গ্রেপ্তার
যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজ হওয়া বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল লিমনের (২৭) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার ফ্লোরিডার টাম্পা বে এলাকার একটি সেতুতে তার মরদেহ পাওয়া যায়। এই ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে লিমনের রুমমেটকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে নিখোঁজ হওয়া আরেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা বৃষ্টির এখনো কোনো খোঁজ মেলেনি।
সাউথ ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটির (ইউএসএফ) পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি গত সপ্তাহ থেকে নিখোঁজ ছিলেন। শুক্রবার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজে লিমনের মরদেহ পাওয়া গেলেও বৃষ্টির এখনো কোনো খোঁজ মেলেনি বলে জানিয়েছে হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ অফিস।
শেরিফ চ্যাড ক্রনিস্টার এক বিবৃতিতে বলেন, 'এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি ঘটনা। এটি আমাদের কমিউনিটিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে এবং যারা এই দুজনের নিরাপদে ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন, তাদের জন্য এটি বড় ধাক্কা।'
চিফ ডেপুটি জোসেফ মাউরের জানান, পারিবারিক সহিংসতার এক অভিযোগ পেয়ে শুক্রবার সকালে লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘারবিয়েহকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৬ বছর বয়সী আবুঘারবিয়েহ নিজেও ইউএসএফের সাবেক ছাত্র।
শেরিফ অফিস এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, আবুঘারবিয়েহর বিরুদ্ধে মারধর, বেআইনিভাবে আটকে রাখা, প্রমাণ নষ্ট করা, মৃত্যুর খবর না জানানো এবং বেআইনিভাবে মরদেহ সরানোর অভিযোগ আনা হয়েছে।
গত ১৭ এপ্রিল লিমন ও বৃষ্টির নিখোঁজ হওয়ার কথা জানিয়ে পুলিশের দ্বারস্থ হন তাদের এক বন্ধু। বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এর আগের দিন ক্যাম্পাসের আশপাশেই তাদের শেষবার দেখা গিয়েছিল।
মাউরের জানান, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক এখনো লিমনের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করছেন। উইকেন্ডে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া যেতে পারে।
বৃষ্টির খোঁজ পেতে তল্লাশি ও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। ইউএসএফের প্রেসিডেন্ট মোয়েজ লিমায়েম জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের পরিবার ও প্রিয়জনদের পাশে থাকতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে।
তদন্তকারীদের নজরে ছিলেন রুমমেট
শুক্রবার গ্রেপ্তারের আগেও আবুঘারবিয়েহকে অন্তত দুবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শুরুতে তিনি কর্তৃপক্ষকে তথ্য দিলেও বৃহস্পতিবার পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি সহযোগিতা করা বন্ধ করে দেন বলে জানান মাউরের।
চিফ ডেপুটি জানান, শুক্রবারের মধ্যেই তদন্তকারীরা এই ঘটনা এবং লিমনের মরদেহের সঙ্গে আবুঘারবিয়েহকে যুক্ত করার মতো প্রমাণ পেয়ে যান।
শেরিফ অফিস জানায়, গ্রেপ্তারের সময় আবুঘারবিয়েহ একটি বাড়ির ভেতর দরজা বন্ধ করে অবস্থান নেন। পরিস্থিতি সামলাতে সোয়াট টিম এবং মধ্যস্থতাকারীদের ডাকতে হয়। গ্রেপ্তারের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বাড়ির সামনে একটি সাঁজোয়া যান দাঁড়িয়ে আছে। আর আবুঘারবিয়েহ কোমরে শুধু একটি তোয়ালে পেঁচিয়ে দুই হাত ওপরে তুলে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসছেন।
পারিবারিক বাড়িতেই আবুঘারবিয়েহকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে তার ভাইয়ের করা পারিবারিক সহিংসতার এক অভিযোগের ভিত্তিতে ওই বাড়িতে তার ঢোকার ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছিল।
আদালতের নথি থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালে মারধরের অভিযোগে দুবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন আবুঘারবিয়েহ। পরে সেই অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু ওই ঘটনার একটির পর তার ভাই আদালতের কাছ থেকে একটি নিষেধাজ্ঞা (ইনজাংশন) জোগাড় করেন, যাতে আবুঘারবিয়েহ তার বা তার বাড়ির কাছে আসতে না পারেন।
আদালতের নথিতে ভাই অভিযোগ করেছিলেন, তর্কাতর্কির জেরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলায় আবুঘারবিয়েহ তাকে এবং তার মাকে আক্রমণ করেছিলেন। গত মে মাসে ওই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হলে ভাই সেটি বাড়ানোর আবেদন করেন। তবে আদালত সেই আবেদন নামঞ্জুর করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মুখপাত্র সিএনএনকে জানিয়েছেন, ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ইউএসএফ-এ ম্যানেজমেন্টে স্নাতক পড়ছিলেন এই সন্দেহভাজন।
'আমরা পাথর হয়ে যাচ্ছি'
গত সপ্তাহ থেকে দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ থাকায় ফ্লোরিডায় তাদের বন্ধু এবং বাংলাদেশে আত্মীয়রা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলেন।
লিমনের মরদেহ উদ্ধারের আগে তার ভাই জুবায়ের আহমেদ সিএনএনকে বলেছিলেন, 'এটি আমাদের জন্য ভীষণ যন্ত্রণার। আমরা পাথর হয়ে যাচ্ছি। যেকোনো কিছুই হতে পারে। আমরা শুধু সত্যিটা জানতে চাই যে তাদের কী হয়েছে। দুজন শিক্ষার্থী হঠাৎ করে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে না।'
পুলিশ জানায়, ক্যাম্পাস থেকে প্রায় তিন ব্লক দূরে লিমনের বাসস্থানে ১৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে তাকে শেষবার দেখা গিয়েছিল। ২০২৪ সালের ফল থেকে তিনি ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছিলেন।
প্রায় এক ঘণ্টা পর ক্যাম্পাসের ন্যাচারাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস ভবনে বৃষ্টিকে শেষবার দেখা যায়। তিনি গত ফলে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে রাসায়নিক প্রকৌশল (কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।
পরের দিন এক পারিবারিক বন্ধু তাদের দুজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়ে ক্যাম্পাস পুলিশকে খবর দেন।
