‘আমার স্বপ্ন চুরি করেছেন আপনারা’: গ্রেটা থানবার্গ
সুইডেনের কিশোর পরিবেশকর্মী গ্রেটা থানবার্গ বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে বলেন, ফাঁপা অর্থহীন বুলি শুনিয়ে আপনারা আমার স্বপ্ন চুরি করেছেন, কেড়ে নিয়েছেন আমার শৈশব।
সোমবার (২৩ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের (ইউএন) জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানের সময় এই কথা বলেন গ্রেটা। দৃপ্ত কণ্ঠে তিনি বিশ্ববাসীর উদ্দেশে বলেন “আপনাদের এত দুঃসাহস?”
গ্রেটা থানবার্গ শুরুতেই বলেন, “যা হচ্ছে সব ভুল। আমার তো আজ এখানে দাঁড়িয়ে থাকার কথা নয়, মহাসমুদ্রের ওপারে আমার স্কুলে থাকার কথা। অথচ আপনারা আমার কাছে এসেছেন সমাধান খুঁজতে? আপনাদের এত বড় দুঃসাহস?
এই পরিবেশকর্মী বলেন, “ফাঁপা অর্থহীন বুলি শুনিয়ে আপনারা আমার স্বপ্ন চুরি করেছেন, কেড়ে নিয়েছেন আমার শৈশব।”
“সারাবিশ্ব জুড়ে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষ মারা যাচ্ছে। আমাদের পরিবেশ আর বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আমরা মুখোমুখি হয়েছি এক বিপুল ধ্বংসের আর আপনারা কি না ছুটছেন টাকার পেছনে? অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ফাঁপা রূপকথার গল্প শোনাচ্ছেন আমাদের? আপনাদের এত দুঃসাহস?”
থানবার্গ এই সম্মেলনে উপস্থিত সবাইকে বলেন, “আপনারা কি করে ভাবলেন যে বাণিজ্য আর প্রযুক্তি দিয়ে আপনারা এই পরিস্থিতির সমাধান করতে পারবেন? এত দু:সাহস আপনাদের কি করে হয়? যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে সারা বিশ্ব জুড়ে, যে পরিমাণ কার্বন বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে, তা আর মাত্র ৮ বছরের মাথায় শেষ হয়ে যাবে। আর এই সংখ্যাগুলো, সত্যগুলো প্রকাশ করবার মতো সৎসাহস আপনাদের নেই।”
“আপনারা আমাদের ব্যর্থতায় পর্যবসিত করেছেন। কিন্তু তরুণ প্রজন্ম আপনাদের বিশ্বাসঘাতকতা ধরে ফেলেছে। আমি বলছি আমরা কখনো আপনাদের ক্ষমা করব না।”
এই ১৬ বছর বয়সী কিশোরী আরও বলেন, “সবকিছু বদলানো প্রয়োজন এবং আজ থেকে এই বদলানোর প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। বিশ্ববাসী জেগে উঠছে। আর আপনাদের ভালো লাগুক বা না লাগুক- পরিবর্তন আসবেই।”
বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশের প্রধান নিউইয়র্কের এই ইউএন জলবায়ু সম্মেলনে যোগদান করছেন। থানবার্গ এই সম্মেলনে অংশ নিতে বিমান কিংবা প্রমোদ তরণীতে নয়, নৌকায় করে নিউইয়র্কে পৌঁছান। কেননা এই ধরণের যানবাহন পরিবেশের দূষণ ঘটায়।
পরিবেশ রক্ষায় গত বছরের আগস্ট মাস থেকে ‘ইয়ুথ স্ট্রাইক’ আন্দোলন শুরু করেন সুইডিশ কিশোরী গ্রেটা থানবার্গ। শুরুটা সেখান থেকেই। জলবায়ু সংকটের বিরুদ্ধে কেন যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না—এমন প্রতিবাদ নিয়ে সে সময় স্কুুল বাদ দিয়ে টানা তিন সপ্তাহ সুইডিশ পার্লামেন্টের সামনে বসে থাকেন তিনি। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় নিজের আন্দোলনের কথা পোস্ট করেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রাম ও টুইটারে। শুরু করেন #FridaysForFuture ট্রেন্ড।
তার শুরু করা এই আন্দোলনে ধীরে ধীরে যোগ দিতে থাকে অসংখ্য মানুষ। সবার একটাই দাবি, জলবায়ু সংকট নিরসনে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে #FridaysForFuture ট্রেন্ডের মাধ্যমে স্কুলগুলোতে বিক্ষোভের আয়োজন করেছেন গ্রেটা, যেটি প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় গতবছরের ১৫ মার্চ। এদিন জার্মানি, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, জাপানসহ ১০৫টি দেশের ১,৬৫৯টি স্থানে শিক্ষার্থীরা তার ডাকে সারা দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে বিক্ষোভ ও মিছিল করে।
সুইডেন থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে যোগ দিয়ে পরিবেশ রক্ষায় মানুষের সচেতনতা গড়ে তোলার কাজ করছেন তাদের সবাই।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে এমন একটি অসাধারণ ও অসামান্য উদ্যোগ নেয়াকে সম্মান জানিয়ে ২০২০ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য তাকে মনোনীত করে নোবেল কমিটি।
২০২০ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়ে এক টুইট বার্তায় গ্রেটা জানান, ‘শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হওয়ায় আমি সম্মানিত ও কৃতজ্ঞ।’
গ্রেটা নিজেকে টুইটারে ‘১৬ বছর বয়সী অ্যাসপার্গার সিনড্রোমে আক্রান্ত’ একজন জলবায়ু কর্মী হিসেবে পরিচয় দিলেও টাইম ম্যাগাজিনের ২০১৮ সালের বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী কিশোর-কিশোরীদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।
এর আগে ২০১৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই। এখন পর্যন্ত তিনিই নোবেল পুরস্কার পাওয়া সর্বকনিষ্ঠ। তবে সুইডেনের গ্রেটা থানবার্গ এই পুরস্কার পেলে তিনিই হবেন শান্তিতে সর্বকনিষ্ঠ নোবেল বিজয়ী।
