১০ মাসের কোভিড মৃত্যুর চেয়ে ১ মাসের আত্মহত্যা বেশি যে দেশে
জাপানে পুরো বছর জুড়ে করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে যতোজন মৃত্যুবরণ করেছেন, তার চাইতে বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেছেন গত এক মাসেই।
দেশটির ন্যাশনাল পুলিশ এজেন্সির তথ্যমতে, গত অক্টোবরে দেশটিতে ২ হাজার ১৫৩ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত শুক্রবার পর্যন্ত কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু সংখ্যা ২ হাজার ৮৭।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপানে আত্মহত্যার হার কমে এলেও গত অক্টোবরে মাসিক হার আবারও বেড়ে যায়, যা মে ২০১৫ এর পর সর্বোচ্চ।
জাপান বিশ্বের অল্প কিছু দেশের মধ্যে একটি যেখানে নিয়মিত আত্মহত্যার তথ্য ও পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়। দেশটির প্রকাশিত এই তথ্য মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মহামারির প্রভাব এবং বেশি ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী সম্পর্কে অন্যান্য দেশগুলোকে ধারণা দেবে।
টোকিওর ওয়াসেদা ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক মিচিকো উয়েদা এব্যাপারে বলেন, 'আমরা লকডাউনেও ছিলাম না, অন্যান্য দেশের তুলনায় কোভিড-১৯ এ আমাদের ক্ষতিকর প্রভাবও কম পড়েছে। কিন্তু তারপরও আমাদের আত্মহত্যার হার বেড়ে গেছে। এ থেকেই বোঝা যায় নিকট ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশগুলো এধরণের পরিস্থিতির বা এরচেয়েও বাজে পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে।'
নারীদের ওপর কোভিডের প্রভাব
দীর্ঘদিন ধরেই আত্মহত্যার হারে শীর্ষে থাকা দেশগুলোর মধ্যে একটি জাপান। দক্ষিণ কোরিয়ার পরই জাপানের অবস্থান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ২০১৬ সালে প্রতি লাখে দেশটিতে আত্মহত্যার হার ছিল ১৮ দশমিক ৫। বৈশ্বিক হিসাবে প্রতি লাখে ১০ দশমিক ৬ এর চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ এ সংখ্যা।
জাপানে আত্মহত্যার হার বেশি হওয়ার পেছনের কারণও বেশ জটিল৷ দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, স্কুলের চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কুসংস্কার - সবকিছু এর ওপর প্রভাব রাখছে।
দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিগত বছরগুলোতে জাপানের আত্মহত্যার হার কমে এসেছে। ২০১৯ সালে মোট আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ২০ হাজার; যা ১৯৭৮ সালে এই হিসাব রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে সর্বনিম্ন ছিল।
মহামারির প্রভাবে এ চিত্র বদলে যেতে শুরু করেছে, নারীদের মধ্যে অস্বাভাবিক হারে আত্মহত্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত অক্টোবরে ২০১৯ সালের একই সময়ের তুলনায় নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বৃদ্ধি পেয়েছে ৮৩ শতাংশ। একই সময়ে পুরুষের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে ২২ শতাংশ। সংখ্যার হিসেবে পুরুষদের আত্মহত্যার সংখ্যা বেশি হলেও, নারীদের আত্মহত্যার হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত টোকিওর বাসিন্দা এরিকো কোবায়াশি জানান,
'জাপান নারীদের এড়িয়ে যাচ্ছে। এটি এমন ধরনের সমাজ যেখানে কোনো খারাপ পরিস্থিতিতে দুর্বল জনগোষ্ঠীকেই প্রথমে সুবিধা-বঞ্চিত করা হয়। '
আন্তর্জাতিক বেসরকারি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান কেয়ার পরিচালিত একটি গবেষণার তথ্যানুযায়ী, মহামারির সময়ে ২৭ শতাংশ নারী মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত অতিরিক্ত ঝুঁকিতে ছিলেন। সে তুলনায় পুরুষদের মধ্যে এই হার ১০ শতাংশ।
আয়ের দুশ্চিন্তা ছাড়াও সন্তানের দেখাশোনার দায়িত্ব ও স্বাস্থ্য চিন্তার কারণেও মহামারির সময় মায়েদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে ।
একান্তই আপনার স্থান
গত মার্চে কোকি ওজোরা নামের জাপানের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত হটলাইন খোলেন। ২৪ ঘন্টা চালু থাকা এ হটলাইনের নাম আনাতা নো ইবাশো (আ প্লেস ফর ইউ)। প্রতিদিন এ হটলাইনে ২ শতাধিক কল আসে এবং এর বেশিরভাগই নারী বলে জানান ওজোরা।
'অনেকেই হয়তো চাকরি হারিয়েছেন। সন্তান লালনপালনের জন্য অর্থ প্রয়োজন। এরপরই তারা আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।'
বিশ্বজুড়ে সংস্থাটির মোট ৬০০ জন ভলান্টিয়ার আছে, তবে এ সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত বলে জানান তিনি।
গত এপ্রিলে সাহায্যপ্রার্থী বেশিরভাগই ছিল সন্তান লালন পালনে হিমশিম খাওয়া নারীরা। অনেকে এমনকি নিজ সন্তানকে হত্যার চিন্তার ব্যাপারেও জানিয়েছিলেন। বর্তমানে চাকরি হারানো, অর্থনৈতিক সংকটে ভোগা বা পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের মেসেজ ও কল বেশি।
ওজোরা জানান, 'আমাকে আমার জন্মদাতা পিতা ধর্ষণ করেছে', 'আমার স্বামী আমাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে' আমি এধরনের মেসেজও পেয়েছি। মহামারির কারণে এ সংকট আরও প্রকট হয়েছে বলেও জানান ওজোরা।
শিশুদের ওপর চাপ
জাপান একমাত্র জি-৭ ভুক্ত দেশ যেখানে ১৫-৩৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ আত্মহত্যা। মহামারির পর ২০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যেও আত্মহত্যার হার বৃদ্ধি পেয়েছে।
ওজোরা জানান, মহামারির কারণে শিশুদের স্কুল, সামাজিক পরিসরের জীবন থেমে গেছে। ঘরেও নির্যাতন, দুশ্চিতা ও চাপ বেড়েছে। এমনকি ৫ বছর বয়সী কিছু শিশুও তাদের হটলাইনে কল করেছিল বলে জানান ওজোরা।
ন্যাশনাল সেন্টার ফর চাইল্ড হেলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নাহো মরিসাকি জানান, স্কুল বন্ধ থাকলেও শিশুদের পড়াশোনার চাপ আরও বেড়েছে। সেইসাথে বন্ধুদের সাথে যোগাযোগও কমে গেছে। একারণে শিশুরাও অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়ছে। সংস্থাটির পরিচালনায় এক গবেষণা থেকে উঠে এসেছে, মহামারির কারণে জাপানের ৭৫ শতাংশ শিশুদের ওপর মানসিক চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সামাজিক বাঁধা
জাপানে এখনো একাকিত্ব ও মানসিক স্বাস্থ্য জনিত সমস্যা নিয়ে আলোচনার ব্যাপারে বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়। ওজোরা জানান, এখনো হতাশায় ভোগা মানুষ সাহায্যের জন্য 'আমি জানি এভাবে সাহায্য প্রার্থনা ভালো ব্যাপার নয়, কিন্তু আমি কি একটু কথা বলতে পারি?' এভাবে আলোচনা শুরু করেন।
১৯৯০ এর দশকের অর্থনৈতিক মন্দার পর ২০০৩ সালে দেশটিতে আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়ে ৩৪ হাজারে দাঁড়ায়। বিষন্নতা ও হতাশার ব্যাপারে খোলাখুলি আলোচনার ব্যাপারে বাঁধার কারণেই এ সমস্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ওজোরা এবং কোবায়াশির মতে আত্মহত্যার হার কমাতে জাপানে সামাজিক পরিবর্তন জরুরি।
কোবায়াশি জানান, 'নিজের দুর্বলতা এবং সমস্যা নিয়ে কথা বলা স্বাভাবিক এমন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে আমাদের।'
