রমজানে ব্যয় বাড়ার জন্য কি শুধু যুদ্ধই দায়ী?
রমজান শুরু হয়েছে। এর সঙ্গে সঙ্গে প্রধান খাদ্যপণ্যগুলোর—আমদানিকৃত ও স্থানীয় উভয়ের—দামও আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে ভোক্তাদের যখন হাঁসফাঁস দশা, তখন ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ৩০ টাকা কমানোর ঘোষণা খানিকটা স্বস্তি হয়ে এসেছে।
দেশের বাজারে চিনি, ভোজ্যতেল ও আটার মতো আমদানিকৃত পণ্যগুলোর মূল্যবৃদ্ধির দায় চাপানো হচ্ছে যুদ্ধের প্রভাবে ডলারের বিপরীতে টাকার মানের ব্যাপক পতনের ওপর। কিন্তু স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মুরগি, ডিম, গরুর মাংস ও শসা-তরমুজও এই মূল্যবৃদ্ধির মিছিলে যোগ দিয়েছে।
মুরগির মূল্যবৃদ্ধির দায় চাপানো হচ্ছে পোল্ট্রি ফিডের চড়া মূল্যের ওপর।
কিন্তু এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বহুদিনের পুরনো আরও কিছু কারণও রয়েছে। এই পুরনো কারণগুলোর একটি হলো, মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি।
১৯ মার্চ বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সভাপতিত্বে আয়োজিত এক বৈঠকে একজন ব্যবসায়ী নেতা বলেন, 'পুলিশ যদি পণ্যবাহী ট্রাক থেকে চাঁদা আদায় অব্যাহত রাখে', তাহলে রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে না।
আগের দুই বছরও রমজান-পূর্ব বৈঠকে একই অভিযোগ এসেছিল, কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
রমজানের আগে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে শীর্ষ বাণিজ্য সংস্থার কমিটি বাজার মনিটরিংয়ের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাজারদরে তার তেমন প্রভাব পড়ে না।
গ্যাস, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের উচ্চমূল্য—এসবই উৎপাদন ও পরিবহন খরচে ভূমিকা রেখেছে—গত বছরের তুলনায় এবারের রমজানে ভোক্তাদের খরচ বাড়াচ্ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অভ বাংলাদেশের সভাপতি গোলাম রহমান স্বীকার করেছেন যে আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় ভুগবে। 'তবে দাম কতটা বাড়ে সেটাই দেখার বিষয়। ওটা কঠোরভাবে মনিটর করা উচিত, কারণ নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে সেগুলোর দাম বাড়িয়ে দেওয়াটা ব্যবসায়ীদের একটা সাধারণ অভ্যাস,' বলেন তিনি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় সব খাদ্যপণ্যই আমদানি করা হয়। সেখানে পবিত্র রমজান মাসে ক্রেতাদের সঞ্চয়ে সাহায্য করার জন্য ব্যবসায়ীরা ১০ হাজারেরও বেশি খাদ্য ও খাদ্য-বহির্ভূত পণ্যে ৭৫ শতাংশ ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছেন। সুপারমার্কেট গ্রুপগুলো বাছাইকৃত কিছু পণ্যের জন্য 'প্রাইস লক' ঘোষণা করেছে। এর অর্থ হলো, বাজারের অবস্থা যেমনই হোক না কেন, পুরো রমজান মাসে মুদি, খাদ্য ও তাজা পণ্যের দাম অপরিবর্তিত থাকবে।
কিন্তু এদেশে ভোক্তাদের কেন বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়, তার ব্যাখ্যা সদা প্রস্তুত রাখেন ব্যবসায়ীরা।
বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে রোববারের বৈঠকে ফেডারেশন অভ বাংলাদেশ চেম্বারস অভ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু যুক্তি দিয়েছিলেন, 'ব্যবসায়ীরা ১১০ টাকায় ডলার কিনে পণ্য আমদানি করেন, অথচ সরকারনির্ধারিত রেট ১০৬ টাকা। সুতরাং, প্রতি ডলারে এই অতিরিক্ত ৬ টাকা আদায় করা হবে ভোক্তাদের কাছ থেকে।'
উৎপাদক পর্যায়ে মুরগির দাম কেজিতে ২২০ টাকা থেকে কমিয়ে ১৯০ টাকা করতে রাজি হয়েছে চারটি বড় পোল্ট্রি খামার মালিক। তাদের বাজার-হিস্যা ১৫-২০ শতাংশ। তবে গতকাল তারা জানিয়েছে, পোল্ট্রি ফিড উপাদানগুলোর—সয়াবিন ও ভুট্টা—মূল্যবৃদ্ধি ১৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের ব্যবসার খরচ ও মূল্যবৃদ্ধিকে অনিবার্য করে তুলেছে।
তবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ সংস্থা হিসাব করে দেখেছে, কর্পোরেট পোল্ট্রি গ্রুপের উৎপাদন খরচ কেজিতে ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকার মধ্যে। তাই ভোক্তাদের কাছ থেকে যে ২৮০ টাকা দাম রাখা হচ্ছে, সেটি অযৌক্তিক।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রধান এএইচএম সফিকুজ্জামান আশা প্রকাশ করেছেন, দুই-এক দিনের মধ্যে ভোক্তা পর্যায়ে মুরগির দাম কেজিতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা কমে যাবে।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, 'আমরা বাজার মনিটর করব। আশা করছি দাম কমবে।'
রমজানের আগে মুরগি ও গরুর মাংসের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় মুরগির দাম কমানোর ঘোষণাটি গতকাল একটি সভায় মাংস আমদানি উন্মুক্ত করে দেওয়ার আহ্বানের সঙ্গে কাককালীয়ভাবে মিলে গেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর অনুরূপ সতর্কবার্তায় গত বছরের আগস্টে আকস্মিকভাবে বেড়ে যাওয়া ডিমের দাম তাৎক্ষণিকভাবে কমে গিয়েছিল।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লেগেছে আমদানিকৃত খাদ্যসামগ্রীর ওপর। এ যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক নিত্যপণ্য ও জ্বালানির দাম হু হু করে বেড়ে গেছে। আর সেই সঙ্গে কয়েক দশকের মধ্যে ডলারও সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে চলমান যুদ্ধের দরুন। রিজার্ভ বাঁচাতে সরকার গত বছরের মাঝামাঝি থেকে আমদানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে।
আমদানিকারকেরা বলছেন, ডলারের দামকে স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তরিত করার পর ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমে যাওয়ার ফলে আমদানি পণ্যে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এ পার্থক্যে সমতা আনার জন্য সরকারের শুল্ক কমানোর পরিমাণও একেবারেই পর্যাপ্ত নয়।
কাস্টমসের তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা গেছে, এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত আট মাসে আমদানি পরিমাণের দিকে থেকে ৫ শতাংশের বেশি কমেছে। তবে দাম বেড়েছে ১২ শতাংশ। অর্থাৎ কম পরিমাণ পণ্যের জন্য আমদানিকারকদের বেশি ব্যয় করতে হয়েছে। আমদানির বিল পরিশোধে তাদেরকে ডলারের জন্য বেশি দাম গুনতে হয়েছে। গত এক বছরেরও কম সময়ে আমদানিতে ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকায় পৌঁছেছে। এমনকি আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার জন্য ব্যাংকগুলোও প্রয়োজনীয় ডলারের সংকটে পড়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বার-এর প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ডলারের উচ্চমূল্য ও বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি গত বছরের তুলনায় আমদানিপণ্যের দাম অনেক বেশি বাড়িয়ে তুলেছে।
খুচরা পর্যায়ে মূল্য তালিকা বলছে, আমদানিকৃত প্রায় সবধরনের খাদ্যসামগ্রীর দাম এবার আগের বছরের তুলনায় কেজিতে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ টাকা বেশি। এসব খাদ্যপণ্যের চাহিদা রমজান মাসে অন্য সময়ের তুলনায় বেড়ে যায়।
তবে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খাদ্য যেমন গরুর মাংস, মাছ ও শাকসবজি ইত্যাদির দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার পেছনে বাজার মনিটরিংয়ে শিথিলতাকেও দায়ী করা হচ্ছে।
শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার বুধবার তার মন্ত্রণালয়ে রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহবিষয়ক এক সভায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও ডলার সংকটকে দায়ী করে স্থানীয় বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানোর জন্য 'একটি ব্যবসায়ী মহল'কে দোষারোপ করেছেন। তার নিজের খামার থেকে তোলা মাছ তিন থেকে চারগুণ বেশি দামে বাজারে বিক্রি হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। 'এই চক্রকে ভাঙা না হলে তারা এটি চালিয়ে যাবে' বলে মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী। সেইসঙ্গে তার মন্ত্রণালয়ের সংস্থা বিএসটিআই দ্বারা বাজার পরিচালনা জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
বাজার পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন, গত ৪৫-৯০ দিনে ব্রয়লার মুরগির দাম প্রায় ১২০ টাকা বেড়ে সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে গেছে।
অন্যদিকে এক মাসের মধ্যে গরুর মাংসের দাম ৬৭৫-৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ৭৮০-৮০০ টাকা হয়ে যাওয়ায় ইতিমধ্যেই তা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
খাদ্য, মুরগির ছানা ও বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় গত কয়েক বছরে অনেক ছোট পোল্ট্রি খামারিদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। তারপর নেতৃত্ব দখল করেছে কর্পোরেট গ্রুপগুলো। চড়া খরচের দোহাই দিয়ে শীর্ষস্থানীয় উৎপাদনকারীরা মুরগির ছানা উৎপাদন কমিয়ে দেয়। ফলে শেষপর্যন্ত প্রান্তিক কৃষকদের কমবয়সি ছানা সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়। এসবের ফলে পোল্ট্রির উৎপাদন কমে গেছে এবং চাহিদা বৃদ্ধির বিপরীতে হঠাৎ দাম বেড়ে গেছে বলে বাজার সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয় সরবরাহের মাধ্যমে গরুর মাংসের চাহিদা সম্পূর্ণভাবে মেটানো হলেও রমজানের আগে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা তার সুযোগ নেয়। এর ফলে গরুর মাংসের দাম এক সপ্তাহ আগের ৭২০-৭৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০০ টাকা কেজিতে উঠেছে।
নিম্ন আয়ের মানুষ সাধারণত তেলাপিয়া ও পাঙ্গাস খায়। এই মাছ দুটির সঙ্গে লেবু ও বেগুনের দামও আকস্মিকভাবে বেড়ে যাওয়ার জন্য একই কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। ইফতার আইটেমের সাধারণ সবজি বেগুন। সবজিটি প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত। মাত্র কয়েকদিন আগেও বেগুনের দাম ছিল কেজিতে ৬০ টাকা, গত বৃহস্পতিবার এর দাম কেজিতে ৮৫ টাকা হয়ে যায়। আর প্রতি হালি লেবুর দাম দ্বিগুণ বেড়ে ৫০ থেকে ৭০ টাকা হয়েছে।
